“বলো দেখি কোথায় যেতে চাই, তিনটা সুযোগ দিলাম।”
“অগাস্টোস?”
“বাহ, একবারেই পেরেছে।”
অগাস্টোস হচ্ছে আমাদের এখানকার স্থানীয় ইতালিয়ান রেস্তোরাঁ। সেরকম আহামরি কোন জায়গা না, কিন্তু গ্যাব্রিয়েল আর আমার অনেক পছন্দের। অনেকগুলো সন্ধ্যা সেখানে একসাথে কাটিয়েছি আমরা।
আটটা নাগাদ পৌঁছে যাই। এসি কাজ করছিল না তাই ঠাণ্ডা ওয়াইনের গ্লাস নিয়ে জানালার পাশের টেবিলটায় বসি। ডিনার শেষ হতে হতে উল্টোপাল্টা বকা শুরু করি বেশি ওয়াইন গেলার ফলে। অল্পতেই হেসে উঠছিলাম বাচ্চাদের মতন। রেস্তোরাঁ থেকে বের হয়েই একজন আরেকজনকে চেপে ধরে চুমু খাই আর বাসায় এসে সেক্স করি।
এ কদিনে ফ্যানটার সাথে মানিয়ে নিয়েছে গ্যাব্রিয়েল। অন্তত বিছানায় থাকার সময় কিছু বলে না। ফ্যানটা পায়ের কাছে বসিয়ে শীতল হাওয়ায় নগ্ন শরীরে ওর বাহুড়োরে শুয়ে থাকি। ‘আই লাভ ইউ’-কিছুক্ষণ পর আমার কপালে চুমু খেয়ে ফিসফিসিয়ে বলে গ্যাব্রিয়েল। জবাবে আমি কিছু বলিনি, বলার দরকারও নেই। ও জানে আমার মনের কথা।
কিন্তু ছবি আঁকার জন্যে মডেল হতে বলে সুন্দর মুহূর্তটার গায়ে পানি ঢেলে দেই আমি।
“তোমার ছবি আঁকবো।”
“আবার? এঁকেছো তো।”
“সেই চারবছর আগে। আবারো আঁকতে চাই।”
“ওহ।” খুব একটা উৎসাহী মনে হয় না ওকে। “কী রকম ছবি আঁকবে?”
এক মুহূর্ত দ্বিধাবোধ করে জিশুর ছবিটার ব্যাপারে বলি! শুনে উঠে বসে গ্যাব্রিয়েল। মুখের হাসিটা যে জোর করে আনা সেটা বুঝতে কষ্ট হয় না।
“কী যে বলল না।”
“কেন? কী হয়েছে?”
“আমার মনে হয় না এই আইডিয়াটা ভালো।”
“ভালো না হবার কী আছে?”
“ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় আমাকে দেখে লোকে কী বলবে?”
“লোকে কি বলবে সেটা নিয়ে তুমি পরোয়া করা শুরু করলে কবে থেকে?”
“কিছু ব্যাপারে পরোয়া না করলে চলে না। ওরা হয়তো ভাববে, আমাকে এরকমটা দেখতেই পছন্দ করো তুমি।”
হেসে উঠেছিলাম। “তোমাকে কেউ জিশু ভাববে না, এসব ভেবো না। শুধুই একটা ছবি। অবচেতন মনেই তোমাকে আঁকা শুরু করেছিলাম, জানো? সাতপাঁচ ভাবিনি।”
“হয়তো ভাবা উচিৎ।”
“কেন? ছবিটা দ্বারা তো আমি তোমাকে নিয়ে বা আমাদের বিয়ে সম্পর্কে কিছু বোঝাতে চাচ্ছি না।”
“তাহলে কি বোঝাতে চাচ্ছো?”
“সেটা আমি কি করে বলবো?”
এই কথা শুনে হেসে ফেলে গ্যাব্রিয়েল। “আচ্ছা বাবা, এঁকো! এত করে চাইছো যখন তোমার কাজের ওপর ভরসা আছে আমার।
কথাটা হয়তো একটু প্রাণহীন ঠেকতে পারে, কিন্তু আমি জানি যে আমার আর আমার ছবি আঁকার প্রতিভার ওপর বিশ্বাস আছে গ্যাব্রিয়েলের। ও না থাকলে আমি কখনোই পেইন্টার হতে পারতাম না। ও যদি আমাকে বারবার উৎসাহ না দিত তাহলে ইউনিভার্সিটি থেকে পাশ করার পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যেই দমে যেতাম। দেখা যেত এখনও জিন-ফিলিক্সের সাথে দেয়ালে দেয়ালে ছবি এঁকে বেড়াচ্ছি। গ্যাব্রিয়েলের সাথে দেখা হবার আগে পথ হারিয়ে ফেলেছিলাম, আর সেই সাথে নিজেকে। সেই সময়ের নেশাখোর বন্ধুদের প্রতি কোন টান কাজ করে না আমার। শুধুমাত্র রাতেই দেখা পাওয়া যেত ওদের, দিনের বেলা উধাও হয়ে যেত বাদুড়দের মতন।
গ্যাব্রিয়েল আমার জীবনে আসার পর ওরা ব্রাত্য হয়ে পড়ে, সে নিয়ে আমার কোন মাথা ব্যথাও ছিল না। আসলে এরকম একজন মানুষকে পেলে আর কাউকে দরকার হয় না। আমাকে ভুল পথ থেকে আলোর পথে এনেছে গ্যাব্রিয়েল, জিশুর মতন। এজন্যেই বোধহয় ছবিতে ওর চেহারাই ফুটিয়ে তুলেছি আনমনে। গ্যাব্রিয়েলই আমার জীবন, আমাদের দেখা হবার একদম প্রথম দিন থেকেই। ও যা-ই করুক বা যা-ই বলুক না কেন, ওকে সবসময় ভালোবেসে যাবো আমি। সবসময়। ও যেমন, সেভাবেই ওকে আপন করে
একমাত্র মৃত্যুর আমাদের আলাদা করতে পারবে।
.
জুলাই ২১
আজকে গ্যাব্রিয়েল স্টুডিওতে আমাকে সময় দিয়েছে।
“দিনের পর দিন কিন্তু এভাবে বসে থাকা সম্ভব না আমার পক্ষে,” বলে সে। “কতদিন লাগতে পারে?”
“এক-দুই দিনে হবে না, এটা নিশ্চিত।”
“গোটাটাই তোমার আমাকে কাছে পাবার চক্রান্ত নয় তো? সেক্ষেত্রে এসব ধনফুন বাদ দিয়ে বিছানায় চলো।”
হেসে ফেললাম। “দাঁড়াও, আগে কাজ শেষ করি। যদি ভদ্র ছেলের মত চুপচাপ বসে থাকো, তাহলে পুরষ্কার পাবে।
গ্যাব্রিয়েলকে ফ্যানের সামনে দাঁড় করিয়ে দিলাম। বাতাসে ওর চুলগুলো উড়ছিল।
“কেমন পোজ দেব?”
“কোন পোজ দেয়া লাগবে না, স্বাভাবিক থাকো।”
“খুব কষ্ট পাচ্ছি, এরকম বোঝাব?”
“জিশু ক্রুশবিদ্ধ অবস্থায় কষ্ট পাচ্ছিলেন কি না সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে আমার। কিংবা কষ্ট পেলেও কাউকে বুঝতে দেননি। আহ, মুখ ওরকম করো না তো। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকো। নড়বে না একদম।”
“জি, বস।”
বিশ মিনিট ওভাবে দাঁড়িয়ে থাকে গ্যাব্রিয়েল। এরপর বলে যে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে।
“বসো তাহলে। কিন্তু কথা বলবে না। চেহারাটা আঁকছি এখন।”
চুপ করে চেয়ারে বসে পড়ে গ্যাব্রিয়েল, আর কিছু বলে না। ওর চেহারা এঁকে আসলেও মজা পাচ্ছিলাম। কি সুন্দর একটা চেহারা! শক্ত চোয়াল, চাপার হাড্ডিগুলোর একদম পরিস্কার বোঝা যায়। নাকটাও সুন্দর। মনে হচ্ছিল যে এক গ্রিক দেবতা বসে আছে আমার সামনে।
কিন্তু কী যেন একটা ঠিক নেই। কী, সেটা বলতে পারবো না। হয়তো নিজের ওপরে বেশি চাপ দিচ্ছি। ওর চোখটা অনেকবার চেষ্টা করেও ঠিকমতো আঁকতে পারলাম না। অথচ প্রথমবার যখন গ্যাব্রিয়েলকে দেখি, ওর উজ্জ্বল চোখ দুটোই আকর্ষণ করে সবচেয়ে বেশি। সেটা হাজার চেষ্টা করেও ফুটিয়ে তুলতে পারলাম না, হয়তো এরকম কিছু আঁকার প্রতিভাই নেই আমার। অথবা এমনটাও হতে পারে যে গ্যাব্রিয়েলের সৌন্দর্য ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয় কারো পক্ষে। ছবির চোখগুলো বড় বেশি প্রাণহীন লাগছিল, কিছু একটা নেই। বিরক্ত হয়ে উঠছিলাম ধীরে ধীরে।
