“এর উত্তর নেই আমার কাছে,” সত্যটাই বললাম। “আপনিও নিশ্চয়ই জানেন সেটা। এসব ব্যাপারে আগে থেকে কোন কিছু আন্দাজ করা যায় না। ছয় মাস, এক বছর-কিংবা তার চেয়েও বেশি।”
“ছয় সপ্তাহ সময় দিলাম তোমাকে।”
সামনে এগিয়ে এলো স্টেফানি। “আমি এই ইউনিটের ম্যানেজার, এরকমটা হতে দিতে”।
“আর আমি গ্রোভের ক্লিনিকাল ডিরেক্টর। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার একমাত্র আমারই আছে, আর কারো নয়। থিও’র যদি কোন কিছু হয়, তাহলে সেটার দায় পুরোপুরি আমার,” বলে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপলেন ডায়োমেডেস।
আর কথা বাড়ালো না স্টেফানি। দৃষ্টিবাণে কিছুক্ষণ আমাদের ভস্ম করে বেরিয়ে গেল অফিস থেকে।
“আশ্চর্য, মেয়েটা রেগে গেল কেন?” আমুদে কন্ঠে বললেন প্রফেসর। “তুমি দেখি ইউনিট ম্যানেজারের শত্রু হয়ে গেলে থিও, কপালটাই খারাপ তোমার,” ইন্দিরার দিকে তাকিয়ে উদ্দেশ্যপুর্ণ হাসি দিলেন তিনি। খানিক বাদেই চেহারায় গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বললেন, “ছয় সপ্তাহ, আমার তত্ত্বাবধায়নে। বুঝেছো?”
রাজি হয়ে গেলাম-আসলে রাজি না হয়ে আর কোন উপায়ও ছিল না। “ছয় সপ্তাহ,” বললাম।
“বেশ।”
ক্রিস্টিয়ান উঠে দাঁড়ালো, দৃশ্যতই বিরক্ত। “ছয় সপ্তাহ কেন, ছয়শো বছরেও কথা বলবে না অ্যালিসিয়া। সময় নষ্ট করছেন আপনারা।”
চলে গেল সে। আমার ব্যর্থতার ব্যাপারে এতটা নিশ্চিত কিভাবে সে?
মনের মধ্যে জেদ চেপে গেল। সফল হতেই হবে আমাকে।
২.০৬ রাজ্যের ক্লান্তি
২.৬
রাজ্যের ক্লান্তি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম। অভ্যাসবশত হলওয়ের সুইচবোর্ডে চলে গেল হাত। বালবটার ফিউজ কেটে গেছে বেশ কিছুদিন হতে চললো, বদলাবো বদলাবো করেও বদলানোনা হচ্ছে না।
বাসায় পা দেয়া মাত্র বুঝতে পারলাম যে ক্যাথি বাইরে। বড় বেশি চুপচাপ ভেতরটা; ক্যাথি থাকলে এরকমটা হবার কথা নয়। ও শোরগোল পছন্দ করে এমনটা বলা উচিৎ হবে না, কিন্তু ওর জগতটা আর যা-ই হোক, নিশ্চুপ নয়। হয় ফোনে কথা বলবে, নয়তো সাউন্ড জোরে দিয়ে টিভি দেখবে-কিছু না কিছু একটা তো করবেই। আজ ফ্ল্যাটের ভেতরটা কবরস্থানের মতন নীরব। তবুও অভ্যাসবশত ওর নাম ধরে ডাকলাম কয়েকবার। জানতাম যে কোন জবাব পাবো না, তবুও বোধহয় নিশ্চিত হতে চাচ্ছিলাম যে বাসায় আসলেও সম্পূর্ণ একা আমি।
“ক্যাথি?”
জবাব নেই।
অন্ধকারেই কোনরকমে লিভিং রুম অবধি চলে এলাম। বাতি জ্বালতেই উজ্জ্বল হয়ে উঠলো চারপাশ। নতুন আসবাবপত্র সবসময়ই চমকে দেয় আমাকে। অভ্যস্ত হবার আগ অবধি মনে হয় অন্য কারো বাসায় এসে পড়েছি বুঝি। চারপাশে নতুন চেয়ার, নতুন কুশন আর রঙের সমারোহ। কে বলবে যে আগে এখানটায় কোন রঙই ছিল না? টেবিলের ওপর একটা ফুলদানিতে ক্যাথির পছন্দের গোলাপি লিলি সাজিয়ে রাখা। ওগুলোর কড়া মিষ্টি গন্ধে থকথক করছে চারপাশ।
কটা বাজে? সাড়ে আটটা। এতক্ষণে তো ওর বাসায় থাকার কথা। রিহার্সাল আছে নাকি? ওদের নাটকের দলটা ওথেলো’ করছে এখন, কিন্তু দর্শকদের কাছ থেকে আশানুরূপ সাড়া পায়নি। অতিরিক্ত পরিশ্রমের খেসারত দিতে হচ্ছে সবাইকে। বাসায় আসার পর ভীষণ ক্লান্ত থাকে ক্যাথি। চেহারায় শুকিয়ে গেছে। মরার ওপর খড়ার ঘায়ের মত ঠাণ্ডা লেগেই থাকে বেচারির। “সবসময় অসুস্থ,” প্রায়ই বলে ও। “শরীর আর চলছে না।”
কথাটা সত্য; রিহার্সাল থাকলে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়ে যায়। চেহারা দেখেই বোঝা যায় যে কতটা পরিশ্রম গেছে সারাদিনে। হাই তুলতে তুলতে বিছানায় উঠে পড়ে। অন্তত আরো দুঘন্টার আগে ফিরবে না নিশ্চিত। তাহলে ঝুঁকিটা নেয়াই যায়।
গাঁজার বয়ামটা বের করে একটা জয়েন্ট বানানো শুরু করে দেই।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকেই এই বদভ্যাসের শুরু আমার। প্রথম সেমিস্টারে একটা পার্টিতে গিয়ে যখন কারো সাথে কথা বলার সাহস করে উঠতে পারছিলাম না, তখন নিজেকে সপে দিয়েছিলাম গাঁজার ধোয়ার মধ্যে। আমি বাদে সেখানে উপস্থিত অন্য সবাইকে ভীষণ আত্মবিশ্বাসী আর সুদর্শন বলে মনে হচ্ছিল। আর আমি হলাম সেই কুৎসিত হাঁসের ছানা। পার্টি থেকে পালাবো এমন সময় পাশের মেয়েটা একটা জিনিস হাতে ধরিয়ে দেয় আমার। প্রথমে ভেবেছিলাম সিগারেট, কিন্তু কড়া গন্ধটায় ভুল ভেঙে যায়। জয়েন্টটা যে ফিরিয়ে দেব, সেই সাহসও ছিল না। অগত্যা ঠোঁটে নিয়ে টান দেই। ভালো করে রোল করা হয়নি জয়েন্টটা, খুলে খুলে যাচ্ছিল। তা সত্ত্বেও প্রভাবটা ঠিকই বুঝতে পারি। সিগারেটের ধোঁয়া থেকে একদম আলাদা, মাথায় গিয়ে লাগে। তবে হ্যাঁ, লোকে যেরকম বাড়িয়ে বলে সেরকম কিছু মনে হয়নি। অনেকটা সেক্সের মতন ব্যাপারটা, নিজের অভিজ্ঞতা না হবার আগ অবধি মনে হবে না জানি কত্ত দারুণ অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।
তবে কিছুক্ষণ যেতেই আসল ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। কী যেন একটা হয়ে গেল। কোত্থেকে এক রাশ প্রশান্তি এসে ভর করলো আমার চিত্তে। নিজেকে খুবই সুখি মনে হচ্ছিল সেসময়। যাবতীয় দুশ্চিন্তা ভেসে গেল বানের জলে।
সেই থেকেই শুরু। কয়েকদিনের মধ্যে পাক্কা গাঁজাখোর হয়ে গেলাম। আমার নিত্যদিনের সঙ্গি। জয়েন্ট রোল করার সময় মনে হতো দুনিয়ার সবচেয়ে ভালো কাজটার প্রস্তুতি নিচ্ছি। কাগজ ভাঁজ করার শব্দ কানে আসতেই নেশা ধরে যেত যেন।
