গ্লাসের মধ্যেই একটা হ্যাঁচ খুলে দেয় ক্রিস্টিয়ান। “এখন তো আমাদের এসব নিয়ে আলাপ করার সময় নয়, এলিফ।”
“বললাম না, খাবো না। অসুস্থ লাগে সারাদিন-”
“যদি কথা বলতে চাও তাহলে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করো। এখন সরে দাঁড়াও এখান থেকে, প্লিজ।”
গড়িমসি করলেও কিছুক্ষণ পর চলে গজরাতে গজরাতে চলে যায়। এলিফ। যেখানে মুখ ঠেকিয়েছিল সেখানে ওর চেহারার একটা অবয়ব ফুটে উঠেছে।
“রোগি বটে একখান,” বললাম।
“এরকম রোগি সামলানো মুশকিল,” চিবিয়ে বলে ক্রিস্টিয়ান।
মাথা নেড়ে সায় জানায় ইন্দিরা। “বেচারা এলিফ।”
“এখানে পাঠানো হয়েছে কেন ওকে?”
“জোড়া খুন,” ক্রিস্টিয়ান বলল। “ওর মা আর বোনকে খুন করেছিল ঘুমের মধ্যে।”
কাঁচ ভেদ করে বাইরে তাকাই। অন্যান্য রোগিদের সাথে যোগ দিয়েছে। এখন এলিফ। সবার তুলনায় লম্বা সে। একজনকে দেখলাম ওর হাতে কিছু টাকা ধরিয়ে দিতে, সেটা পকেটে খুঁজে ফেললো তৎক্ষণাৎ।
এসময় অ্যালিসিয়াকে খেয়াল করলাম বাইরে এক কোণায়। জানালা দিয়ে আনমনা দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ দেখলাম ওকে।
আমার দৃষ্টি অনুসরণ করে বাইরে তাকালো ক্রিস্টিয়ান। “ওহ আচ্ছা, অ্যালিসিয়ার ওষুধের ব্যাপারে ডায়োমেডেসের সাথে কথা হয়েছে আমার। রিস্পেরিডোনের ডোজ কমিয়ে দেয়ার ফলাফল কি হয় সেটা দেখার অপেক্ষায় আছি। এখন প্রতিদিন পাঁচ মিলিগ্রাম করে দেয়া হয় ওকে।”
“আচ্ছা।”
“ভাবলাম তোমাকে জানিয়ে রাখি, যেহেতু ওর সাথে এক সেশনে দেখা করেছে।”
“হ্যাঁ।”
“এখন নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে অ্যালিসিয়াকে, ব্যবহারে কোন পরিবর্তন আসে কি না বুঝতে হবে। আরেকটা কথা, এর পরে যদি কখনো আমার কোন রোগির ওষুদের ডোজ পরিবর্তনের কথা বলতে হয়, তাহলে সরাসরি আমার কাছে আসবে। ডায়োমেডেসকে ঢাল হিসেবে ব্যবহারের কোন দরকার নেই,” চোখ পাকিয়ে কথাটা বলল ক্রিস্টিয়ান।
জবাবে হাসলাম ওর দিকে তাকিয়ে। “কাউকেই ঢাল হিসেবে ব্যবহার করিনি আমি। তোমার সাথে সরাসরি কথা বলতেও কোন সমস্যা নেই। আমার, ক্রিস্টিয়ান।”
বেশ একটা থমথমে ভাব বিরাজ করছে ঘরটায়। মনস্থির করার ভঙ্গিতে মাথা নাড়লো ক্রিস্টিয়ান। “তুমি তো এটা বুঝতে পারছো যে অ্যালিসিয়া রোগি হিসেবে বর্ডারলাইন। একটু এদিক সেদিক হলেই দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। থেরাপিতে কোন লাভই হবে না ওর। সময় নষ্ট করছে।”
“তুমি কিভাবে বুঝলে ও বর্ডারলাইন? কথাই তো বলতে পারে না।”
“বলতে পারে না বলাটা ভুল হবে। বলে না।”
“তোমার ধারণা গোটাটাই অভিনয়?”
“হ্যাঁ।”
“যদি অভিনয়ই হয়ে থাকে তাহলে তো বর্ডারলাইন হবার প্রশ্নই ওঠে না।”
বিরক্তির ছাপ ফুটলো ক্রিস্টিয়ানের চেহারায়।
তবে সে কিছু বলার আগেই ইন্দিরা হাত ওঠায়। “তোমাদের দুজনের মতের ওপরেই সম্মান রেখেই বলছি, বর্ডারলাইন’ কথাটা দিয়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিস্কার করে কিছু কিছু বোঝা যায় না।”ক্রিস্টিয়ানের দিকে তাকালেন তিনি। এই ব্যাপারটা নিয়ে আগেও ক্রিস্টিয়ানের সাথে কথা কাটাকাটি হয়েছে।”
“তাহলে আপনার অ্যালিসিয়াকে নিয়ে কি ধারণা?” জিজ্ঞেস করলাম।
কিছুক্ষণ প্রশ্নটা নিয়ে ভাবলেন ইন্দিরা। “আসলে ওর প্রতি মাতৃসুলভ একটা টান অনুভব করি আমি। কাউন্টার ট্রান্সফিয়ারেন্স বলতে পারো। ওকে দেখলেই আমার ভেতরের মাতৃসত্ত্বা জেগে ওঠে, মনে হয় কারো উচিৎ ওর দেখভাল করা।”আমার উদ্দেশ্যে একবার হাসি দেয় ইন্দিরা। “আর এখন ওর যত্ন নেয়ার মত মানুষ এসেছে এখানে। তুমি।”
হেসে উঠলো ক্রিস্টিয়ান, ওর বিরক্তিকর সেই হাসি। শুনলেই পিত্তি জ্বলে ওঠে। “বোকার মত প্রশ্ন করার জন্যে মাফ করবেন, কিন্তু অ্যালিসিয়া যদি কথাই না বলে তাহলে থেরাপি থেকে কি লাভ হবে তার?”
“থেরাপির ক্ষেত্রে কথা বলাটাই সবকিছু নয়,” ইন্দিরা বললেন। “বরং বলতে পারো থেরাপির মাধ্যমে রোগিদের এটা বোঝানো হয় যে তাদের মত প্রকাশের জন্যে পরিবেশটা নিরাপদ। কথা বলা ছাড়াও মনের ভাব ফুটিয়ে তুলতে পারে মানুষ, সেটা নিশ্চয়ই ভালো করেই জানো তুমি।”
চেহারায় সবজান্তা একটা ভাব এনে আমার দিকে তাকায় ক্রিস্টিয়ান। “ভালো কোন জ্যোতিষী দেখিয়ে নিও। কপালে শনি আছে নাহলে।”
.
২.৪
“হ্যালো, অ্যালিসিয়া,” বললাম।
ওষুধের ডোজ কমানোর খুব বেশিদিন হয়নি, কিন্তু এই কদিনেই ওর মধ্য দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। চলাফেরায় আগের জড়তা নেই। চোখের দৃষ্টিও আগের তুলনায় পরিস্কার। মনে হচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন একটা মানুষকে দেখছি।
দরজায় ইউরির সাথে দাঁড়িয়ে আছে ও, দোটানায় ভুগছে। কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো, যেন এই প্রথম আমাকে খেয়াল করেছে। হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে মানুষ হিসেবে আমি কেমন। ভেতরে ঢুকলে কোন সমস্যা হবে মেনে নিয়ে পা বাড়ালো সামনে। আজকে আর বসতে বলতে হলো না।
ইউরিকে চলে যাবার ইশারা করলাম। এক মুহূর্ত ইতস্তত করে দরজা বন্ধ করে চলে গেল সে।
অ্যালিসিয়ার মুখোমুখি বসে আছি আমি। ঘরের নীরবতা ছাপিয়ে কানে আসছে বাইরের অবিরাম বর্ষণের শব্দ।
“আজকে কেমন লাগছে আপনার?”
কোন জবাব পেলাম না। অ্যালিসিয়া একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। চোখে পলক পড়ছে না।
মুখ খুলে কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। ঠিক করেছি ওর চুপ করা থাকা সময়টায় আমিও যতটা সম্ভব কম কথা বলবো। এতে হয়তো ও নিজেকে আমার চারপাশে নিরাপদ অনুভব করবে, বুঝতে পারবে যে আমাকে ভরসা করা যায়। অর্থাৎ ওর কাছে এই বার্তাটা পৌঁছুনোর জন্যে মুখ খোলার কোন দরকার নেই আমার। ওকে কথা বলাতে চাইলে আগে ভরসা অর্জন করতে হবে। তবে সেজন্যে সময় দরকার, রাতারাতি কিছু হয় না।
