অধিকাংশ মানুষই হয় বোকা এবং খুনী।
কিন্তু গ্রিংগ গ্রীন নয়। সত্যিকারের মানুষ ও। সে প্রায় খুন করতে বলেছিল ওকে, কিন্তু গ্রীন শুধু ওর হাত থেকে রাইফেলটা ছিনিয়ে নিয়েই ক্ষান্ত হয়েছে! অন্য কেউ হলে মারধোর করত তাকে, মাতাল হয়ে বেশ্যাপড়ায় গ্রিংগোরা হরহামেশা যেমন করে।
গ্রীন স্পর্শ করেনি তাকে। প্রাথমিক রাগ পড়ে যাবার পর বন্ধু ভাবাপন্ন হয়ে উঠেছে, এমনকী সে যখন মন্তব্য করেছে সব গ্রিংগোই বোকা তখন কৌতুক বোধ করেছে। সেজে একজন লোককে হত্যা করেছে ও, কিন্তু বিচলিত হয়নি সেজন্য। তবু খুনী ওকে বলা যাবে না।
বোকাও না, কারণ মুহূর্তে তার অন্তর দেখে নিয়েছে ও। সত্যি ওকে সে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, এক গ্রিংগো আরেক গ্রিংগোকে খুন করলে কী আসে যায়? কিন্তু এখন লজ্জা পাচ্ছে সে, নিজের কাছেই। এই উপলব্ধি মোটেই স্বস্তিকর নয়; কোন লোককে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে গিয়ে তার কাছে ধরা পড়লে মাথা হেঁট হয়ে যায় আপনা থেকেই।
বন্ধের সময় হয়ে আসছিল, ক্যান্টিনায় একবার উঁকি মেরে ভেজা তোয়ালে হাতে উঠনে ফিরে এল মারিয়া। টেবিল মুছে, লণ্ঠনটা নেভাতে একটা চেয়ারের ওপর উঠে দাঁড়াল।
সবে, নেমেছে ও এই সময়ে একটা শব্দ সচকিত করে তুলল ওকে। তারপর ফিসফিসে গলায় একটা ব্যগ্র কণ্ঠ ভেসে এল, মারিয়া ধক করে উঠল ওর বুক, কার্ল হালামের গলা চিনতে পেরেছে।
তাড়াতাড়ি ফটক খুলে দিল সে ভেতরে পা রাখল কার্ল, মৃদু হেসে বলল, আরেকবার এসেছিলাম, কিন্তু তোমার কাছে লোক ছিল। আরেকটু হলেই ধরে ফেলেছিল আমাকে।
ভয় পেয়েছে কার্ল, কিন্তু ওর সামনে নিজের দুরবস্থা হালকা করার প্রয়াস পাচ্ছে। এর কারণ উপলব্ধি করতে পারে মারিয়া। পশ্চিম বেপরোয়া, সহসী লোকদের দেশ কিন্তু কার্ল বেপরোয়া বা সাহসী কোনটাই নয়। তবে মারিয়া জানে কেবলমাত্র এই কারণেই ওকে আগলে রাখতে চায় সে-অনেকটা মা যেমন ছেলেকে করে হতাশাগ্রস্ত বেপরোয়া মানুষের প্রতি ওর এক ধরনের টান আছে; ইন্দ্রিয়সুখে ও একদা আসক্ত ছিল। জ্যোৎস্নালোকে মারিয়া কার্লের চেহারায় ভাবান্তরক্ষ করল, গম্ভীর মুখে মাথা নিচু করে নখ খুঁটছে,
কার্লোস মারা গেছে আমি জানি। কিন্তু কী বলব বুঝতে পারছি না। দুঃখিত বললে সবটা বলা হবে না। পলক তুলল কার্ল, আত্মধিক্কারে কণ্ঠ তেতো হয়ে আছে, আমিই এজন্য দায়ী। সব দোষ আমার। কেউ মরলে, আমারই মরা উচিত ছিল।
শ। কার্লোসের কথা শুনলে কীভাবে?
যে রাতে লাইল ক্যানাডা ওদের বাথানে উপস্থিত হয়েছিল এবং আড়ি পেতে সে কী শুনেছিল তার কথা মারিয়াকে জানাল ও কার্লোস হত বা ডিউক রিপ হাজতে আছে তা নয়, শুনেছিল গ্রীন নামে এক গোয়েন্দা তাকে খুজছে।
সেই থেকে, পালিয়ে শীপ ক্যাম্পে গিয়ে সেখানে কারোকে না পেয়ে, কোথাও দুদণ্ড স্থির হয়ে বসেনি ও, কেবলই ভেবেছে এখন আর কী করণীয়।
মেক্সিকো পালিয়ে যাব না আশপাশেই লুকিয়ে থাকব কোথাও। ক্যানাডা যে ঘোড়াটা ভাড়া করেছিল, পালাবার সময়-ওটাই চুরি করেছিলাম আমি। তারপর আজ বিকেলে যখন বাথানের কাছেই একটা ঝোঁপের মধ্যে বসেছিলাম, তখন দেখলাম বাবা আর স্টেজ শহরে যাচ্ছে। সুযোগ বুঝে বাথানে ঢুকে পড়ে মাঠ থেকে আমার নিজের ঘোড়াটা ধরে এনেছি। আমাদের বাবুর্চি, বুড়ো টিম ছাড়া সে সময় কেউ ছিল না কাছেপিঠে। দিনের বেলায় বাজার করতে ও শহরে এসেছিল ওই বলল কার্লোস মারা গেছে, ডিউক রিপ হাজতে আছে।
লিভারি স্ট্যাবলের ঘোড়াটা কী করেছ?
শহরে এনে, সন্ধ্যের পর টেরিলের আস্তাবলের কাছে ছেড়ে দিয়েছি। তারপর এসেছি এখানে।
এস আমার সাথে। কোন শব্দ করবে না।
হাত ধরে মারিয়া ওকে রান্নাঘরের পাশ দিয়ে ওর বাসায় নিয়ে গেল।
চুপ করে বস এখানে। ক্যান্টিনা বন্ধ করে তোমার জন্য খাবার আনছি। খিদে পেয়েছে নিশ্চয়?
খেতে পারব।
কার্লকে ওখানে রেখে বেরিয়ে এল মারিয়া। কোন খদ্দের ছিল না ক্যন্টিনায়, টেবিলগুলো সাফ করছিল ওয়েট্রেস, বারটেন্ডার তখনও আপনমতে বাজিয়ে চলেছে, তার গিটার এদেরকে সে জানাল এবার চলে যেতে পারে ওরা। তারপর বারটেন্ডার যখন সমস্ত বাতি নিভিয়ে বিদায় নিল, দরজায় তালা ঝুলিয়ে রান্নাঘরে ফিরে এল মারিয়া।
ওর রাধুনি অনেক আগেই চলে গেছে। মোটামুটি গরম ছিল খাবার, একটা প্লেটে সাজিয়ে সেগুলে ওর বসার ঘরে নিয়ে গেল ও। লন্ঠন ধরতে দেখল গদি ভাঁটা সোফায় হাত-পা ছড়িয়ে শুয়ে পড়েছে কার্ল, চোখে ঘুম।
খাও। পরে তোমার সঙ্গে আরও কিছু খাবার দিয়ে দেব। কিছুদিনের জন্য তোমার বোধহয় শীপ র্যাঞ্চে লুকিয়ে থাকাই ভাল। ঝরনায় পানি আছে, আমি একটা কম্বল দিচ্ছি।
বাসা থেকে আমি এক জোড়া কম্বল নিয়ে এসেছি।
বেশ। এখন খাও তারপর বল আমাকে, সেদিন ওরকম মাতলামি করেছিলে কেন তুমি। কীসের এত তিক্ততা, হতাশা তোমার মধ্যে? তুমি তো এরকম ছিলে না। হঠাৎ করে কী এমন ঘটল?
একটা টর্টিলা মুখে পুরল কার্ল, নিষ্প্রাণ সুরে হাসল।
বেশিকিছু না বলাই ভাল। কেবল এটুকু বলছি, আমি যা জেনেছি তাতে বাবার সম্বন্ধে আমার ধারণা চুরমার হয়ে গেছে। শ্রাগ করল কার্ল প্রথম যখন জানলাম, মাথা ঠিক রাখতে পারিনি তাই মদ খেতে শুরু করি। তারপর মনে হয় ওকে কষ্ট দিতে চেয়েছিলাম। জানি, পাগলামি করেছি। নিছক পাগলামি।
