এখন কীরকম মনে হচ্ছে?
বুঝতে পারছি না ঠিক। একবার মনে হয় পালিয়ে যাই। পরক্ষণে যখন ভাবছি ব্যাপারটা, বুঝতে পারছি এভবে আমি বাঁচতে পারব না। বাবা কী করেছে এখন আর সেটা বড় না, আমি কী করেছি, এর পরিণতি মেনে নেয়ার সৎসাহস আমার আছে কিনা, কী করব শেষ পর্যন্ত, জানি না এখনও।
মারিয়ার দৃষ্টি না হয়ে এল। কার্লের খাওয়া দেখছে। কার্লোস, তার ভাই, মারা গেছে, কিন্তু সেজন্য ওকে দায়ী করতে পারছে না সে। এখন সে কার্লকে সাহায্য করতে চাইল।
তোমার বাবা এসেছিল। বাসায় ফিরে যেতে বলেছে তোমাকে। একটু ইতস্তুত করল মারিয়া। ধারণা করেছিল তুমি আসবে এখানে।
তুমি কী বললে?
তুমি ফিরে যাবে না। বলেছি, তুমি তাকে ঘৃণা করো, কাজেই কেন যাবে?
ঢেঁকুর তুলে প্লেটটা ঠেলে একপাশে সরিয়ে রাখল কার্ল।
আসলেও বোধহয় ঘৃণা করি, বিশেষ করে সত্যটা জানার পর। আগে ভয় পেতাম, শ্রদ্ধাও ছিল হয়ত, কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভীষণ ভয় করতাম: পাছে কোন কারণে রেগে যায় আমার ওপর। ধারেকাছে থাকলে পা টিপে টিপে চলেছি, মুখ খুলিনি সহজে। জানি এরকমটা হওয়া উচিত ছিল না, কিন্তু বাবার চোখে ধিক্কার দেখেছি, আমি তাকে খুশি করতে চেয়েছি, অথচ বুঝতে পারিনি কীভাবে করব। এখন আর পরোয়া করি না–অন্তত বাবাকে না।
ওর দিকে তাকাল মারিয়া। ধরতে পারল তফাতটা। যা ঘটে গেছে তা বদলে দিচ্ছে কার্লকে। এখনও তার ভয় কাটেনি, তবু চেহারায় ফুটে উঠেছে একটা স্থিরসংকল্প-ইতিপূর্বে ওর মাঝে যা সে দেখেনি। সমস্যা মোকাবেলা করছে ও, এড়িয়ে, যাচ্ছে না।
তবে ওর হৃদয়হীন বাবা যে ক্ষতি করেছে ছেলের পরিণামে তা ওকে উচ্ছৃঙ্খল করেছে, অন্যদের নিয়ে গেছে পাপের পথে। গ্রীন যে লোকটাকে সাবেক মাইনিং ক্যাম্পে হত্যা করেছে তাঁর কথা ভাবল মারিয়া, ভাবল গ্রীনকে অন্ধ আক্রোশে সে নিজে যে গুলিটা করেছিল তার কথাও। মারিয়া উপলব্ধি করল ঘৃণাবশত নির্দ্বিধায় সে মানুষ খুন করতে পারবে এবং ন্যায়সঙ্গত মনে করবে ব্যাপারটাকে।
রান্নাঘরে ফিরে গিয়ে ন্যাকড়া জড়িয়ে খাবারের পোঁটলা বাধল ও, খানিকটা কফি আর ছোট্ট একটা কেতলির সঙ্গে ওটা একটা ময়দার থলেতে রাখল। তারপর চারটে ম্যাচবাক্স ভরে থলেটা নিয়ে ফিরে গেল বসার ঘরে।
এই তোমার খাবার। এবার তুমি যাও। আমি যতক্ষণ না ডাকছি বাসাতেই থেকো। সাবধান থাকবে, বাছা। খোদার নাম জপে রওনা হয়ে যাও।
কার্ল বিদায় নেবার পর মুহূর্তের জন্য দুঃখ, হতাশায় ম্রিয়মাণ হলো মারিয়া। তারপর উদ্ধত অহঙ্কার ভর করল ওর উপর, সহসা একটা কিছু সংকল্প করে কার্লোসের রাইফেলটা আনতে উঠে গেল।
১০.
জেমস গ্রীন যখন হোটেল থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পিপার মকের দফতরে গেল তখন অনেক বেলা, সূর্য তেতে উঠেছে।
মক তার ডেস্কে বসে একগাদা ওয়ান্টেড পোস্টার ঘাটছিল, কিন্তু গ্রীন ঢুকতে সেগুলো একধারে সরিয়ে রেখে বলল, টেরিল তার ঘোড়া ফিরে পেয়েছে, ক্যানাডা যেটা ভাড়া করেছিল। আজ সকালে ওর ওয়াগন ইয়ার্ডের গেটের সামনে পেয়েছে।
সেক্ষেত্রে কার্ল হালাম এখন কোথায়? চিন্তিত গলায় বলল গ্রীন। শহরেই কোথাও লুকিয়ে থাকা সম্ভব?
সম্ভব। তবে আমার তা মনে হয় না। আমার বিশ্বাস এখন আরেকটা ঘোড়া জোগাড় করেছে সে। স্মিত হাসল মক। রাতে দাওয়াত কেমন খেলে?
ভাল। কেবল শেষ দিকে হালাম এসে পড়েছিল, অল্পের জন্য আমাদের মধ্যে মারামারিটা হয়নি।
গ্রীন খুলে বলল কী ঘটেছে, তবে মারিয়া ওকে দিয়ে হালামকে খুন করাতে চেয়েছিল সেটা এড়িয়ে গেল সযত্নে।
ওপর-নীচ মাথা ঝাঁকাল মার্শাল।
হালাম রাতে ছিল শহরে। আধঘণ্টাটেক আগে বাথানের দিকে রওনা দিয়েছে। উঠে দাঁড়িয়ে মক তার টুপি তুলে নিল। চল, আস্তাবলে যাই। ঘোড়াটা একবার দেখব আমি।
ওরা ওয়াগন ইয়ার্ডটা অতিক্রম করতেই টেরিল বেরিয়ে এল আস্তাবল থেকে। মককে বলল, আন্দাজ করেছিলাম ঘোড়াটা তুমি দেখতে চাইবে। যদিও জানি না কী লাভ হবে এতে।
কিছুই বলা যায় না।
তা অবশি। ও হ্যাঁ, ওই যে মেক্সিকান ছোকরা মারা গেছে, ওর ঘোড়াটা আজ সকালে নিয়ে গেছে ওর বোন। বাইরে যাচ্ছিল ও, আমি ভাবলাম ওটাই দিই, এমনিতেও ও-ই পাবে।
মক বলতে নিয়েছিল কিছু একটা, কিন্তু গ্রীন বাধা দিল।
কোথায় যাচ্ছে কিছু বলেছে?
না।
কতক্ষণ আগে?
টেরিল কাঁধ ঝাঁকাল।
মিনিট কুড়ি হবে।
আমার ঘোড়ায় জিন চাপাতে পারবে? এক্ষুণি?
নিশ্চয়, বলে ভেতরে ঢুকে গেল আস্তাবল মালিক।
চিন্তাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে মক তাকাল গ্রীনের দিকে। কোন ঝামেলা? জিজ্ঞেস করল।
তেমন কিছু না অধৈর্য সুরে জবাব দিল গ্রীন। কামনা করছে তা-ই যেন হয়। কিন্তু ও জানে হালামকে কোন চোখে দেখে মারিয়া। হালাম বাসার দিকে রওনা হবার পরপরই শহর ত্যাগ করেছে ও, ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না গ্রীনের!
কার্লের সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে? মক জিজ্ঞেস করল।
কাঁধ ঝাঁকাল গ্রীন, টেরিলেতে দেরিতে বিরক্ত বোধ করছে। অসম্ভব না।
ও নিজেই ঘোড়ার পিঠে জিন চাপাতে পা বাড়িয়েছে এই সময় বিশাল লাগাম ধরে স্টীলডাস্টটা টেনে নিয়ে এল আস্তাবল মালিক। একলাফে ওর পিঠে চড়ে বসল গ্রীন, মার্শালকে, পরে দেখা করব, বলে ছুটে বেরিয়ে গেল ওয়াগন ইয়ার্ড থেকে।
ঝড়ের বেগে পশ্চিমের রাস্তা ধরল ও। ভাবছে এখনও হয়তো সময় আছে। পাথুরে রাস্তায় ঢাক পেটবার মত আওয়াজ তুলল ওর ঘোড়ার খুর। শঙ্কিত বোধ করছে গ্রীন, বুঝতে পারছে মারিয়া যদি খুন করতে চায় হালামকে নির্ঘাত অ্যামবুশ করবে। কোথায় হতে পারে জায়গাটা অনুমান করতে চেষ্টা করল।
