উল্টোদিকে ওকে এভাবে ঢুলুঢুলু চোখে, ঔষধের ঘোরে স্থাণুর মত বসে থাকতে দেখে হঠাৎই গভীর বিষণ্ণতায় ছেয়ে উঠলো মন। ওর মত এরকম পরিস্থিতিতে যারা আছে, তাদের সবার জন্যে খারাপ লাগছে ভীষণ। তারাও তো আমাদের মতনই মানুষ।
তবে মনে মনে এসব ভাবলেও মুখে কিছু বললাম না। বরং আমার জায়গায় রুথ থাকলে যে কাজটা করতো, সেটাই করলাম।
চুপচাপ ঘরটায় বসে রইলাম দুজনে।
.
১.৮
ডেস্কের ওপর রাখা অ্যালিসিয়ার ফাইলটা খুললাম। ডায়োমেডেস নিজ থেকেই দিয়েছে এটা। “আমার নোটগুলো অবশ্যই পড়ে নেবে। কাজে আসতে পারে।”
কিন্তু নোটগুলোয় নজর বুলানোর কোন ইচ্ছেই ছিল না আমার; অ্যালিসিয়া সম্পর্কে তার কি ধারণা সেটা জেনে গিয়েছিলাম ততক্ষণে। আমার নিজের কি ধারণা তা জানা দরকার। তবুও ফাইলটা নিয়েছিলাম চুপচাপ।
“ধন্যবাদ। আসলেও কাজে দিবে এগুলো।”
আমার অফিসটা ছোট হলে বেশ গুছোনো। ভবনের শেষ মাথায়, ফায়ার এসকেপের পাশেই। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। একটা ছোট কালো পাখি জমে যাওয়া ঘাসের মধ্যেই ঠোকরা ঠুকরি করছে, তবে কিছু পাবে বলে মনে হয় না।
কেঁপে উঠলো আমার শরীর। ঘরটায় প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। জানালার পাশের রেডিয়েটরটা নষ্ট। ইউরি বলেছে সে একবার চেষ্টা করে দেখবে যে ওটা ঠিক করা যায় কি না, কিন্তু স্টেফানিকে বলাটাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তাতেও লাভ না হলে কম্যুনিটি মিটিংয়ে কথাটা পাড়তে হবে। এলিফের প্রতি হঠাই সহমর্মিতা জেগে উঠলো মনে, লাঠিটা ভেঙে যাওয়ায় তারও নিশ্চয়ই আমার মতনই অনুভূতি হয়েছে।
আনমনে অ্যালিসিয়ার ফাইলটা উল্টাচ্ছি, খুব বেশি কিছু পাবো এখান থেকে সেই আশা করছি না। আমার যা তথ্যের দরকার ছিল তার বেশিরভাগই অনলাইন ডাটাবেজ থেকে পেয়ে গেছি ইতোমধ্যে। কিন্তু ডায়োমেডেস এখনও আদ্দিকালের মতন সবকিছু হাতে লিখতে পছন্দ করেন (স্টেফানির আপত্তি সত্ত্বেও)। আর সেজন্যেই এখন এই পেটমোটা ফাইলটা ওল্টাতে হচ্ছে আমাকে।
ডায়োমেডেসের নোটগুলোয় অ্যালিসিয়া সম্পর্কে তার নিজস্ব সেকেলে মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ আছে বিস্তর। তবে সেগুলো পাত্তা না দিয়ে আমি নার্সদের লেখা রিপোর্টগুলোয় মনোযোগ দিলাম, এখান থেকে তার দৈনন্দিন জীবনের আচার-ব্যবহার সম্পর্কে বেশ পরিস্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তাই এ সংক্রান্ত সবগুলো তথ্য লক্ষ্য করলাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। যে কাজটা করতে যাচ্ছি, আগে থেকে সে ব্যাপারে বিশদ ধারণা থাকলে কাজে সুবিধা হবে। নতুবা দেখা যাবে হুটহাট নতুন কোন তথ্য সামনে আসাতে চমকে গেছি।
তবে খুব বেশি কিছু জানতে পারলাম না। এখানে ভর্তি হবার পর অ্যালিসিয়া দু’বার কব্জিতে ছুরি চালানোর চেষ্টা করেছে। এছাড়া হাতে কাছে যা পেতো সেটা দিয়েই নিজের শরীরের ওপর অত্যাচার চালানোর চেষ্টা করতো। তাই প্রথম ছয় মাস সার্বক্ষণিক দু’জন নার্স তার দেখাশোনা করে। এক পর্যায়ে গিয়ে দুজনের বদলে একজন নার্স বরাদ্দ করা হয় অ্যালিসিয়ার জন্যে। গ্রোভের অন্য রোগি বা স্টাফদের সাথে কখনো কথা বলেনি সে। দূরে দূরে থাকতো সবসময়। অন্যান্য রোগিরাও তাকে ঘাটায়নি। কেউ যখন কথার জবাবে কোন প্রতিক্রিয়া দেখায় না বা নিজ থেকে কখনো কোন আলাপ কওে না, তখন তার অস্তিত্ব এক প্রকার ভুলেই যায় লোকে। সেরকমই অ্যালিসিয়ার উপস্থিতিও সবাই উপেক্ষা করতে শিখে যায় কিছুদিনের মধ্যে।
তবে একটা ঘটনা আমার মনোযোগ আকর্ষণ করলো। অ্যালিসিয়া গ্রোভে ভর্তি হবার কয়েক সপ্তাহ পরে ক্যান্টিনে ঘটেছিল ঘটনাটা। এলিফের সিটে বসে পড়েছিল অ্যালিসিয়া, সেটা নিয়েই তাকে দোষারোপ শুরু করে তুর্কী মহিলা। ঠিক কি কারণে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়েছিল সে সম্পর্কে অবশ্য বিস্তারিত লেখা নেই, তবে পরিস্থিতি খুব দ্রুত নাগালের বাইরে চলে যায়। ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়ে অ্যালিসিয়া, একটা প্লেট ভেঙে সেটার ধারালো অংশ দিয়ে আক্রমন করে এলিফকে। আরেকটু হলেই গলায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল। কোনমতে তাকে আটকে ঘুমের ঔষধ দিয়ে আইসোলেশনে পাঠানো হয়।
ঠিক বলতে পারবো না, ঘটনাটা কেন আগ্রহোদ্দীপক মনে হলো আমার কাছে। শুধু মনে হচ্ছে, কিছু একটা গোলমাল আছে। এলিফকে সেদিনের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।
প্যাড থেকে একটা পাতা ছিঁড়ে নিয়ে কলম বের করলাম। এটা আমার বেশ পুরনো অভ্যাস। কাগজে কলমে কিছু না লেখা অবধি শান্তি পাই না। যে কোন ঘটনা সম্পর্কে কাগজে লেখার পরেই পরিস্কারভাবে ভাবতে পারি।
অ্যালিসিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য চিকিৎসা পদ্ধতি নিয়ে আমার মন্তব্যগুলো টুকে রাখলাম। অ্যালিসিয়াকে সাহায্য করতে চাইলে আমার আগে তাকে বুঝতে হবে। গ্যাব্রিয়েলের সাথে তার সম্পর্কটা কেমন ছিল সেটাও জানা প্রয়োজন। তাকে কি ভালোবাসত ও? নাকি ঘৃণা করতো? খুনের ঘটনাটা নিয়ে কিছু বলছে না কেন? এখন পর্যন্ত একটা প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।
একটা শব্দ স্পষ্ট করে লিখে নিচে দাগ দিলাম : অ্যালসেস্টিস।
ছবিটার সাথে গোটা ঘটনার নিগুঢ় সম্পর্ক আছে কোন, সেই সম্পর্কটা জানা গেলেই রহস্য উন্মোচন সহজ হয়ে যাবে। অ্যালিসিয়ার তরফ থেকে কিছু বলার বা ইঙ্গিত দেয়ার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে পেইন্টিংটা। কিন্তু ইঙ্গিতটা যে কি, সেটা ধরতে হবে আমাকে। লিখে রাখলাম যে আরো একবার গ্যালারিতে যাবো ছবিটা দেখার জন্যে।
