ক্যাথির এই অভ্যাসটা এখনও আছে। কথায় কথায় নিজের পাগলামির দোহাই দেয়। ‘আমার মাথাটা খারাপ হয়ে গেছে’, ‘আস্ত পাগল আমি’। ওর মুখের হাসিটা একদম দিলখোলা। অবসাদ বা বিষণ্ণতায় ভোগা কারো হাসি এরকম হয়না। অন্তত তখন সেটাই মনে হয়েছিল আমার। একটা স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল ওর মধ্যে, হাসিখুশি মানুষের চারপাশে যেরকম একটা আভা থাকে-আশা করি বোঝাতে পারছি কথাটা। জীবনকে পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করার জন্যেই ওর জন্ম। মুখে যা-ই বলুক ওর মতো ভালো মানসিক স্বাস্থ্য খুব কম মানুষেরই আছে। এমনকি ওর আশপাশে থাকলে আমার নিজেকেও স্বাভাবিক মনে হয়।
ক্যাথি আমেরিকান। বড় হয়েছে ম্যানহাটানের দক্ষিণে। ওর মা ব্রিটিশ হওয়ায় দুই দেশের নাগরিকত্বই পেয়েছিল। তবে সত্যি বলতে ব্রিটিশদের কোন গুণাবলীই ক্যাথির মধ্যে ছিল না। কথাবার্তা, চালচলন, জীবনদর্শন-সব ছিল ব্রিটিশদের বিপরীত। ওর মতন আত্মবিশ্বাসী আর প্রাণোচ্ছল কারো সাথে এর আগে পরিচয় হয়নি আমার।
বার থেকে বেরিয়ে একটা ক্যাব ডেকে সরাসরি আমার ফ্ল্যাটে চলে আসি দু’জনে। আসার পথটুকু কোন কথা হয় না। বাসায় ঢোকার আগে আমার ঠোঁটে চুমু খায় ও। সব বাঁধ ভেঙে যায়, কাছে টেনে নেই ক্যাথিকে। কোন মতে পকেট থেকে চাবি বের করে ফ্ল্যাটে পা দিয়েই দু’জনের ওপর হামলে পড়ি দু’জনে। মেতে উঠি নরনারীর সেই আদিম খেলায়।
ক্যাথির সাথে কাটানো সেই রাতটা ছিল আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা মুহূর্তগুলোর একটা। ওর শরীরের প্রতিটা বাঁক উপভোগ করেছিলাম। রাত পেরিয়ে যায় কিন্তু আমাদের ভালোবাসা শেষ হয়নি। সবকিছুতেই সাদার আধিক্য ছিল যেন সেদিন। সূর্যের আলো, দেয়াল, বিছানার চাদর, ওর চোখ, দাঁত-সব। কারো ত্বক যে এতটা দীপ্তিময় হতে পারে, এটা আগে জানতাম না। বারবার মনে হচ্ছে যেন কোন গ্রিক দেবীর মূর্তির মধ্যে প্রাণের সঞ্চার হয়েছে আমার হাতে।
একে অপরের বাহুডোরে কতক্ষণ শুয়ে ছিলাম, জানি না। একদম কাছ থেকে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল ক্যাথি। বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম ওর সবুজ চোখের গভীরে।
“এখন?”
“এখন কি?”
“ম্যারিয়ানের কি হবে?”
“ম্যারিয়ান?”
“তোমার গার্লফ্রেন্ড।” মুখে হাসি ফোটে ক্যাথির।
“ওহ হ্যাঁ।”ইতস্তত করি কিছুক্ষণ। “আসলে জানি না আমি। ড্যানিয়েলের কি হবে?”
চোখ নাচায় ক্যাথি। “ওর কথা ভুলে যাও। আমি আর ওকে নিয়ে কিছু ভাবছি না।”
“আসলেই?”
জবাবে আমাকে চুমু খায় ক্যাথি।
যাবার আগে গোসল করতে টোকে সে। সেই সুযোগে ম্যারিয়ানকে ফোন দেই আমি। আমি চাচ্ছিলাম দেখা করে কথাটা ওকে বলতে। কিন্তু আগের রাতের ব্যাপারটা নিয়ে খুব বেশি বিরক্ত ছিল সে, তাই যা বলার ফোনেই বলি। ম্যারিয়ান অবশ্য ভাবতে পারেনি যে ব্রেক-আপ করার জন্যে ফোন দিয়েছি আমি। কিন্তু সেটাই করি আমি, যতটা ভদ্রভাবে সম্ভব। এক পর্যায়ে রাগে-দুঃখে কাঁদতে শুরু করে ও, আমি ফোন কেটে দেই। জানি, বড্ড বেশি নিষ্ঠুর শোনাচ্ছে। সেদিনের সেই ফোনকলটা নিয়ে ভাবলে এখনও অস্বস্তিবোধ হয় আমার। কিন্তু এছাড়া আর কী-ই বা করতে পারতাম, বলুন?
***
আমাদের প্রথম আনুষ্ঠানিক ডেটে কিউ গার্ডেনে দেখা করি ক্যাথির সাথে। ওর আইডিয়া ছিল পুরোটাই।
আমি যে ওখানে কখনো যাইনি, এটা শুনে যারপরনাই অবাক হয়েছিল। “এটা কি করে সম্ভব? কখনো গ্রিনহাউজগুলো দেখতে যাওনি? অর্কিড় যেখানে রাখে সেখানটা একদম চুলোর মতন গরম। অভিনয়ের ক্লাস করার সময় শরীর গরমের জন্যে কিউ গার্ডেনে প্রায়ই যেতাম। তোমার কাজ শেষে ওখানে দেখা করলে কেমন হয়?” এরপরই অনিশ্চয়তা ভর করে ওর কণ্ঠে। “নাকি তোমার জন্যে বড় বেশি দুরে হয়ে যাবে?”
“তোমার জন্যে পৃথিবীর শেষ সীমানায় যেতে হলেও যাবো আমি, ক্যাথি।”
“গর্দভ।”ফোনেই একবার চুমু খেয়ে ফোন রেখে দেয় ও।
কিউ গার্ডেনে পৌঁছে দেখি গেটের বাইরে গায়ে বড় একটা কোট জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে ক্যাথি। গলায় স্কার্ফ। আমাকে দেখে বাচ্চাদের মতন হাত নাড়তে শুরু করে। আমার সাথে এসো।”
ঠাণ্ডায় জমে যাওয়া শক্ত কাদার ওপর দিয়ে কাঁচের ঘরগুলোর দিকে আমাকে নিয়ে যায় ক্যাথি। নানারকমের গ্রীষ্মমন্ডলীয় গাছ চারদিকে। ভেতরে পা দেয়ার সাথে সাথে টের পাই যে তাপমাত্রা লাফ দিয়ে বেড়ে গেছে অনেকটা। স্কার্ফ আর কোট খুলে ফেলি দ্রুত।
“দেখেছো? বলেছিলাম না গরম লাগবে?” হাসি চওড়া হয় ক্যাথির মুখে।
হাত ধরাধরি করে গ্রীনহাউজের ভেতরে হাঁটি আমরা। ফুলগুলো আসলেও খুব সুন্দর ছিল।
ওর সাহচর্যে অদ্ভুত এক ধরণের মানসিক প্রশান্তি অনুভব করছিলাম, এরকম অনুভূতির সাথে আগে পরিচয় ছিল না। মনে হয় যেন আমার ভেতরে একটা গোপন দরজা খুলে গেছে। আর সেই দরজা দিয়ে জাদুকরী, উষ্ণ এক জগতে নিয়ে এসেছে ক্যাথি। চারদিকে রঙের স্ফুরণ।
সেই উষ্ণতার প্রভাবে আমার ভেতরে এতদিনের জমে থাকা আবেগের যে প্রস্ফুটন হচ্ছে, তা টের পাচ্ছিলাম। যেন দীর্ঘ শীতন্দ্রিা শেষে সূর্যের আলয় খোল থেকে মুখ বের করছে কোন কচ্ছপ। আমার জীবনটাকে নতুনভাবে সাজানোর পুরো কৃতিত্ব ক্যাথির।
এটাই সত্যিকারের ভালোবাসা, ভেবেছিলাম সেদিন। কোন সন্দেহই ছিল না ব্যাপারটায়। এর আগে কখনো এরকম অনুভূতি হয়নি আমার ভেতরে। ক্যাথির সাথে দেখা হবার আগ অবধি যতগুলো সম্পর্কে জড়িয়েছি, সবগুলোই ছিল সংক্ষিপ্ত। কোন তৃপ্তিও পাইনি সেগুলো থেকে। জীবনে প্রথমবার সেক্স করি কানাডিয়ান মেয়ে মেরেডিথের সাথে; বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়। তবে বিছানায় যাবার আগে নার্ভ শক্ত রাখার জন্যে গলা অবধি মদ গিলেছিলাম। মেরেডিথের দাঁতের ব্রেসের কারণে চুমু খাবার সময় ঠোঁট কেটে গিয়েছিল আমার। এরপর আরো কয়েকজনের সাথে সম্পর্ক হয়, কিন্তু কারো প্রতিই সেরকম টান অনুভব করিনি। ভাবতাম, আমার মত মানুষের পক্ষে সত্যিকারের ভালবাসা খুঁজে পাওয়া বুঝি সম্ভব নয়। কিন্তু এখন প্রতিবার যখন ক্যাথির হাসি শুনি, ভালোলাগায় ছেয়ে ওঠে মন। ওর প্রফুল্লতায় ছুঁয়ে যায় আমাকেও। সেজন্যেই ওর সব আবদারে হ্যাঁ বলেছি সবসময়। নিজেকে নিজেই চিনতে পারতাম না মাঝে মাঝে। নতুন আমাকে নিয়ে অবশ্য কোন আক্ষেপও ছিল না। সুযোগ পেলেই সেক্স করতাম। ওর চারপাশে থাকার প্রতিটা মুহূর্ত কামনায় আচ্ছন্ন। থাকতো আমার শরীর। আর সেই ক্ষুধা মেটানোর একমাত্র উপায় ওর সংস্পর্শ।
