“ধুর, হচ্ছে না।” হতাশ সুরে বলি কিছুক্ষণ পর।
“বিরতি নেবে?”
“হ্যাঁ, বিরতি নেয়া যাক।”
“সেক্সের বিরতি।”
হেসে ফেললাম আবারো। “ঠিক আছে।”
লাফিয়ে সামনে এসে আমাকে তুলে নিল গ্যাব্রিয়েল। স্টুডিওর মেঝেতেই একজন আরেকজনকে আদর করতে শুরু করি আমরা।
কিন্তু আমার নজর বারবারই ইজেলে আটকানো ক্যানভাসটার দিকে চলে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল যেন গ্যাব্রিয়েলের প্রাণহীন চোখটা সেখান থেকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। জোর করে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেই।
তবুও টের পাচ্ছিলাম যে আমাকেই দেখছে চোখজোড়া।
.
২.২
অ্যালিসিয়ার সাথে দেখা করার ব্যাপারে রিপোর্ট দেয়ার জন্যে ডায়োমেডেসের অফিসে গেলাম। ভেতরে ঢুকে দেখি স্বরলিপিগুলো গোছগাছ করছেন।
“তারপর,” মুখ না তুলেই বললেন। “কেমন বুঝলে?”
“কিছু বোঝার সুযোগই পাইনি।”
বিভ্রান্তি ভর করলো তার দৃষ্টিতে।
“অ্যালিসিয়ার সাহায্য তখনই করা যাবে, যখন ঠিকঠাক চিন্তা করতে পারবে সে। আশপাশে কি হচ্ছে সেটা না বুঝলে কিছুই সম্ভব নয়।”
“ঠিক। কিন্তু তুমি এই কথাগুলো বলছে, কারণ…”
“আসলে ওকে যে ঔষধগুলো দেয়া হচ্ছে, সেগুলো এত কড়া ডোজের যে কারো কোন কথা সে মোটামুটি বুঝতেই পারছে না।”
ভ্রু কুঁচকে গেল প্রফেসর ডায়োমেডেসের। “এটা একটু বেশি বেশি বলে ফেললে। ওকে কি ঔষধ দেয়া হচ্ছে, সেটা অবশ্য ঠিক জানি না।”
“ইউরির সাথে কথা বলেছি আমি। ষোল মিলিগ্রাম রিস্পেরিডোন। এই তোজে তো একটা ঘোড়াও কাবু হয়ে যাবে।”
ভ্রূ নাচালেন ডায়োমেডেস। “এটা তো আসলেই বেশি। কমানো যেতে পারে। অ্যালিসিয়ার চিকিৎসা দলের প্রধান হচ্ছে ক্রিস্টিয়ান। ওর সাথে এ ব্যাপারে কথা বলতে পারো।”
“আপনি বললেই ভালো হয়।”
“হুম।” সন্দেহ ভর করলো ডায়োমেডেসের দৃষ্টিতে। “তুমি আর ক্রিস্টিয়ান আগে থেকেই একে অন্যকে চেনো, তাই না? ব্রডমুরে পরিচয় হয়েছিল বোধহয়?”
“আসলে খুব ভালো করে চিনি বলাটা ঠিক হবে না।”
তৎক্ষণাৎ কিছু বললেন না ডায়োমেডেস। সামনে রাখা চিনি দেয়া কাঠবাদামের বাটি থেকে একটা বাদাম তুলে নিয়ে আমাকে সাধলেন। মাথা ঝাঁকিয়ে মানা করে দিলাম।
বাদামটা মুখে দিয়ে সময় নিয়ে চিবুলেন। আমার দিক থেকে চোখ সরালেন না। “তোমার আর ক্রিস্টিয়ানের মধ্যে সব ঠিকঠাক তো?”
“প্রশ্নটা একটু অদ্ভুত। এটা জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
“আমার কেন যেন মনে হচ্ছে একে অপরকে সহ্য করতে পারো না তোমরা।”
“আমার তরফ থেকে কোন সমস্যা নেই।”
“কিন্তু ওর তরফ থেকে?”
“সেটা ক্রিস্টিয়ানকেই জিজ্ঞেস করতে হবে আপনাকে। ওর সাথে কাজ করতে কোন অসুবিধে নেই আমার।”
“ঠিক আছে। হয়তো ভুল ভেবেছি। তবুও একটু কেমন যেন লাগছে…ভেবো ব্যাপারটা নিয়ে। কর্মক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বা ব্যক্তিগত রেষারেষি কিন্তু ভালো ফল বয়ে আনে না। একসাথে কাজ করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে তোমাদের।”
“জি, জানি সেটা।”
“বেশ, ক্রিস্টিয়ানের সাথেও এই ব্যাপারে আলাপ করা উচিৎ। তুমি চাইছে যাতে অ্যালিসিয়া চেতনা ফিরে পাক। কিন্তু মনে রেখো, এটা ঝুঁকিপূর্ণও হতে পারে।”
“কার জন্যে ঝুঁকিপূর্ণ?”
“অ্যালিসিয়া, আর কার?” আমার উদ্দেশ্যে আঙুল নাচাতে শুরু করলেন। ডায়োমেডেস। “ভুলে গেলে চলবে না, বেশ কয়েকবার আত্মঘাতী কাজ করেছে অ্যালিসিয়া। নিজের জীবন শেষ করে দেয়ার চেষ্টা করেছে। সেজন্যেই কিন্তু কড়া ডোজের ঔষধ দেয়া হয়েছে ওকে। অনুভূতিগুলো ভোঁতা হলে আর এরকম চিন্তা মাথায় ভর করবে না। এখন যদি ভোজ কমানো হয়, তাহলে আবারো উল্টোপাল্টা কিছু করে বসতে পারে। এই ঝুঁকিটা নিতে রাজি তুমি?”
প্রফেসরের কথায় যুক্তি আছে। তা সত্ত্বেও মাথা নাড়লাম। “এই ঝুঁকিটা আমাদের নিতেই হবে, প্রফেসর। নতুবা অ্যালিসিয়াকে সাহায্য করা সম্ভব নয়।”
কাঁধ ঝাঁকালেন ডায়োমেডেস। “তাহলে তোমার হয়ে ক্রিস্টিয়ানের সাথে কথা বলবো।”
“ধন্যবাদ।”
“ও ব্যাপারটাকে কিভাবে নেয়, সেটা দেখার বিষয়। সাইকিয়াট্রিস্টরা সচরাচর তাদের নিজের কাজে অন্য কারো নাক গলানোর ব্যাপারটা ভালোভাবে নেয় না। তবে আমার কথার ওপরে কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু এরকমটা সাধারণত করিনা আমি। কৌশলে বলতে হবে। তোমাকে জানাবো কি হলো?”
“আমার কথা না উল্লেখ করলেই বোধহয় ভালো হবে।”
“তাই?” অদ্ভুত হাসি ফুটলো ডায়োমেডেসের মুখে। “ঠিক আছে, তোমার ব্যাপারে কিছু বলবো না।”
ডেস্ক থেকে একটা ছোট বক্স বের করলেন প্রফেসর, ভেতরে সারি করে রাখা বেশ কয়েকটা চুরুট। আমাকে সাধলেন একটা। না করে দিলাম।
“ধূমপান করো না?” কিছুটা অবাক মনে হলো তাকে। “তোমাকে দেখে তো মনে হয়েছিল স্মোকার।”
“না, না। কালেভদ্রে খাই আর কি…চেষ্টা করছি অভ্যাসটা ছেড়ে দিতে।”
“বাহ্, ভালো তো।”জানালা খুললেন ডায়োমেডেস। “থেরাপিস্টদের কেন ধূমপান করা সাজে না, সেই কৌতুকটা শুনেছো না? ধূমপানের অর্থ তোমার নিজেরই কোন সমস্যা আছে।”হেসে একটা চুরুট মুখে দিলেন। “এখানে আমাদের সবার মাথাতেই এক আধটু সমস্যা আছে, কি বলো?”
আবারো হাসলেন ডায়োমেডেস। চুরুট জ্বালিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে বাইরে ধোয়া ছাড়লেন। ঈর্ষান্বিত দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থাকা ছাড়া এ মুহূর্তে কিছু করার নেই আমার।
.
২.৩
লাঞ্চের পর করিডোরে পায়চারি করতে লাগলাম। আসলে বাইরে যাবার ছুতো খুঁজছি, একটা সিগারেট না খেলেই নয়। এসময় ইন্দিরার সাথে দেখা হয়ে গেল, ভাবলেন আমি বুঝি হারিয়ে গেছি।
