ক্যানে লম্বা একটা চুমুক দিয়ে মুখ মুছলো ইউরি। “তারপর? অ্যালিসিয়া সম্পর্কে বলুন দেখি।”
“অ্যালিসিয়া?”
“কেমন বুঝলেন ওকে?”
“আসলে বুঝেছি কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত নই।”
ক্ষণিকের জন্যে বিভ্রান্তি খেলে যায় ইউরির চোখে, পরমুহূর্তেই আবারো হেসে ওঠে। “সে বোধহয় চায় না যে কেউ তাকে বুঝুক, নাকি? ইচ্ছে করেই দেয়াল তুলে রেখেছে চারপাশে।”
“তার বেশ ঘনিষ্ঠ আপনি, বুঝতে পারছি।”
“ওর বিশেষ খেয়াল রাখার চেষ্টা করি। এখানে আমার চেয়ে ভালো করে অ্যালিসিয়াকে কেউ চেনে না, এমনকি প্রফেসর ডায়োমেডেসও না।”
ইউরির কণ্ঠে প্রচ্ছন্ন গর্ব। কিছুটা বিরক্ত হলাম ব্যাপারটায়। আসলেও ভালো করে চেনে কি না সে ব্যাপারে এখন সন্দেহ হচ্ছে।
“সে যে এখানে আসার পর থেকে কারো সাথে কোন বিষয়ে কথা বলেনি, এ সম্পর্কে আপনার মতামত কি? কেন এই নীরবতা?”
কাঁধ ঝাঁকালো ইউরি। “এখনও বোধহয় কথা বলতে তৈরি নয় সে। যখন স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে, তখন বলবে।”
“স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে মানে?”
“সত্যটা বলতে কোন সমস্যা থাকবে না যখন, বন্ধু।”
“আর সেই সত্যটা কি?”
একদিকে ঘাড় কাত করলে আমাকে কিছুক্ষণ দেখলো ইউরি। কিছুক্ষণ পর যে প্রশ্নটা করলো তাতে অবাক না হয়ে পারলাম না।
“আপনি কি বিবাহিত, থিও?”
“হ্যাঁ,” মাথা নেড়ে বললাম।
“সেটাই ভেবেছিলাম। আমিও বিবাহিত ছিলাম এক সময়। লাটভিয়া। থেকে স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ইংল্যান্ডে এসেছি। কিন্তু এখানে আসার পর আমি যেভাবে খাপ খাইয়ে নিয়েছি, সে পারেনি। চেষ্টাও করেনি আসলে। ইংরেজি শেখার ব্যাপারে কোন আগ্রহ ছিল না। যাইহোক, আমি নিজেও যে খুব খুশি ছিলাম, তা নয়। তবে সেটা কখনো মুখ ফুটে স্বীকার করতাম না। নিজেকে নিজেই ভুলভাল বোঝাতাম…” বাকি বিয়ারটুকু এক চুমুকে খালি করে ফেললো সে। “কিন্তু একসময় সত্যিকারের ভালোবাসার সন্ধান পাই।”
“আর সেটা নিশ্চয়ই অন্য কারো মধ্যে?”
হেসে মাথা নাড়লো ইউরি। “হ্যাঁ, আমাদের প্রতিবেশী এক মহিলা। খুব সুন্দরি। প্রথম দর্শনেই প্রেমে পড়ে যাই বলতে পারো,” আমাকে তুমি করে বলা শুরু দিয়েছে সে। বিরক্ত হলেও চেপে গেলাম। একদিন হঠাৎই রাস্তায় দেখি তাকে। এরপর প্রথমবার কথা বলার মত সাহস যোগাতে বেশ সময় লাগে। প্রায়ই অনুসরণ করতাম, দূর থেকে দেখতাম তার অগোচরে। আবার বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতাম, যাতে জানালায় আসলে দেখতে পাই তাকে।” হাসলো ইউরি।
গল্পটা আর ভালো ঠেকছে না এখন। অবশিষ্ট বিয়ারটুকু শেষ করে হাতঘড়ির দিকে তাকালাম। আশা করছিলাম যে ইঙ্গিতটা ধরতে পারবে সে, কিন্তু সেরকম কিছু হলো না।
“একদিন তার সাথে কথা বলার চেষ্টা করি আমি। কিন্তু আমার প্রতি একদমই আগ্রহী ছিল না সে। এরপরেও আরো কয়েকবার চেষ্টা করি, শেষমেষ আমাকে জানিয়ে দেয় যাতে ওভাবে বিরক্ত না করি।”
মহিলাকে দোষ দেয়া যাবে না, ভাবলাম। আমিও কোন একটা অজুহাত দিয়ে উঠে যাবো শিঘ্রই। ইউরির কথা থামার কোন লক্ষণ নেই।
“ব্যাপারটা মেনে নিতে বেশ কষ্ট হয়। ধরেই নিয়েছিলাম যে সে আমার একদম আদর্শ জীবনসঙ্গি। হৃদয় ভেঙে খানখান হয়ে যায়। প্রচণ্ড রাগ হয় তার প্রতি। ভয়াবহ রাগ।”
“এরপর?” না জিজ্ঞেস করে পারলাম না।
“কিছুই না।”
“কিছুই না? তোমার স্ত্রীর সাথেই সংসার করেছে এর পরে?”
মাথা ঝাঁকিয়ে না করে দিল ইউরি। “না। ওর প্রতি টানটুকু তো আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঐ মহিলার প্রেমে পড়ার আগ অবধি ব্যাপারটা মানতে পারতাম না। মাঝে মাঝে সত্যটাকে স্বীকার করে নিতে অনেক সময়ের প্রয়োজন হয়। সাহসও দরকার।”
“বুঝলাম। তোমার ধারণা অ্যালিসিয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য? সে তার বিয়ের ব্যাপারে সত্যটা স্বীকার করে নিতে তৈরি নয় এখনও? হতেও পারে।”
কাঁধ ঝাঁকালো ইউরি। “এখন হাংগেরির একটা মেয়ের সাথে সম্পর্ক আমার। সবকিছু ঠিক থাকলে সামনে বিয়েও করবো। এক স্পা সেন্টারে চাকরি করে, ভালো ইংরেজি বলে। আমাদের জুটিটা একদম ঠিকঠাক। একসাথে ভালো সময় কাটাই।”
মাথা নেড়ে আবারো ঘড়ির দিকে তাকালাম। এবার আর কোটটা তুলে নিতে দ্বিধা করলাম না। “যেতে হবে এখন। আমার স্ত্রীর সাথে দেখা করতে দেরি হয়ে যাবে নাহলে।”
“ঠিক আছে, সমস্যা নেই। তোমার স্ত্রীর নামটা যেন কি?”
কোন একটা অদ্ভুত কারণে ইউরিকে নামটা বলতে ইচ্ছে করছে না। চাইনা যে ওর ব্যাপারে সে কিছু জানুক। কিন্তু এটা ছেলেমানুষী।
“ক্যাথরিন। ওর নাম ক্যাথরিন। কিন্তু আমি ক্যাথি বলে ডাকি।”
অদ্ভুত একটা হাসি ফোটে ইউরির মুখে। “একটা উপদেশ দেই, কিছু মনে করো না। বাড়িতে তোমার স্ত্রীর কাছে ফিরে যাও। ক্যাথির কাছে, যে ভালোবাসে তোমাকে…আর অ্যালিসিয়াকে নিয়ে মাথা ঘামিও না।”
.
১.১০
সাউথ ব্যাঙ্কের ন্যাশনাল থিয়েটার ক্যাফেতে গেলাম ক্যাথির সাথে দেখা করতে। রিহার্সেলের পর অভিনেতা অভিনেত্রীরা সাধারণত এখানেই সমবেত হয়ে আড্ডা দেয়। ক্যাফের একদম পেছনের দিকে কয়েকজন সহঅভিনেত্রীর সাথে গভীর আলোচনায় মত্ত সে। আমাকে এগোতে দেখে মুখ তুলে তাকালো সবাই।
“কান গরম হয়ে গেছে নাকি, ডার্লিং?” চুমু খেয়ে বলল ক্যাথি।
“কেন, গরম হবার কথা?”
“ওদের তোমার ব্যাপারে বলছিলাম।”
