“চিন্তা কোরো না থিও,” আমার হাত ধরে বললেন। “এখানকার সব রাস্তা চিনতে আমারো কয়েক মাস লেগে গেছে। গোলকধাঁধা মনে হয় মাঝে মাঝে। এখনও প্রায়ই হারিয়ে যাই, চিন্তা করো!” হাসি ফুটলো তার মুখে। আমি কিছু বলার আগেই চট করে চা খাওয়ার প্রস্তাব দিয়ে বসলেন। না করতে পারলাম না।
“কেতলিটা গরম দেই, দাঁড়াও। এত্ত বাজে আবহাওয়া। এর চেয়ে তুষারপাত হলেই ভালো। আমার কি ধারণা জানো? তুষারপাতের সাথে মানুষের মানসিক অবস্থার একটা সম্পর্ক আছে। অনেকক্ষণ টানা তুষারপাতের পর সবকিছু কিন্তু একদম সাদা হয়ে যায়, মনে হয় যে নতুন করে শুরু করতে হবে সবকিছু। কিন্তু তুষারের নিচে আগের জিনিসগুলো কিন্তু ঠিকই থাকে। মানুষও এরকম নতুন করে শুরু করতে চায়। তুষারপাতের সময় রোগিদের দেখো ভালো করে, বুঝতে পারবে।”
আমাকে অবাক করে দিয়ে ব্যাগ থেকে পলিথিনে মোড়ানো মোটা এক স্লাইস কেক বের করলেন তিনি। ওটা আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এই নাও। ওয়ালনাট কেক, গতরাতে বানিয়েছি।”
“আরে এটার কি দরকার ছিল।”
“আমি জানি ব্যাপারটা একটু অদ্ভুত, কিন্তু রোগিদের হাতে একটা কেক ধরিয়ে দিয়ে সবসময় ভালো ফলাফলই পেয়েছি।”
হাসলাম। “এরকম সুস্বাদু কেক দিলে তো ফলাফল ভালো পাবেনই। আমি রোগি হিসেবে ঝামেলার নাকি?”
ইন্দিরার মুখেও হাসি ফুটলো। “আরে নাহ্। কিন্তু মাঝে সাঝে গোমড়া স্টাফদের হাতে কেক দিলে, তারাও খুশি হয় কিন্তু। তুমি অবশ্য মুখ গোমড়া করে রাখে না। একটু মিষ্টি কিছু খেলে কাজের উদ্যোম বেড়ে যায়। আগে তো আমি প্রায়ই ক্যান্টিনে দেয়ার জন্যে কেক বানাতাম, কিন্তু স্টেফানি আসার পর থেকে বাইরের খাবার নিয়ে বেশি কড়াকড়ি শুরু করেছে। তবুও মাঝে মাঝে কেক নিয়ে আসি ব্যাগে করে। নীরব প্রতিবাদ বলতে পারো। এখন খাও তো“।
এরকম আদেশ অমান্য করা যায় না। কেকে কামড় দিলাম। আসলেও দারুণ খেতে।
“আপনার রোগিদের মন নিশ্চয়ই ভালো হয়ে যায় কেক খাওয়ার পর,” মুখে কেক নিয়েই বললাম।
সন্তুষ্টির হাসি ফুটলো ইন্দিরার মুখে। কেন তাকে ভালো লাগে এটা পরিস্কার হয়ে গেল, একটা মা মা ভাব আছে তার মধ্যে। অনেকটা আমার পুরনো থেরাপিস্ট রুথের মতন। এরকম মানুষের মন কোন কারণে খারাপ, এটা ভাবতেও যেন কেমন লাগে।
আমরা এখন নার্স স্টেশনে। এখানকার সবাই জায়গাটাকে ‘গোল্ডফিশ বোউল বলে। চারপাশের কাঁচের জন্যেই এই নাম। যে কোন সাইকিয়াট্রিক ইউনিটের প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে নার্স স্টেশন। চারদিকে নজর রাখা যায় কাঁচ ভেদ করে। কিন্তু উল্টোটা ঘটে সাধারণতবাইরে থেকে রোগিরাই সবসময় তাকিয়ে থাকে ভেতরের অধিবাসীদের দিকে। ছোট জায়গাটায় পর্যাপ্ত চেয়ার নেই। যেগুলো আছে, সেগুলোয় সাধারণত নার্সরা বসে টুকটাক কাজ করে। সুতরাং আমাদের বেশিরভাগ সময় দাঁড়িয়ে বা ডেস্কে হেলান দিয়ে থাকতে হয়। ভেতরে লোক যতই থাক, সবসময়ই মনে হবে যে অনেক ভিড়।
“এই নাও তোমার চা।” বড় একটা মগ আমার হাতে ধরিয়ে দিল ইন্দিরা।
“ধন্যবাদ।”
এসময় ক্রিস্টিয়ান ঢুকলো ভেতরে। আমার সাথে চোখাচোখি হওয়ায় একবার মাথা নাড়লো। সবসময় পিপারমিন্ট চুইংগাম চিবোনো ওর একটা অভ্যাস। ওটার গন্ধই নাকে এসে লাগলো। ব্রডমরে থাকতে দেখতাম কিছুক্ষণ পরপরই সিগারেট টানছে; এই একটা ব্যাপারেই মিল ছিল আমাদের। এরপর অবশ্য ধূমপান ছেড়ে দিয়েছে ক্রিস্টিয়ান। বিয়ে করেছে, একটা মেয়েও আছে। বাবা হিসেবে সে কিরকম, কে জানে। ওকে কখনোই খুব একটা সহনশীল মনে হয়নি আমার।
“আবারো কোন একটা নার্স স্টেশনে তোমার সাথে দেখা হয়ে যাবে এটা কখনো ভাবিনি, থিও,” শীতল হেসে বলল ক্রিস্টিয়ান।
“আমিও ভাবিনি। দুনিয়াটা বড় ছোট।”
“মানসিক স্বাস্থ্য খাতের চিন্তা করলে, আসলেও ছোট।” এমনভাবে কথাটা বলল যেন এর বাইরেও বড় একটা দুনিয়া আছে ওর। সেটা জিম বা রাগবি খেলার মাঠ বাদে আর কিছু হতে পারে বলে মনে হয়না।
কয়েক সেকেন্ড আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো ক্রিস্টিয়ান। ওর এই অভ্যাসটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম। কিছু বলার বা করার আগে প্রায়ই সময় নিয়ে ভাবে ও, ইচ্ছে করে অপেক্ষা করায়। ব্রডমুরে থাকতে খুবই বিরক্ত লাগতো ব্যাপারটা, এখনও লাগছে।
“এরকম একটা সময়ে গ্রোভে যোগ দিলে কেন বুঝতে পারছি না,” এক পর্যায়ে বলল সে। “যে কোন সময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে।”
“অবস্থা এতটাই খারাপ?”
“সময়ের ব্যাপার মাত্র। ট্রাস্টের তরফ থেকে খুব শিঘ্রই ঘোষণা এসে পড়বে। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন জাগে, জেনে বুঝে এরকম একটা ইউনিটে যোগ দিলে কেন তুমি?”
“মানে?”
“ডুবন্ত জাহাজ থেকে সাধারণত লাফিয়ে পড়ে বাঁচার চেষ্টা করে ইঁদুরের দল, চড়ে বসে না।”
ক্রিস্টিয়ানের এরকম সরাসরি আক্রমনে অবাক না হয়ে পারলাম না। তবে প্রতিক্রিয়া দেখানোটা বোকামি হবে। বরং কাঁধ ঝাঁকিয়ে উড়িয়ে দিলাম প্রচ্ছন্ন অভিযোগটা। “হতে পারে। কিন্তু আমি তো আর ইঁদুর নই।”
ক্রিস্টিয়ান কিছু বলার আগেই ধপ করে একটা শব্দ হওয়ায় চমকে উঠলাম আমরা। বাইরে থেকে কাঁচের গায়ে কিল বসাচ্ছে এলিফ। মুখটাও চেপে রেখেছে শক্ত করে। রীতিমত একটা দানবীর মতন দেখাচ্ছে।
“এই বালের ওষধ আমি আর খাবো না। মাথা খারাপ করে দেয়।
