চুপ করে বসে থাকতে থাকতে এক পর্যায়ে মাথার দুই পাশে দপদপ করতে থাকে আমার। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাথাব্যথা শুরু হয়ে যাবে। রুথের কথা মনে হলো। প্রায়ই বলতো যে ভালো একজন থেরাপিস্ট হিসেবে রোগির অনুভূতিগুলো বুঝতে হবে তোমাকে। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে অনুভূতিগুলো আসলে তোমার নয়, অন্য কারো। অর্থাৎ এখন যে আমার মাথা দপদপ করছে, এই কষ্টটা আসলে আমার নয়; অ্যালিসিয়ার। আর হঠাৎ করেই চিত্তে চেপে বসা এই তীব্র বিষণ্ণতা, মরে যাবার ইচ্ছেটাও ওর। চুপচাপ বসে অ্যালিসিয়ার হয়ে এগুলো অনুভব করতে লাগলাম আমি। কিছুক্ষণের মধ্যেই পেটের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠলো। দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল পঞ্চাশ মিনিট।
আমার ঘড়ির দিকে তাকালাম। “আজকের সেশন এখানেই শেষ।”
মাথা নামিয়ে কোলের ওপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলো অ্যালিসিয়া। দৃশ্যটা দেখে নিজের ওপর আর নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারলাম না। পরবর্তী কথাগুলো একদম মন থেকেই বললাম।
“আপনাকে সাহায্য করতে চাই আমি, অ্যালিসিয়া। বিশ্বাস করুন কথাটা। সত্যিটা হচ্ছে, আমি চাই আপনি যাতে ঠিকঠাক চিন্তা করতে পারেন।”
এবারে মুখ তোলে অ্যালিসিয়া। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে আমার দিকে।
আমাকে সাহায্য করার যোগ্যতা তোমার নেই, দৃষ্টিটা যেন চিৎকার করে বলে। নিজেকেই তো সাহায্য করতে পারোনি। এমন ভাব ধরো যেন বিরাট জ্ঞানী। আমার জায়গায় এখানে তোমার বসা উচিৎ। ভন্ড, মিথ্যুক, মিথ্যুক–
হঠাৎই একটা বিষয় পরিস্কার হয়ে যায়। গত পঞ্চাশ মিনিট এ ব্যাপারটাই খেচাচ্ছিল আমাকে। কথাটা বলে বোঝানো মুশকিল, একজন সাইকোথেরাপিস্ট চোখের দৃষ্টি বা অঙ্গভঙ্গি দেখে খুব দ্রুত তার রোগির মানসিক কষ্ট চিহ্নিত করতে শিখে যায়। আর এখানেই অ্যালিসিয়া ব্যতিক্রম। গত ছয় বছর ধরে এত চিকিৎসা, এত রকমের ঔষধ-এসব কিছু সত্ত্বেও তার চোখের দৃষ্টিটা এখন একদম টলটলে হ্রদের পানির মত পরিস্কার। পাগল নয় সে। তাহলে কি? চোখের এরকম দৃষ্টির মানেই বা কি? এটা
ভাবনাটা শেষ হবার আগেই চেয়ার থেকে আমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে অ্যালিসিয়া। সরে যাবার সময়টুকুও পেলাম না। তাল সামলাতে না পেরে মেঝেতে পড়ে যাই ওকে সহ।
মেঝেতে মাথা ঠুকে যায়। আমার ওপর চেপে বসেছে অ্যালিসিয়া। চুলগুলো মুঠি করে ধরে মাথাটা বারবার মেঝের সাথে বাড়ি দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর উপর্যুপরি থাপড়াতে আর খামচাতে শুরু করলো। খুব কষ্ট করে ওকে আমার ওপর থেকে সরালাম।
কোনমতে টেবিল অবধি পৌঁছে পার্সোনাল অ্যালার্মটা হাতে নিয়েছি, এসময় আবারো আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় অ্যালিসিয়া। অ্যালার্মটা ছুটে যায়।
“অ্যালিসিয়া-”
সাড়াশির মত ওর হাতজোড়া চেপে বসে আমার গলায়। আবারো অ্যালার্মটা হাতে নেয়ার চেষ্টা করি, কিন্তু লাভ হয় না। আরো শক্ত হয়ে বসে যাচ্ছে ওর আঙুলগুলো, নিশ্বাস নিতে পারছি না। এবারের অ্যালার্মটার নাগাল পাই, বোতামটা সাথে সাথে চেপে ধরি সর্বশক্তিতে।
বিকট শব্দে বেজে ওঠে অ্যালার্ম। দূর থেকে ইউরির দরজা খোলার শব্দ ভেসে আসে। চিৎকার করে অন্যদের ডাক দেয় সে। টেনে হেঁচড়ে আমার ওপর থেকে সরানো হয় অ্যালিসিয়াকে। এতক্ষণে বুক ভরে শ্বাস নেই।
চারজন নার্স মিলে শক্ত করে ধরে রেখেছে ওকে। তবুও সমানে হাত পা ছুঁড়ে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন অশরীরি, জান্তব কিছু ভর করেছে। দ্রুত ক্রিস্টিয়ান এসে একটা ইঞ্জেকশন দেয়। জ্ঞান হারায় অ্যালিসিয়া।
অবশেষে আবারো নীরবতা নেমে আসে ঘরটায়।
.
২.৫
“একটু জ্বলবে।”
অ্যালিসিয়ার নখের আঁচড়ে ছিলে যাওয়া জায়গাগুলোয় অ্যান্টিসেপ্টিক লাগানোর সময় বলল ইউরি। নার্স স্টেশনে আমরা। অ্যান্টিসেপ্টিকের ঘ্রাণটা আমাকে স্কুলের ফাস্ট এইড জোনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। খেলার সময় পড়ে গিয়ে হাত পা ছিলে গেলে সেখানে নিয়ে যাওয়া হতো আমাদের। এরপর ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে দিয়ে সাহসিকতার জন্যে প্রত্যেকের হাতে একটা করে ক্যান্ডি ধরিয়ে দিতেন নার্স। অ্যান্টিসেপ্টিকের তীব্র জ্বলুনি বাস্তবে ফিরিয়ে নিয়ে এল আমাকে। এখন আর আগের মত সহজেই ক্ষতগুলোর কথা ভুলে যাওয়া যায় না।
“মনে হচ্ছে কেউ যেন হাতুড়িপেটা করেছে আমাকে।”
“ভালো জোরেই মেরেছে, আরো ফুলে যাবে একটু পর। খেয়াল রেখো,” মাথা ঝাঁকিয়ে বলল ইউরি। “তোমাকে ওর সাথে একা ছাড়াটাই উচিৎ হয়নি আমার।”
“আসলে দোষটা আমারই।”
“তা অবশ্য ঠিক।”নাক দিয়ে শব্দ করলো ইউরি।
‘আগেই সাবধান করেছিলাম তোমাকে’-এটা না বলার জন্যে ধনবাদ। মনে থাকবে আমার।”
কাঁধ ঝাঁকালো ইউরি। “আমার কিছু বলতে হবে না, প্রফেসর সাহেবই যা বলার বলবেন। তোমাকে অফিসে ডেকে পাঠিয়েছেন ডায়োমেডেস।”
“এহহে।”
“তোমার জায়গায় আমি হলে কাপতাম এই কথা শোনার পর।”
বেশ কসরত করে উঠে দাঁড়ালাম।
খেয়ালী চোখে আমাকে দেখছে ইউরি। “এত তাড়াহুড়োরও কিছু নেই। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে যাও। মাথা ঘোরালে বা ব্যথা করলে সাথে সাথে আমাকে জানাবে।”
“ঠিক আছি আমি।”
কথাটা পুরোপুরি সত্য নয়, তবে দেখে যতটা খারাপ মনে হচ্ছে আমার অবস্থা তার চেয়ে ভালো। গলার যেখানটায় অ্যালিসিয়া চেপে ধরেছিল সেখানে কালশিটে ফুটে উঠতে শুরু করেছে। পুরো চেহারায় নখের আচড়ের দাগ। কয়েকটা ক্ষতস্থান থেকে বেশ ভালোই রক্ত ঝরেছে।
