“ওহ। আমি আসি তাহলে?”
“বোকার মত কথা বোলো না তো। একদম ঠিক সময়ে এসেছে। আমাদের প্রথম দেখার ঘটনাটা বলা শুরু করেছি কেবলই।”
আমি বসার সাথে সাথে আবার গল্পে ফিরে গেল ক্যাথি। এই গল্পটা সবাইকে খুব আগ্রহ নিয়ে বলে সে। মাঝে মাঝে আমার দিকে তাকিয়ে হাসবে, আমিও যে গল্পটার অংশ সেটা বোঝানোর জন্যেই বোধহয়। তবে সত্যি বলতে গল্পটা আগাগোড়াই ওর, আমার না।
“একদিন বারে বসে ছিলাম, এসময় জনাবের আগমন ঘটে সেখানে। স্বপ্নের মানুষটাকে খুঁজে পাবার সব আশা ততদিনে ছেড়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের লিখন, না যায় খণ্ডন। তবে দেরি করে হলেও সন্ধান তো পেয়েছিলাম, এই বা কম কি? বয়স পঁচিশ হবার আগেই বিয়ের শখ ছিল আমার, জানো? ত্রিশ বছরের মধ্যে দু’টা বাচ্চা হয়ে যাবে। এরপর সুখের সংসার। কিন্তু কিসের কি, তেত্রিশে পা দেয়ার পরেও সেই স্বপ্নের টিকিটিরও দেখা মেলেনি।” বলে অন্য সবার উদ্দেশ্যে একবার হাসলো ক্যাথি।
“যাইহোক, তখন ড্যানিয়েল নামের একটা অস্ট্রেলিয়ান ছেলের সাথে ইটিস পিটিস চলছে আমার। কিন্তু ওর খুব শিগগির বিয়ে বা বাচ্চা নেয়ার কোন ইচ্ছেই ছিল না। সুতরাং আমি এক প্রকার জানতাম যে সময় নষ্ট করছি। ওর সাথেই এক রাতে ঘুরতে বেরিয়েছি এসময় থিও’র দেখা পাই।”এবারে আমার দিকে তাকিয়ে চোখ নাচায় ক্যাথি। “সাথে ওনার গার্লফ্রেন্ডও ছিল কিন্তু।”
গল্পের এই অংশটুকু বেশ সাবধানে বলতে হয় যাতে শ্রোতাদের কেউ ভুলভাল না বোঝে। হ্যাঁ, ক্যাথির সাথে যখন পরিচয় হয় তখন আমরা দু’জনই আলাদা আলাদা সম্পর্কে ছিলাম। এই তথ্যটা অনেকের জন্যে অস্বস্তিদায়ক। আমার তখনকার গার্লফ্রেন্ড আর ক্যাথির বয়ফ্রেন্ড একে ওপরকে কিভাবে যেন চিনতো, ঠিক মনে নেই। মূলত তারাই আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। যাইহোক, ক্যাথিকে প্রথমবার দেখেই হৃৎস্পন্দন দ্রুত হয়ে যায় আমার। যেন কেউ হাজার ভোল্টের শক দিয়েছে আমাকে। ওর ঘন কালো চুল, টানা টানা সবুজ চোখ, পাতলা ঠোঁট-মনে হচ্ছিল যেন এক দেবী নেমে এসেছিল মতে।
গল্পের এই পর্যায়ে রুটিন মাফিক একটা বিরতি দিয়ে আমার হাত ধরলো ক্যাথি। “তোমার মনে আছে, থিও? কোন প্রকার জড়তা ছাড়াই আলাপ শুরু করি আমরা। তুমি বলেছিলে যে সাইকোথেরাপিস্ট হবার জন্যে পড়ছে। আর আমি বলি যে আমার মত পাগলের জন্যে এরকম মানুষই দরকার।”
এই কথা শুনে হেসে উঠলো মেয়েরা। ক্যাথিও একবার হেসে আমার চোখের দিকে তাকালো। “একদম প্রথম দেখাতেই প্রেম, তাই না ডার্লিং?”
এবারে আমার পালা। মাথা নেড়ে সায় জানিয়ে ওর গালে চুমু খেলাম। “হ্যাঁ। একদম সত্যিকারের ভালোবাসা।”
ওর বান্ধবীদের চোখেও সম্মতি দেখতে পেলাম। তবে সত্যি বলতে আমি কিন্তু অভিনয় করছি না, মন থেকেই বলেছি কথাটা। আসলেও প্রথম দেখায় একে অপরের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমরা। প্রেম না বলি কামনাও বলা যায় অবশ্য। ক্যাথির দিক থেকে চোখ ফেরাতে পারছিলাম না। দূর থেকে বার বার ওকেই দেখছিলাম। এক পর্যায়ে বুঝতে পারি, ওর বয়ফ্রেন্ডের সাথে ঝগড়া করছে। কিছুক্ষণ পর হনহন করে বার ছেড়ে বেরিয়ে যায় ড্যানিয়েল।
“তোমাকে আজ বড্ড বেশি চুপচাপ লাগছে,” ম্যারিয়ান বলে আমার উদ্দেশ্যে। “কি হয়েছে?”
“কিছু না।”
“চলো বাসায় যাই। আমি ক্লান্ত।”
“আরেকটু থাকি,” ওর কথা আসলে ঠিকমতো কানেও ঢুকছিল না আমার। “আরেক রাউন্ড ড্রিঙ্ক নেই।”
“আমি এখনি বাসায় যাবো।”
“তাহলে যাও।”
আহত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকায় মারিয়ান, কিন্তু কিছু বলে না। একটু পর জ্যাকেট তুলে নিয়ে চলে যায় বার থেকে। জানতাম যে পরদিন এ নিয়ে ঝগড়া হবে আমাদের মাঝে, কিন্তু তাতে আর কিছু যায় আসে না।
বার কাউন্টারে ক্যাথির পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। “ড্যানিয়েল কি ফিরবে?”
“না। ম্যারিয়ান?”
মাথা ঝাঁকাই আমি। “না। আরেকটা ড্রিঙ্ক নেবে নাকি?”
“হ্যাঁ।”
ড্রিঙ্কসের অর্ডার দিয়ে ওখানে দাঁড়িয়েই গল্প করতে শুরু করি আমরা। আমার সাইকোথেরাপি ট্রেনিং নিয়ে কথা বলি কিছুক্ষণ। ক্যাথির ওর নাট্যকলায় আগ্রহের ব্যাপারে বলে। এই বিষয়ে পড়াশোনাও করছে। প্রথম বর্ষে থাকাকালীন সময় থেকেই এক এজেন্টের সহায়তায় নিয়মিত মঞ্চনাটকে অভিনয় করে। আমার কেন যেন মনে হয়েছিল, সে আসলেও একজন ভালো অভিনেত্রী।
“পড়াশোনা করতে ভালো লাগতো না একদমই,” কথার এক পর্যায়ে বলে ক্যাথি।
“তাহলে কী করতে ভালো লাগতো?”
“জীবনটাকে নিজের মত করে উপভোগ করতে।” ঘাড় কাত করে ক্যাথি। ওর গাঢ় সবুজ চোখজোড়ায় দুষ্টুমি খেলা করছিল। “তো, থিও সাহেব, আপনার এত পড়াশোনার ধৈৰ্য্য এলো কোথা থেকে?”
“হয়তো জীবনটাকে এখনও ‘উপভোগ করার মত সাহস জোগাড় করে উঠতে পারিনি। কাপুরুষ আমি।”
“নাহ, কাপুরুষ হলে তো সুড়সুড় করে গার্লফ্রেন্ডের সাথে বাড়ি চলে যেতে,” এবারে ক্যাথির হাসিতে স্পষ্ট ইঙ্গিত।
ইচ্ছে হচ্ছিলো ওকে শক্ত করে চেপে ধরে চুমু খাই। এর আগে কখনো কারো প্রতি এরকম কামনা অনুভব করিনি। আমার ঠোঁটে ওর ঠোঁটের স্পর্শ অনুভব করতে চাইছিলাম খুব করে।
“সরি,” হঠাৎই বলে ওঠে ক্যাথি। “আমার আসলে কথাটা বলা উচিৎ হয়নি। সবসময় মাথায় যা আসে বলে ফেলি। বলেছিলাম না, আমি আসলেও পাগল।”
