আবহাওয়ার মত চকিতে বদলে গেল মারিয়ার মেজাজ। এক মুহূর্ত আগেও গ্রীনের ওপর ভয়ঙ্কর ক্ষিপ্ত হয়েছিল সে, কিন্তু এখন নারীসুলভ কোমলতায় নরম হয়ে গেল দৃষ্টি।
আমার চোখের সামনে ও বড় হয়েছে ওর নিঃসঙ্গতাকে বুঝতে পারি, বিশাল র্যাঞ্চ হাউসে ওই লোকটার সাথে একা থাকে, কোন মেয়ে নেই ওকে একটু স্নেহ মমতা দেবার জন্য। একটা পনি ছিল ওর, ছেলেবেলায় আমাদের শীপ ক্যাম্পে আসত কার্লোসের সঙ্গে খেলতে। একদিন আমার হাত চেপে ধরল ও তখন ওর বয়েস বছর দশেক হবে, বলল, তোমাকে ভালবাসি। এখন বুঝতে পারছ? ওই বাড়িতে ওকে ভালবাসার মত কেউ ছিল না।
আমাদের বাসায় আসতে নিষেধ করা হয়েছিল ওকে, তবু আসত। তারপর একদিন ওর বাবা এসে পনিটা কেড়ে নিয়ে গেল। কার্লকে বলল হেঁটে র্যাঞ্চে ফিরতে,.. মরুভূমি থেকে দীর্ঘ পথ। এই নোংরা মেক্সিকানদের কাছে যেন আর না আসিস। তাই শিক্ষা দিচ্ছি তোকে, আমাদের সবার সামনে ছেলেকে বলল সে। দক্ষিণে ওর ক্রীতদাস, তুলাবাগানে কাজ করে। আর এখানে ভেড়া চরায়-সব জংলী ভূত।
ঠিক এ কথাগুলোই বলেছিল সে। হেঁটে বাসায় ফিরল ছেলেটা। ওকে খবর আর পানির ক্যান্টিন দিয়েছিলাম আমি, আর কার্লোস এক জোড়া মোকাসিন কারণ কাউবয় বুট পরে বেশিদূর হাঁটতে পারবে না ও। আর কোনদিন ও আর্সেনি, বাবার ভয়ে কুঁকড়ে থেকেছে। তবে কার্লোসের সঙ্গে দেখা করত, মাঝে-মধ্যে আমিও কথাবার্তা বলেছি শহরে।
এবার বুঝেছ কেন-
রান্নাঘর থেকে আচমকা একটা চিৎকার ভেসে আসতে মাঝপথে চুপ করল মারিয়া। পরমুহূর্তে দড়াম করে দরজা খুলে উঠনে পা রাখল, ফ্রেড হালাম, শানের ওপর স্পার লাগানো বুটের শব্দ তুলে এগিয়ে এল হনহন করে, মুখ ঝোড়ো আকাশের মত অন্ধকার।
গ্রীনকে যখন চিনতে পারল মুহূর্তের জন্য বিস্ময়ের ছাপ ফুটল ওর চেহারায়
এখানে কী করছ তুমি? রূঢ় স্বরে জানতে চাইল হালাম।
ভার্জিল রীডের সাথে আজ কথা হয়েছে তোমার? পাল্টা প্রশ্ন করল গ্রীন।
হালামের চোখ দুটো সংকুচিত, সতর্ক হয়ে উঠল।
এই মেক্সের বাড়িতে তোমার আসার সঙ্গে রীডের কী সম্পর্ক।
কিছু না। আমি শুধু ওকে বলেছিলাম তোমার সাথে দেখা হলে জানাতে, আমি বলেছি তুমি যেন আমাকে না ঘাঁটাও। যাক, এখন আমি নিজেই সাবধান করতে পারব। সাহস থাকলে, এরপর নিজে লড়তে এস-অন্যকে লেলিয়ে দিও না। তবে আগেই সাবধান করে দিচ্ছি, আমার পেছনে লাগলে তোমার খুলি উড়িয়ে দেব আমি।
চেয়ারের পিঠে হাত রেখে ধনুকের ছিলার মত সটান দাঁড়িয়ে আছে মারিয়া গার্সিয়া, কর্তৃত্বপূর্ণ চেহারা, চোখজোড় আত্মাভিমানী, হিংস্র। ঠোঁটের কোণে একটা সিগারের গোড়া কামড়ে ধরেছিল হালাম। ওটা ছুঁড়ে ফেলে দিল দিল সে, থুতু ফেলল, মেঘ গর্জনের সুরে বিদ্রুপের হাসি হাসল।
আমাকে হুমকি দিচ্ছ? হাহ, ইচ্ছা করলেই তোমাকে আমি একতুড়িতে উড়িয়ে দিতে পারি-তুমি একা। কেউ তোমাকে সাহায্য করতে আসবে না! মকও না-আমার বিরুদ্ধে যাবার সাহসই হবে না ওর। আবার সশব্দে হাসল হালাম। আর তুমি কিনা হুমকি দিচ্ছে আমাকে।
রীডের স্যালুনে কেউ সাহায্য করেনি আমাকে।
ছিলাম না ওখানে, কাজেই বলতে পারব না।
গ্রীন একা না। এই প্রথম মুখ খুলল মারিয়া। অহঙ্কার উঁচু করে রেখেছে ওর মাথা, অহঙ্কার আর নিদারুণ ঘৃণা। তুমি এখানে এসেছ কেন?
ওর পানে তাকাল হালাম, ব্যঙ্গের হাসি খেলে গেল মুখে। বলছি, মেক্স। তোমার, নাগরের সামনে বলতে আমি ভয় পাই না। কার্লকে খুঁজতে। দেখেছ ওকে?
না। ও এখানে আসবে কেন?
কারণ: ও সবসময় তোমার স্কার্টের ছায়ায় ঘুরঘুর করে, মারিয়ার আপাদবক্ষ নজর বুলিয়ে হালাম বলল। পুরুষমানুষের বুঝতে অসুবিধে হয় না এটা। তুমি সুন্দরী, পুরুষের মাথা ঘুরিয়ে দেয়ার মত রূপ তোমার আছে। কাজেই ওর দোষ আমি দিই না, তোমার স্কার্ট চেপে ধরার
মুখ সামলে, হিসহিস করে উঠল গ্রীনের গলা।
জাহান্নামে যাও, হালাম জবাব দিল, তাকাচ্ছে না গ্রীনের দিকে। শুধু শুধু ভয়ে পালাচ্ছে কার্ল। তোমার সঙ্গে দেখা হলে বলবে, আমি তাকে বাসায় ফিরে আসতে বলেছি।
ও যাবে না। তোমাকে ও ঘৃণা করে কেন যাবে?
শ্রদ্ধা করে, এখন থেকে আরও বেশি করে করবে, খেঁকিয়ে উঠল হালাম।
ওর জন্য তোমার দরদ নেই, তোমার একমাত্র ছেলে। তুমি কেবল নিজের কথা ভাব। তোমার এত ভয় কীসের শুনি? কী লুকাতে চাও? যে ছেলের প্রতি দরদ নেই, তাকে খুঁজছ কেন?
খবরদার! এভাবে কথা বলবে না আমার সাথে। কালো হয়ে গেল হালামের মুখ, রাগে কাঁপছে গল। আমাকে প্রশ্ন করবে না, বোঝা গেছে, মেক্স? হুকুম বক্সব আমি, আর তোমরা চুপ করে তামিল করবে। একদম চুপচাপ, বুঝেছ?
মাথা নাড়ল গ্রীন। সংক্ষেপে বলল, হালাম, তুমি একটা গর্দভ, কথাবার্তাও তেমনি।
স্থাণুর মত দাঁড়িয়ে রইল মারিয়া, অদ্ভুতরকমের ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে শ্যামল চেহারা। বেরিয়ে যাও! এক্ষুণি! আর কক্ষনো আসবে না।
চকচক করছিল হালামের চোখ, ক্রুর হাসিতে ভরে উঠল মুখ। যাচ্ছি। ক্যান্টিন চালালে কী হবে, তোমার গায়ে এখনও ভেড়ার গন্ধ লেগে আছে। ওই একটা গন্ধ আবার আমার সহ্য হয় না।
ঝট করে টেবিলের ওপাশ থেকে পা বাড়াল মারিয়া, গ্রীন এগিয়ে যেতে ওর বাহু আঁকড়ে ধরে টাল সামলাল। হালামের হাসি চওড়া হলো!
