সেবছর ডিসেম্বরে আমার এক বেডরুমের ফ্ল্যাটটায় উঠে পড়ে ক্যাথি। নিচতলায় অবস্থিত সে ফ্ল্যাটে জানালা থাকলেও বাইরে দেখার মত কোন দৃশ্য ছিলনা। সিদ্ধান্ত নেই যে আমাদের দুজনের একসাথে কাটানো প্রথম ক্রিসমাসটা ভালো করে উদযাপন করবো। একটা ক্রিসমাস ট্রি কিনে ফেলি মেট্রোরেল স্টেশনের পাশের স্টল থেকে। তারপর দুজন মিলে সাজাই।
সেই গাছটার তাজা সুবাস এখনও মনে আছে আমার। মোমের আলোয় জুলুজুলু চোখে আমার দিকে তাকায় ক্যাথি। সেই দৃষ্টির গভীরে যে কোন সময় হারিয়ে যেতে পারি আমি। “আমাকে বিয়ে করবে?” সাত-পাঁচ না ভেবেই বলে উঠি।
অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় ক্যাথি। “কি?”
“আমি তোমাকে ভালোবাসি, ক্যাথি। আমাকে বিয়ে করবে?”
মুখে হাসি ফোটে ক্যাথির। “হ্যাঁ।”এই একটা মাত্র শব্দ আমার ভেতরে যেরকম অনুভূতির সঞ্চার করেছিল, তা ভাষায় প্রকাশ করতে পারবো না।
পরদিন দোকানে গিয়ে ওর জন্যে একটা আঙটি কিনে ফেলি। বাস্তবতাটুকু আরো ভালোভাবে উপলব্ধি করি তখন। ক্যারি আমার বাগদত্তা।
অদ্ভুত হলেও এটা সত্যি, ওর হাতে আঙটি পরানোর পর প্রথমেই মা বাবার কথা মনে হয়েছিল। ক্যাথিকে তাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইছিলাম। চাইছিলাম যে তারা দেখুক আমি কতটা সুখি। অবশেষে অতীতের শেকল ছিঁড়ে সামনে এগোতে সক্ষম হয়েছি। একদম মুক্ত। তাই সারের উদ্দেশ্যে একটা ট্রেনে চেপে বসি আমরা দুজনই। এখন বুঝি যে, গোড়া থেকেই বোকামি ছিল ব্যাপারটা।
বরাবরের মতনই আমাকে দেখে শীতল হয়ে যায় বাবার অভিব্যক্তি। “চেহারার এ কি দশা তোমার, থিও। একদম শুকিয়ে গেছো, চুল এত ছোট কেন? নেশাখোরদের মত লাগছে।”
“ধন্যবাদ বাবা। আশা করি তুমিও ভালো আছো।”
মা’কে গতানুগতিকের তুলনায় সেদিন আরো বিষণ্ণ মনে হচ্ছিল সেদিন। আগের চেয়ে আরো চুপচাপ হয়ে গেছে। বাবার অসহিষ্ণু উপস্থিতি সে তুলনায় অনেক বেশি প্রবল, মনের ওপর চাপ ফেলে। শীতল দৃষ্টিটা একবারের জন্যেও ক্যাথির দিক থেকে সরায়নি সে। বড় বেশি অস্বস্তিকর পরিবেশে দুপুরের খাবার সারি সবাই। ক্যাথিকে পছন্দ হয়নি, ওদের। আমাকে সুখি দেখে তারা যে খুশী হবে, এটা কেনই বা আশা করেছিলাম কে জানে।
খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ হলে বাবা তার স্টাডিরুমে চলে যায়। এরপর আর মুখ দেখায়নি। বিদায় জানানোর সময় আমাকে স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশিক্ষণ শক্ত করে জাপটে ধরে থাকে মা। ঠিকমতো দাঁড়াতেও পারছিল না সে। পুরনো সেই বিষণ্ণতা আবারো জেঁকে বসে আমার চিত্তে। ক্যাথিকে নিয়ে যখন বেরিয়ে আসি, বঝতে পারি যে আমার ভেতরের সেই সদা ভীত, দুর্বল সক্কাটা এখনও বাড়িটায় বন্দি। চিরকাল বন্দিই থাকবে। আশা হারিয়ে ফেলি, চোখের কোণায় বাঁধ ভাঙার অপেক্ষা করতে থাকে অশ্র। এসময় বরাবরের মতনই আমাকে অবাক করে দেয় ক্যাথি। হাত বাড়িয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। “বুঝতে পারছি,” কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলে। “সব বুঝতে পারছি। আগের চেয়ে অনেক বেশি ভালোবাসি তোমাকে এখন।”
হুট করে সেদিন এই কথাগুলো কেন বলেছিল এটা ব্যাখ্যা করেনি ক্যাথি। ব্যাখ্যার দরকারও ছিল না।
***
এপ্রিলে ইউস্টোন স্কয়ারের একটা রেজিস্ট্রি অফিসে বিয়ে করি আমরা। কারো বাবা মা ই আসেনি অনুষ্ঠানে। ক্যাথির অনুরোধে ধর্মীয় রীতিনীতিরও কোন বালাই ছিল না। তবে মনে মনে সৃষ্টিকর্তাকে ঠিকই কৃতজ্ঞতা জানাই। তার জন্যেই এরকম হঠাৎ করে জীবনে সুখ নামের সোনার হরিণের দেখা পেয়েছি। তার উদ্দেশ্যটা পরিস্কার হয়ে যায় একদম। শৈশবে সেই দুর্বিষহ সময়ে আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেননি তিনি। গোটা সময়টা ক্যাথিকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। এখন সময়মতো ঠিকই দূত স্বরূপ ওকে আমার কাছে পাঠিয়েছেন।
ওর সাথে কাটানো প্রতিটা মুহূর্তের জন্যে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞ আমি। ভাগ্য খুব ভালো বলেই এরকম ভালোবাসার সংস্পর্শ পেয়েছি। পৃথিবীতে এমন অনেকেই আছে যারা আমার মত ভাগ্যবান নয়। আমার বেশিরভাগ রোগিদের কেউ কখনো ভালোবাসেনি। অ্যালিসিয়া বেরেনসনের ভাগ্যেও ভালোবাসা জোটেনি।
ক্যাথি আর অ্যালিসিয়া একদম আলাদা। ন্যুনতম মিলটুকুও নেই তাদের। ক্যাথিকে দেখলে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিকগুলোর কথা মনে হয় আমার-উজ্জ্বল হাসি, সম্পর্কের উষ্ণতা। আর অ্যালিসিয়ার কথা ভাবলা চোখের সামনে ফুটে ওঠে অন্ধকার, যেন বিষণ্ণতার প্রতিচ্ছবি সে।
মৌনতার প্রতিমূর্তি।
২.০১ বৃষ্টির আশায়
দ্বিতীয় পর্ব
অব্যক্ত অনুভূতিগুলো কখনো পুরোপুরি চাপা পড়ে না। মনের আড়ালে ঘাপটি মেরে থাকে। জীবনের সবচেয়ে খারাপ মুহূর্তে বেরিয়ে এসে তছনছ করে দেয় সবকিছু।
—সিগমুন্ড ফয়েড
২.১
অ্যালিসিয়া বেরেনসনের ডায়েরি থেকে জুলাই ১৬
আমি কখনো ভাবিনি, বৃষ্টির আশায় এভাবে চাতক পাখির মত বসে থাকতে হবে আমাকে। তাপদাহের চতুর্থ সপ্তাহে এসে এখন আর টেকা যাচ্ছে না। দিন দিন বেড়ে চলেছে তাপমাত্রা। মনেই হচ্ছে না যে ইংল্যান্ডে আছি। যদি গ্রিস বা অন্য কোন গ্রীষ্মমন্ডলীয় দেশে থাকতাম, তাহলে অভিযোগ করতাম না।
আজ হ্যাম্পস্টেড হিথ পার্কে বসে লিখছি ডায়েরিতে। পুরো পার্কজুড়ে অর্ধনগ্ন মানুষের অবাধ বিচরণ, সৈকত বা যুদ্ধক্ষেত্র বলে ভুল হতে পারে প্রথম দর্শনে। যে যার মত বেঞ্চে বা ঘাসের ওপর চাদর বিছিয়ে শুয়ে বসে আছে। আমি বড় দেখে একটা গাছের ছায়া খুঁজে নিয়েছি আগেভাগেই। ছ’টা বাজতে চললো, এখন তাপমাত্রা কিছুটা কমবে। ডুবন্ত সূর্যের উজ্জ্বল লাল-সোনালী আলোয় পার্কটাকে অন্যরকম দেখাচ্ছে। ঘাসগুলো দেখে মনে। হচ্ছে কেউ যেন আগুন ধরিয়ে দিয়েছে ওগুলোর গায়ে।
