হয় মারা যাবে, নয়তো বুড়িয়ে যাবে অকালে, জবাবদিল গ্রীন, হাসি দুকান ছুঁয়েছে।
অন্যদিকে সরে গেল মেয়েটার চোখ, হাসি থেমে গেছে আচমকা।
তুমি বস এখান। অমি খাবার নিয়ে আসছি।
ওর গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইল, গ্রীন, ভরাট যৌবনের হিল্লোল উপভোগ করল। আরেকবার টেকুইলা পান করল সে, এবার খাওয়া সহজ হলো অনেক। তারপর পা ছড়িয়ে আরাম করে বসল ও, সারা দিনে যে ধকল গেছে, পানীয়ের প্রভাবে তার ক্লান্তি দূর হয়ে যাচ্ছে।
নাপিতের চেয়ারে চোখ বুজে বসে থাকার সময় যে চিন্তাটা বিব্রত করেছিল ওকে এখন সেটা আবার ফিরে এল। গ্রীন কিছুতেই ভেবে পায় না যে মহিলা খুন করতে উদ্যত হয়েছিল ওকে; সে কেন হঠাৎ করে তাকে রাতে খাওয়ার দাওয়াত দিল।
এর একটাই জবাব পেল গ্রীন, একমাত্র সমাধান: মারিয়া গার্সিয়া কিছু চায় তার কাছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে একটা ভাপ ওঠা মাটির ডিশ হাতে ফিরে এল মারিয়া, রাখল টেবিলে।
ভেড়া। আর এক মিনিট অপেক্ষা কর।
ঘন সুবাসিত ঝোলের ওপর চাক চাক ভেড়ার মাংস ভাসছে। এরপর বড় প্লেটভর্তি ফ্রিওলস নিয়ে ফিরে এল মারিয়া, মাংস আর লাল গোলমরিচ দিয়ে ভুনা করা। এ ছাড়াও রয়েছে কয়েক থালা ট্যাকোস বা স্মোকড টর্টিলা। গ্রীনের পাতে ভেড়ার মাংস তুলে দিয়ে উল্টো দিকে বসল মারিয়া; সকালে নাস্তার পর থেকে আর কিছুই খায়নি গ্রীন, গোগ্রাসে খেতে শুরু করল। ফ্রিওলসটা খুব ঝাল, স্মোকড টর্টিলা আর মাংস গুরুপাক, সুস্বাদু। খাওয়ার মাঝপথে ক্ষমা প্রার্থনা করে উঠে গেল মারিয়া, ফিরে এল কয়েক বোতল ঠাণ্ডা বিয়ার হাতে। গ্রীন ভরে নিল একটা গ্লাস, পান করে ঝাল দূর করুল কিছুটা।
ধীরে ধীরে খাচ্ছে ও, সবশেষে টর্টিলা খেয়ে খালি করল প্লেট। মারিয়া খায়নি বিশেষ, এটা ওটা মুখে দিয়েছে শুধু গ্রীন যখন তৃপ্তির একটা সেঁকুর তুলে চেয়ারে হেলান দিল, আঁসি ফুটল ওর মুখে।
পেট ভরেছে?
মৃদু হেসে ঘাড় কাত করল গ্রীন। খাবার সুস্বাদু হলে জীবনটা খুব সুন্দর মনে হয়। তবে আমার বোধহয় এসব বলা ঠিক হচ্ছে না। তোমার জন্য খুব ভাল ছিল না, আজকে দিনটা
না।
রমণীয় ভঙ্গিমায় উঠে দাঁড়াল মারিয়া, এটো থালাবাসন গোছাতে শুরু করল। গ্রীন উপলব্ধি করল ওর সহ্যক্ষমতা অসীম, ব্যথা-বেদনা কাবু করতে পারবে না সহজে, কাজের মধ্যে ভুলে থাকবে সমস্ত জ্বালা।
খাওয়া-দাওয়ার পর এখন আর বিদায় নিতে মন চাইছিল না গ্রীনের। ও যখন উঠতে নিল, তীক্ষ্ণ সুরে মারিয়া জিজ্ঞেস করল, কোথায় যাচ্ছ?
এই তোমার উঠনে পায়চারি করে একটু হাওয়া খাব।
টেকুইলা রেখে যাচ্ছি। খাও। হজমের জন্য উপকারী।
উঠে দাঁড়িয়ে টানটান পেটে আদরের চাপড় মারল গ্রীন, হেসে বলল, এই একটা জায়গা যেটা নিয়ে কখনও ঝামেলা হয়নি আমার।
দেয়ালের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ফুলের গন্ধ শুকল ও। কড়া তবে মদির। প্রাচীরের গায়ে ফটকটা ভারি মজবুত কাঠের, বাদামি রঙ করা, গ্রীনের কাঁধ সমান উঁচু। ওপর দিয়ে অন্ধকারে তাকাল সে, রাস্তার ওপাশে কয়েকটা আলোকিত জানালা চোখে পড়ল।
অন্ধকারে প্রাচীন গির্জার গম্বুজটা সম্ভ্রম জাগায় মনে। ওপরে তারাজ্বলা আকাশ, লণ্ঠনের মত মিটমিট করে জ্বলছে। পুবের চাঁদ এখন মাথার ওপরে; পাহাড়ি বাতাস শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে মরুভূমির বুকে। বারটেন্ডারের গিটার বাজনা শুরু হয়েছে আবার, মৃদু সুরে।
চলে আসছিল গ্রীন, এই সময় হঠাৎ সে ছুটন্ত পদশব্দ শুনতে পেল।
পাই করে ঘুরে দাঁড়াল ও, ফটকের ভারি হুড়কোটা নামিয়ে বেরিয়ে এল গলিতে। এক দৌড়ে পৌঁছে গেল মোড়ে, চন্দ্রালোকিত রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে এক লোক, পা ফেলার অলে তালে, ভেসে আসছে ওর বুটের আওয়াজ। কোন তরুণ হবে, নইলে এত জোরে ছুটতে পারত না।
পরক্ষণে অদৃশ্য হলো ছায়ামূর্তি, আবার নিঝুম হয়ে গেল রাত… তবে গ্রীনের বুঝতে ভুল হয়নি। লোকটা ঘাপটি মেরে বসেছিল ফুটকের বাইরে, নজর রাখছিল, অপেক্ষা করছিল। হাচ? তাকে শেষ করতে কোন ভাড়াটে বন্দুকবাজ পাঠিয়েছিল ভার্জিল? বিশ্বাস হতে চাইল না গ্রীনের। লণ্ঠনের আলোয় বসে সে যখন আহার করছিল তখন তাকে গুলি করার মত যথেষ্ট সুযোগ পেয়েছিল লোকটা।
তবে যে-ই হোক, সন্দেহ নেই, কারও নজরে পড়তে চায়নি সে।
ফিরে এল গ্রীন। হুড়কোটা জায়গামত বসিয়ে বন্ধ করল ফটক। ওর পেছন থেকে মারিয়া কড়া গলায় জানতে চাইল, কী করছ?
এই ঘুরে-ফিরে দেখছি একটু।
টেকুইলার বোতল বাদে আর সবকিছুই টেবিল থেকে সরিয়ে ফেলেছিল মারিয়া, লন্ঠনের আলোয় দাঁড়িয়ে জরিপ করে ওকে চোখে তিরস্কার।
মিথ্যে কথা বললে কেন? কারও পায়ের আওয়াজ পেয়েছ তুমি-আমি নিজেও শুনেছি। মিথ্যেকথা বললে কেন?
ইচ্ছে করে বলিনি, জবাব দিল গ্রীন, বিরক্তি বোধ করছে। আসলে তোমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাইনি আমি।
আমাকে দুশ্চিন্তায় ফেলতে চাওনি! পুরুষ্টু ঠোঁট দুটো ওলটাল মারিয়া। তোমার ধারণা আমি দুশ্চিন্তা করি? ঘৃণা করি, কিন্তু দুশ্চিন্তা–কক্ষনো না!
এগিয়ে এসে চেয়ারে বসল গ্রীন, তাকিয়ে আছে শ্যামাঙ্গিনীর দিকে।
জানি। ফ্রেড হালামকে ঘৃণা কর তুমি। কিন্তু ওর ছেলেকে না। বুরং, ওর পক্ষেই আছ, এমনকী স্টেজ ডাকাতির পরিকল্পনাটী ওর, তা জানার পরেও? ওর ওপর তোমার এত দরদ কেন?
