ওকে বলবো আমার জন্যে পোজ দিতে। শেষ কবে আমার পেইন্টিংয়ের জন্যে মডেল হয়েছিল, ভুলেই গেছি। আশা করি ও ছবির বিষয়বস্তুর ব্যাপারে কিছু মনে করবে না।
মাঝেমধ্যে একটু অদ্ভুত আচরণ করে বসে গ্যাব্রিয়েল।
.
জুলাই ১৮
আজ সকালে হাঁটতে হাঁটতে ক্যামডেন মার্কেটে চলে গিয়েছিলাম। বেশ কয়েক বছর ওখানে পা পড়েনি আমার। শেষবার যাই গ্যাব্রিয়েলের তরুণ বয়সের স্মৃতি রোমন্থনে। বন্ধুদের সাথে ওখানে প্রায়ই আড্ডা দিত আর ড্রিঙ্ক করতো ও। মাঝে মাঝে নাকি পুরো রাত কাটিয়ে ভোরে বাসায় ফিরতো। আবার কাকডাকা ভোরে মার্কেটের সামনে জড়ো হয়ে দোকানিদের স্টল সাজানো দেখতো। অবশ্য আমার ধারণা স্টল সাজানোর দেখার চাইতে গাঁজার ডিলারের কাছ থেকে গাঁজা সংগ্রহ করার প্রতিই ওদের আগ্রহ ছিল বেশি। ক্যামডেন লেকের পাশে ব্রিজের ওদিকটায় মাদক বিক্রেতাদের আখড়া। আমি আর গ্যাব্রিয়েল যেবার যাই, তখন অবশ্য তাদের কেউ ছিল না। একটু হতাশই মনে হয় ওকে। “চেনাই যায় না। পর্যটক আকর্ষণের জন্যে সবকিছু নষ্ট করে ফেলেছে।”
আজকে ইতস্তত হেঁটে বেড়াবার সময় ভাবছিলাম পরিবর্তন কার বেশি হয়েছে। গ্যাব্রিয়েল, নাকি মার্কেটটার? এখনও ষোল-সতেরো বছরের ছেলেমেয়েরা স্বল্পবসনে ঘুরে বেড়ায় জায়গাটাতে। ছেলেদের পরনে শর্টস আর মেয়েদের বেশিরভাগেরই গায়ে বিকিনি টপস। গরমের চোটে সবার চেহারাই রক্তিম। তবে এই বয়সি ছেলেমেয়েদের সহজাত কামনা-লালসা একদম পরিস্কার অনুভব করা যায়। জীবনকে উপভোগ করার অমিয় তাড়না। হঠাৎ করেই গ্যাব্রিয়েলকে কাছে পেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। আমার ওপরে ওর নগ্ন শরীর…শক্ত পা জোড়া চেপে ধরে আছে আমাকে…আর ভাবতে পারছিলাম না। সেক্সের সময় গ্যাব্রিয়েলের প্রতি আমার আকর্ষণ বেড়ে যায় সবসময়। ওকে নিজের ভেতরে অনুভব করার তীব্র আকাঙ্ক্ষাটুকু ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। আমাদের সম্পর্কের এই অংশটুকু বরাবরই অপার্থিব মনে হয়। পবিত্র।
এসব ভাবনার মাঝখানেই হঠাৎ আবিষ্কার করি যে এক ভবঘুরে ফুটপাথ থেকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। ফিতা দিয়ে কোন মতে বাঁধা তার ট্রাউজারটা, পায়ের জুতো টেপ দিয়ে আটকানো। গা ভর্তি ঘা, মুখটা একদম লাল হয়ে আছে। হঠাৎই লোকটার জন্যে বড় মায়া হয় আমার। সচরাচর এরকম পরিস্থিতিতে মুখ ঘুরিয়ে নেয়াই আমার অভ্যাস। কিন্তু আজকে পার্স থেকে খুচরো কিছু পয়সা বের করে তার সামনে রাখি। একবার মনে হয় আমার উদ্দেশ্যে কিছু একটা বলে উঠেছে সে, কিন্তু পরবর্তীতে টের পাই একা একাই কথা বলছে।
এরপর ধীরে ধীরে বাড়ির পথ ধরি। আমাদের বাসাটা একটু উঁচু জায়গায় হওয়ায় ফেরার পথে বরাবরই কষ্ট বেশি হয়। কিন্তু আজকে রাস্তাটা গতানুগতিকের চেয়ে বেশি খাড়া মনে হচ্ছিলো। তার ওপর বিশ্রী গরম। কোন এক অজ্ঞাত কারণে ভবঘুরে লোকটাকে মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না। করুণার পাশাপাশি মনের ভেতরে আরেকটা অনুভূতির উপস্থিতি টের পাই-ভয়। কিন্তু ভয়টা যে কিসের তা বলতে পারবো না। লোকটাকে তার মায়ের কোলে কল্পনা করছিলাম। মহিলা কি কখনো ভেবেছিল যে তার সন্তান এরকম মানবেতর জীবন যাপন করবে এক সময়? সারা শরীরে ময়লা মেখে নিজমনে বিড়বিড় করবে?
আমার মার কথা মনে হলো এসময়। তার মাথায় কি কোন সমস্যা ছিল? সেজন্যেই কাজটা করেছিল? আমাকে প্যাসেঞ্জার সিটে বসিয়ে স্বেচ্ছায় সরাসরি গাড়ি চালিয়ে দিয়েছিল সামনের লাল দেয়াল লক্ষ্য করে? তার হলুদ গাড়িটা বরাবরই পছন্দ ছিল আমার। তখন হলুদ রংটাকে প্রফুল্লতার প্রতীক মনে হতো। কিন্তু এখন যতবার হলুদ কিছু দেখি, মৃত্যুর কথা ভাবি।
কাজটা কেন করেছিল সে? এর উত্তর বোধহয় কখনোই পাবো না। একসময় ভাবতাম যে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল মা, কিন্তু এখন মনে হয় আমাকে হত্যা করাই মূল উদ্দেশ্যে ছিল তার। আমিও তো ছিলাম গাড়িতে, তাই না? কিন্তু এই ভাবনাটা অমূলক। আমাকে কেন হত্যা করতে চাইবে সে?
হাঁটতে হাঁটতেই চোখের কোণে পানি জমে আমার। আসলে মার জন্যে কাঁদছিলাম না। এমনকি আমার নিজের জন্যে বা ঐ ভবঘুরে লোকটার জন্যেও না। আসলে কাঁদছিলাম আমাদের সবার জন্যে। খুব অদ্ভুত শোনাচ্ছে কথাটা? চারদিকে এত কষ্ট, অথচ আমরা কিছু না দেখার ভান করি। সত্যটা হচ্ছে, আমরা সবাই ভীতু। নিজেকে ভয় পাই আমি। আমার ভেতরে থাকা মায়ের ছায়াটাকে ভয় পাই। পাগলামি কি আমার রক্তে? আমিও কি তার মতন
না। আর কিছু লেখা যাবে না এই বিষয়ে।
নিজেকে কথা দিয়েছিলাম যে ডায়েরিতে এসব ব্যাপারে কিছু লেখবো না।
.
জুলাই ২০
গত রাতে আমি আর গ্যাব্রিয়েল বাইরে খেতে গিয়েছিলাম। প্রতি শুক্রবারেই সাধারণত এই কাজ করি আমরা। গ্যাব্রিয়েল মজা করে আমেরিকানদের মত ‘ডেট নাইট’ বলে ব্যাপারটাকে।
ওর মধ্যে এই ব্যাপারটা আছে। আবেগী যে কোন কিছু নিয়ে ঠাট্টা করবে। নিজেকে আবেগহীন আর শক্ত মনের ভাবতে পছন্দ করে ও। কিন্তু সত্যি বলতে ভেতরে ভেতরে দারুণ রোমান্টিক একটা ছেলে গ্যাব্রিয়েল। তবে সেটা তার কাজে বোঝা যায়, কথায় নয়। গ্যাব্রিয়েলের কর্মকাণ্ডে আমার প্রতি ওর ভালোবাসাটুকু টের পাই।
“কোথায় যেতে চাও?” জিজ্ঞেস করি।
