এখানে আসার পথে পা থেকে স্যান্ডেল খুলে ফেলেছিলাম। ছোটবেলায় বাইরে খেলতে বেরুলে এরকমটা করতাম মাঝে মাঝে। হাঁটতে হাঁটতে এরকমই এক গ্রীষ্মের কথা মনে পড়ে গেল, মা মারা যায় সে বছর। বাইরে। বের হলে পল সবসময় আমার সাথে আসতো, দুজন একসাথে সাইকেল চালাতাম সোনালি মাঠে। চারপাশে বুনো ডেইজির মেলা। আমার স্মৃতিতে সেবারের গ্রীষ্মটা অমলিন। মার কথা মনে হলেই তার রঙিন পোশাকগুলোর ছবি স্মৃতির চোখে ফুটে ওঠে। টপসের ফিতাগুলো দেখে মনে হতো একদম নাজুক, ঠিক মা’র মতন। বড্ড বেশি চিকন ছিল সে। রেডিও ছেড়ে দিয়ে পপ গানের তালে তালে আমাকে নিয়ে নাচতো। তার শরীর থেকে যে শ্যাম্পু আর নিভিয়া ক্রিমের সুবাস আসতো, তা এখনও আমার নাকে লেগে আছে। তবে এ দুটোর সাথে ভদকা আর সিগারেটের গন্ধও পেতাম। তার বয়স কত ছিল তখন? আটাশ? উনত্রিশ? এখন আমার যে বয়স, তার থেকে কম।
একটু অদ্ভুত না ব্যাপারটা?
এখানে আসার সময় একটা ছোট পাখিকে রাস্তার ওপর পড়ে থাকতে দেখি, গাছের কোণ ঘেঁষে। প্রথমে মনে হয়েছিল হয়তো বাসা থেকে কোন কারণে পড়ে গেছে। একদমই নড়ছিল না দেখে ভাবলাম পাখনা ভেঙে যেতে পারে। আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়ার পরেও যখন কিছু হলো না, তখন সাবধানে উল্টিয়ে দিলাম। দৃশ্যটা দেখে আরেকটু হলেই বমি হয়ে যেত। পাখিটার পেটের ভেতরে পোকা কিলবিল করছে। গা গুলিয়ে উঠেছিল।
এখনও মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছি না দৃশ্যটা।
.
জুলাই ১৭
এই প্রচণ্ড গরমে বাধ্য হয়ে একটা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ক্যাফের ভেতরে আশ্রয় নিতে শুরু করেছি। ক্যাফে দি আরটিস্টা। ভেতরটা একদম কনকনে ঠাণ্ডা, মনে হয় যেন ফ্রিজের ভেতরে ঢুকে বসে আছি। প্রতিদিন জানালার পাশে নির্দিষ্ট একটা সিটে বসে আইস কফি খাই। মাঝে মাঝে কফি খাওয়ার পাশাপাশি বই পড়ি বা টুকটাক জিনিস নোট করি। ইচ্ছে হলে ছবিও আঁকি। তবে বেশিরভাগ সময়ই নিজের গরজে চলতে দেই মনটাকে, হারিয়ে যাই ভাবনায়। কাউন্টার স্ট্যান্ডের পেছনে বসে থাকা সুন্দরি মেয়েটা সারাক্ষণ একঘেয়ে ভঙ্গীতে ফোন গুঁতায়, মাঝে মাঝে ঘড়ির দিকে তাকায় আর নিয়মিত বিরতিতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। তবে গতকাল ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ও দেখে বুঝতে পারি যে আমার চলে যাওয়ার অপেক্ষা করছে সে, তাহলে দোকান বন্ধ করতে পারবে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও উঠে পড়ি।
এই গরমে হাঁটা আর কাদায় গড়াগড়ি খাওয়া একই কথা। একটুতেই হাঁপিয়ে উঠি। আমাদের শরীর অভ্যস্ত নয় এরকম আবহাওয়ার সাথে। তাছাড়া গ্যাব্রিয়েল আর আমার বাসায় এসিও নেই, আসলে এখানকার কারো বাসাতে যে এসির দরকার হবে তা কেউ ভাবতেও পারেনি। কিন্তু ইদানীং গরমের চোটে রাতে ঘুমোতেও অসুবিধে হয়। গা থেকে চাদর ফেলে দিয়ে অন্ধকারে ঘর্মাক্ত, নগ্ন শরীরে শুয়ে থাকি। জানালা খোলা রেখেও কোন লাভ নেই, বাইরে একটা গাছের পাতাও নড়ে না। শুধুই ভ্যাপসা গরম।
গতকাল একটা ইলেকট্রিক ফ্যান কিনেছি। রাতের বেলা সেটা বিছানার পায়ের দিকটাই বসিয়ে দেই।
গ্যাব্রিয়েল গাইগুই শুরু করে দেয় সাথে সাথে। “বড় বেশি শব্দ। আমাদের ঘুমই হবে না।”
“ঘুম না আসুক। অন্তত গরমে সিদ্ধ হতে হবে না।”
কিছুক্ষণ গজগজ করলেও আমার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে ও। কিন্তু আমার চোখে ঘুম আসে না, চুপচাপ শুয়ে ফ্যানের আওয়াজ শুনতে থাকি। খারাপ লাগে না কিন্তু শব্দটা। শব্দের তালে তালে একসময় আমিও হারিয়ে যাই ঘুমের দেশে।
বাড়ির ভেতরে সবখানে ফ্যানটাকে সাথে নিয়ে ঘুরি। আজ বিকালে বাগানের শেষ মাথায় আমার স্টুডিওতেও নিয়ে যাই। ওটা না থাকলে ভেতরে টিকতেই পারতাম না। তবুও কিছু আঁকা সম্ভব হয় না। এই গরমে কাজ করা যায় নাকি?
তবে একটা উপকার হয়। জিশুর ছবিটা নিয়ে কেন খচখচ করছিল মন, তা বুঝতে পারি। রঙ বা আঁকার ধরণে কোন সমস্যা নেই। মূল সমস্যাটা অন্য জায়গায়। ক্রুশবিদ্ধ লোকটার চেহারার সাথে জিশুর চেহারার কোন মিল নেই।
মিল আছে গ্যাব্রিয়েলের।
এত বড় একটা ব্যাপারে কিভাবে চোখ এড়িয়ে গেল বুঝলাম না। অবচেতন মনেই গ্যাব্রিয়েলের ছবি আঁকা শুরু করেছি। ওর চেহারা, ওর শরীর। অদ্ভুত না ব্যাপারটা? তবে এখন আর কিছু করার নেই, এভাবেই আঁকতে হবে। মাঝে মাঝে শিল্পই শিল্পীকে নিয়ন্ত্রণ করে।
আরেকটা ব্যাপার পরিস্কার হয়ে গেল, আগে থেকে একদম নির্দিষ্ট কোন আইডিয়ার ওপর ভিত্তি করে আমার পক্ষে ছবি আঁকা সম্ভব নয়। তাহলে ছবিতে কোন প্রাণ থাকে না। কিন্তু আমি যদি মনোযোগ দিয়ে নিজের মত করে আঁকতে থাকি, তাহলে আর কোন ঝামেলা হয় না। অদৃশ্য কোন শক্তি আমাকে পথে দেখিয়ে নিয়ে যায়। এমন কোথাও, যেখানটায় যাবার কথা আমি হয়তো কল্পনাও করিনি, কিন্তু সেখানে সবকিছু জীবন্ত, প্রাণ-চাঞ্চল্যে ভরপুর।
তবে অনিশ্চয়তাটুকু আমাকে ভোগায়। কি হতে যাচ্ছে সেটা না জানা থাকলে অস্বস্তি লাগে। আর সেজন্যেই আগে থেকে কিছু খসড়া স্কেচ একে রাখি, তবে খুব একটা লাভ হয় না। স্কেচগুলো একদমই নিষ্প্রভ লাগে দেখতে। সুতরাং চূড়ান্ত ফলাফল কি হবে সেটা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা না করাই আমার জন্যে ভালো। এখন যেহেতু জেনেই গিয়েছি যে গ্যাব্রিয়েলের ছবি আঁকছি, তাহলে আবার শুরু করতে পারবো।
