আরেকটা শব্দ আলাদা করে লিখলাম একপাশে : শৈশব। গ্যাব্রিয়েল কেন খুন হয়েছে সেটা জানতে হলে শুধু সেই রাতে কি ঘটেছিল তা বের করলেই হবে না, অ্যালিসিয়ার অতীত সম্পর্কেও ঘাটাঘাটি করা প্রয়োজন। ঐ মুহূর্তে কেন স্বামীর ওপর গুলি চালিয়েছিল সে এর মুল প্রোথিত আছে অতীতে। কেন না একজন মানুষ হুট করে খুনে স্বভাবের হয়ে ওঠে না। ধীরে ধীরে তার ভেতরে বাসা বাঁধে ক্ষোভ। খুন সেই ক্ষোভেরই বহিঃপ্রকাশ। মানুষের শৈশব কেমন কেটেছে তার একটা প্রভাব আছে এর ওপরে।
যদি শৈশবে কেউ অত্যাচার বা অসাদাচরণের শিকার হয় তাহলে তার ভেতরে ধীরে ধীরে দানা বাঁধতে শুরু করে জিঘাংসা। আর একটা পর্যায়ে এই জিঘাংসারই উদগিরণ ঘটে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ক্রোধে অন্ধ হয়ে ভুল মানুষের ক্ষতি করে বসি আমরা। এজন্যেই অ্যালিসিয়ার শৈশব কেমন কেটেছে সেটা জানাটা জরুরি। অ্যালিসিয়া যদি নিজে সেসম্পর্কে কিছু জানাতে না পারে, তাহলে এমন কাউকে খুঁজে বের করতে হবে যে খুনের ঘটনাটা ঘটার অনেক আগে থেকেই ভাল করে চেনে তাকে।
ফাইলে অ্যালিসিয়ার নিকটাত্মীয়ের নাম লেখা লিডিয়া রোজ। সম্পর্কে ওর খালা হন মহিলা। সড়ক দুর্ঘটনায় অ্যালিসিয়ার মা মারা গেলে লিডিয়াই তার দেখাশোনা করা। দুর্ঘটনার সময় গাড়িতে অ্যালিসিয়াও ছিল, তবে বেঁচে যায় সে। সেই বয়সের একটা মেয়ের মানসিকতার ওপর এরকম একটা ঘটনা নিশ্চয়ই মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। আশা করি লিডিয়া এই ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে পারবেন।
লিডিয়া বাদে আরেকজন ব্যক্তির নাম পেলাম ফাইলে। ম্যাক্স বেরেনসন, অ্যালিসিয়ার আইনজীবী। ম্যাক্স হচ্ছে গ্যাব্রিয়েল বেরেনসনের বড় ভাই। অ্যালিসিয়া আর গ্যাব্রিয়েলের সম্পর্ক কেমন ছিল এটা নিশ্চয়ই সে বলতে পারবে। তবে আমার সামনে মুখ খুলতে রাজি হবে কি না কে জানে। একজন সাইকোথেরাপিস্ট হয়ে অ্যালিসিয়ার পরিবারের লোকজনের সাথে এভাবে অযাচিত কথা বলতে চাওয়াটা একটু অদ্ভুতই বটে। সচরাচর সাইকোথেরাপিস্টরা এমন কিছু করে না। ডায়োমেডেস অনুমতি দিবেন কি না সে নিয়েও সংশয় আছে। এর চেয়ে বরং তাকে কিছু জিজ্ঞেস না করাই উত্তম।
অ্যালিসিয়ার জন্যে আমি নিয়মের বাইরে গিয়ে যা যা করেছি, তার সূচনা হয়েছিল এই ঘটনাটার মাধ্যমেই। সেখানেই থামা উচিৎ ছিল আমার। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে যায়। ভাগ্যদেবী ইতোমধ্যে লিখে ফেলেছিলেন যে ভবিষ্যতে আমার জন্যে কি অপেক্ষা করছে, গ্রিক ট্র্যাজেডিগুলোর মতন।
ফোনের দিকে হাত বাড়ালাম। অ্যালিসিয়ার ফাইলে থেকে ম্যাক্সের নম্বরটা আগেই টুকে নিয়েছি। কয়েকবার রিং হবার পর ফোন ধরলো কেউ।
“এলিয়ট, ব্যারো এবং বেরেনসনের অফিস থেকে বলছি।” রিসিপশনিস্টের কণ্ঠস্বর শুনে মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা লেগেছে।
“মি, বেরেনসনকে দিন।”
“কার সাথে কথা বলছি সেটা জানতে পারি?”
“আমার নাম থিও ফেবার। গ্রোভের একজন সাইকোথেরাপিস্ট। মি. বেরেনসনের সাথে অ্যালিসিয়ার ব্যাপারে কিছু কথা ছিল।”
জবাব আসতে এবারে কিছুটা সময় লাগলো। “ওহ, আচ্ছা। আসলে মি. বেরেনসন এই সপ্তাহটা আর অফিসে আসবেন না। এডিনবার্গে এক মক্কেলের সাথে দেখা করতে গিয়েছেন। আপনার নম্বরটা জানিয়ে রাখুন, তিনি ফিরলে আমি বলবো যোগাযোগ করতে।”
নম্বর দিয়ে ফোন কেটে দিলাম।
এরপর ফোন দিলাম লিডিয়া রোজের নম্বরে।
একবার রিং হবার পরেই কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ওপাশ থেকে। “হ্যাঁ? কি চাই?”
“মিস রোজ?”
“কে আপনি?”
“আপনার ভাগ্নি, অ্যালিসিয়া বেরেনসনের ব্যাপারে কথা বলার জন্যে ফোন দিয়েছিলাম। আমি গ্রোভের একজন সাইকোথে
“যত্তসব বালছাল।” কেটে গেল লাইন।
ভ্রু কুঁচকে ফেললাম।
পরিস্থিতি সুবিধের মনে হচ্ছে না।
.
১.৯
সিগারেটের তেষ্টা পেয়েছে ভীষণ। গ্রোভ থেকে বের হবার সময় কোট পকেট হাতড়ে আবিষ্কার করলাম যে প্যাকেটটা নেই।
“কিছু খুঁজছেন নাকি?”
ঘুরে তাকিয়ে দেখি ইউরি আমার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে। তার আসার কোন শব্দই পাইনি, তাই এভাবে কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ভড়কে গেলাম।
“নার্স স্টেশনে পেয়েছি।” মুখে দরাজ হাসি ঝুলিয়ে সিগারেটের প্যাকেটটা সামনে বাড়িয়ে দিল সে। “আপনার পকেট থেকে পড়ে গিয়েছিল নিশ্চয়ই।”
“ধন্যবাদ।” একটা সিগারেট ধরিয়ে ফেললাম দেরি না করে। ইউরিকেও সাধলাম কিন্তু হেসে মানা করে করে দিল। “সিগারেটের নেশা নেই আমার। আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে ড্রিঙ্কসের প্রয়োজন। চলুন, বিয়ারের খরচ আমার।”।
ইতস্তত করতে লাগলাম। সহকর্মীদের সাথে যতটা সম্ভব কম মেলামেশা করেই অভ্যস্ত আমি। তাছাড়া ইউরির সাথে আলাপচারিতা চালানোর মত বিষয়ও খুব বেশি নেই। কিন্তু গ্রোভের অন্য যে কারো চাইতে অ্যালিসিয়া সম্পর্কে ইউরিই সবচেয়ে ভালো জানে। তাই তার মন্তব্য আমার কাজে আসতে পারে।
“চলুন তাহলে,” বললাম।
স্টেশনের কাছে অবস্থিত একটা পাবে গেলাম আমরা। পাবের নামটা অদ্ভুত, দ্য টান্ড ল্যাম্ব। ভেতরটা আঁধারে আচ্ছন্ন, বেশ বয়স হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। পাবের অধিকাংশ কাস্টোমারের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। হাতে বিয়ারের গ্লাস নিয়ে সিটে বসে ঢুলছে অনেকে। ইউরি দুই ক্যান বিয়ার নিয়ে এলে পাবের একদম পেছনে গিয়ে বসলাম আমরা।
