প্রফেসরের দরজায় নক করলাম। আমাকে দেখে চোখ বড়বড় হয়ে গেল তার। “আহারে। সেলাই লাগবে নাকি?”
“না, না। আমি ঠিক আছি।”
মনে হলো না আমার কথা বিশ্বাস করলেন তিনি। “ভেতরে এসে বসো, থিও।”
অন্যেরা আগেই সেখানে জড়ো হয়েছে। একপাশে দাঁড়িয়ে আছে ক্রিস্টিয়ান আর স্টেফানি। ইন্দিরা জানালার ধারে একটা চেয়ারে বসে আমাকে দেখছেন। মনে হচ্ছে যেন আমাকে নতুন চাকরিতে স্বাগত জানাতে উপস্থিত হয়েছে সবাই। কিন্তু বাস্তবতা এর উল্টো, হয়তো চাকরিটা খোয়াতে হবে আজকেই।
ডায়োমেডেস তার ডেস্কের পেছনে বসে আছেন। আমাকে হাত দিয়ে উল্টোদিকের খালি চেয়ারটায় বসার ইশারা করলেন। বসে পড়লাম। কিছু না বলে চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ, আঙুলগুলো ডেস্কের ওপর নড়ছে অবিরাম। হয়তো ভাবছেন যে কথাটা কি করে বলবেন। তবে তাকে সে সুযোগ দিল না স্টেফানি।
“খুবই খারাপ হলো ব্যাপারটা,” আমার দিকে তাকিয়ে বলল ইউনিট ম্যানেজার। “আপনি যে সুস্থ আছেন, সেটাই সবচেয়ে বড় ব্যাপার, তবুও…কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। অ্যালিসিয়ার সাথে একা কেন দেখা করেছিলেন আপনি, বলুন তো?”
“আসলে দোষটা আমারই। আমিই ইউরিকে বলি যে ওকে একা সামলাতে পারবো।”
“এই সিদ্ধান্ত নেয়ার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছিল? আপনাদের কেউ যদি মারাত্মক আহত হতেন-”
“একটু বেশি বেশি বলে ফেলছে স্টেফানি,” ডায়োমেডেস বলে উঠলেন এই সময়ে। “সৌভাগ্যবশত তেমন কিছু হয়নি কারোই। এরকম জেরার প্রয়োজন দেখছি না,” ব্যাপারটা উড়িয়ে দেয়ার ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন প্রফেসর।
“ঘটনাটাকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই, প্রফেসর।” থমথমে কন্ঠে বলল স্টেফানি। “একদমই নেই।”
“খাটো করে দেখছি কে বলল?” আমার দিকে তাকালেন ডায়োমেডেস। “আমার কথা উল্টোপাল্টা অর্থ বের করবে না, স্টেফানি। থিও, তুমি বলো তো কি হয়েছিল।”
সবাই চোখে কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। খুব সাবধানে পরবর্তী কথাগুলো বললাম। “আমাকে হঠাৎ করেই আক্রমন করে বসে অ্যালিসিয়া। ঘটনা বলতে এটুকুই।”
“সেটা তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কেন? কোন রকমের উসকানি ছাড়াই কাজটা করেছিল বোধহয় সে?”
“হ্যাঁ। অন্তত সজ্ঞানে উসকানিমূলক কিছু বলিনি আমি।”
“তাহলে হয়তো নিজের অজান্তেই কিছু একটা করে ফেলেছিলে?”
“অ্যালিসিয়ার ওরকম প্রতিক্রিয়া দেখানর কোন না কারণ তো নিশ্চয়ই আছে। এটা থেকে বোঝা যায় অ্যালিসিয়া নিজের মনের ভাব প্রকাশে আগ্রহী।”
হেসে উঠলো ক্রিস্টিয়ান। “এভাবে?”
“হ্যাঁ। ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দ্বারাও কিন্তু অনেক কিছু বোঝাতে পারে মানুষ। অন্যান্য রোগিদেরই দেখো, চুপচাপ বসে থাকে সারাদিন, হাল ছেড়ে দিয়েছি পুরোপুরি। কিন্তু অ্যালিসিয়া সেরকম না। ওর আমার ওপর এভাবে হঠাৎ ঝাঁপিয়ে পড়া থেকে এটা বোঝা যায় যে ভেতরে ভেতরে কোন একটা কারণে খুব কষ্ট পাচ্ছে। আর ওটাই আমাদের বোঝানোর জন্যে মরিয়া সে।”
চোখ বাঁকালো ক্রিস্টিয়ান। “এত কাব্যিক ব্যাখ্যা দেয়ার কিছু নেই। পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে ঔষধের ডোজ কমানোয় এই কাজ করেছে সে।”ডায়োমেডেসের দিকে ঘুরলো ও। “আপনাকে আগেই সাবধান করেছিলাম, প্রফেসর। বলেছিলাম যে ডোজ কমালে হিতে বিপরীত হতে পারে।”
“তাই ক্রিস্টিয়ান?” বললাম। “তুমি না বললে তো জানতামই না।”
আমার কথা আমলে নিল না ক্রিস্টিয়ান। এখানেই সাইকোথেরাপিস্ট আর সাইকিয়াট্রিস্টের মধ্যে পার্থক্য। রোগিদের মানসিকতার পরিবর্তন কিভাবে করা যায়, সেটা প্রায়ই ভুলতে বসে ক্রিস্টিয়ানের মত লোকেরা। শুধু ঔষধ খাইয়ে ঠাণ্ডা করে রাখতে পারলেই খুশি। প্রতিবেলা খাবার শেষে নিয়ম করে তাই কয়েকটা ট্যাবলেট দেয়া হয় অ্যালিসিয়াকে। ক্রিস্টিয়ানের দৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে না যে আমার কোন পরামর্শ শুনবে সে।
তবে ডায়োমেডেস চেহারায় ভাবনার ছাপ। “ঘটনাটা তাহলে দমিয়ে দেয়নি তোমাকে, থিও।”
“না, এখন তো মনে হচ্ছে ঠিক পথেই এগোচ্ছি,” মাথা ঝাঁকিয়ে বললাম।
সন্তুষ্টি ফুটলো ডায়োমেডেসের চেহারায়। “ভালো। আমি তোমার সাথে একমত। এরকম প্রতিক্রিয়া দেখানোর কারণ খুঁজে বের করা উচিৎ। তুমি কাজ চালিয়ে যাও।”
আর নিজেকে সামলাতে পারলো না স্টেফানি। “প্রশ্নই ওঠে না,” বলে উঠলো সে।
“তোমার কি মনে হয়? অ্যালিসিয়াকে কথা বলাতে পারবে?” স্টেফানির কথা যেন কানেই ঢোকেনি প্রফেসরের।
“আমার বিশ্বাস, পারবে,” পেছন থেকে ইন্দিরা বললেন এসময়। আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম যে ঘরে তিনিও আছেন। “একভাবে চিন্তা করলে, অ্যালিসিয়া কিন্তু কথা বলতে শুরু করেছে। থিও’র মাধ্যমে যোগাযোগ করছে সে। অর্থাৎ থিও হচ্ছে তার যোগাযোগের মাধ্যম।”
মাথা নেড়ে সায় জানালেন ডায়োমেডেস। এক মুহূর্তের জন্যে চিন্তিত দেখালো তাকে। মাথায় কি চলছে বুঝতে পারছি। অ্যালিসিয়া নামকরা একজন পেইন্টার, সুতরাং গ্রোভকে টিকিয়ে রাখার লড়াইয়ে সে-ই হতে পারে ডায়োমেডেসের তুরুপের তাস। আমরা যদি দেখাতে পারি যে অ্যালিসিয়ার মানসিক অবস্থায় উন্নতি হচ্ছে, তাহলে হয়তো গ্রোভ বন্ধ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে ট্রাস্ট।
“কতদিনের মধ্যে ফলাফল আশা করতে পারি আমরা?” জানতে চাইলেন ডায়োমেডেস।
