তাই পেতে যাচ্ছে স্যাম, সম্ভবত দুটো কাজ, কঠিন সুরে বলল হালাম। তোমার ওপর কখন নির্ভর করা যায় আমি বুঝি, কিন্তু
একটা লোকের কাছে কত আশা কর তুমি শুনি? তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল হার্ভে স্টেজ। কাল রাতেই একটা কাজ সেরেছি আমি, মনে নেই। তবে ওটাই শেষ।
আমরা একসুতোয় বাঁধা, যুক্তি দেখাল হালাম। কাজেই আমরা যে যা-ই করি কেন, দুজনের জন্যেই করি। তাই না?
সেজন্যেই বুঝি তুমি থাক প্রাসাদে, আর আমি আস্তাবলের বাংকে, তিক্ত সুরে বলল স্টেজ। তুমি ক্যানসাস সিটিতে গিয়ে ফুর্তি কর, আর আমি পচে মরি এই পচা শহরে।
আগে কখনও অভিযোগ করনি তুমি,জবাব দিল-হালাম, অবাক হয়েছে।
বলিনি কারণ সবকিছুই সুন্দরভাবে চলছিল। এখন অন্যরকম মনে হচ্ছে। ডার্লিংয়ের মত অবস্থা হচ্ছে আমার, খালি পেছনে তাকাতে ইচ্ছে করে, মনে হয় কেউ বুঝি তাড়া করছে আমাকে। পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করে, ডার্লিংয়েরও বোধহয় সেরকমই তলব, মনে হচ্ছে অতীত কোণঠাসা করে ফেলেছে আমাকে। আর এর জন্য দায়ী-তোমার ছেলে।
তুমি আর ড্রাম শুধু শুধু ভয় পাও, হালাম বিরক্ত।
মনে হয় না। অন্তত গ্রীনকে না। তুমি ওর ব্যাপারে চিন্তিত, আর আমার বিশ্বাস ওকে কেনা যাবে। এই পেশায় যারা আছে তাদের টাকা পয়সা নেই বিশেষ। হাজারখানেক ডলার ধরিয়ে দিলেই আর থাকবে না এখানে আমরাও হাঁপ ছেড়ে বাঁচব।
বোকার মত কথা বল না, হালামের কণ্ঠে ঝাঁঝ। গ্রীনের মত লোককে কেনা যায় না-মেরে ফেলতে হয় :
স্যামকে বল!
তাই বলব। তুমি বরং এবার তোমার কাজে যাও।
ওঠার কোন চেষ্টাই করল না হার্ভে স্টেজ। সরাসরি তাকাল হালামের দিকে। আবার সেই বিদ্রোহের পূর্বাভাস পেল র্যাপার। আমাকে হুকুম করবে না, স্টেজ বলল। আরেক দফা মদ খাব, সাপার সারব হোটেলে গিয়ে-তারপর যাব।
বেশ,জবাব দিল হালমি। চেয়ার ঠেলে উঠে দাঁড়াল সে। তোমার যেমন মর্জি, বলে গটগট করে বেরিয়ে গেল বার-কামরা ছেড়ে।
০৮.
ক্যান্টিনটা বিশেষ বড় নয়। নানারকমের শাকসবজি আর মশলার গন্ধ ভুরভুর করছে। একদিকের দেয়ালে সারবাধা টেবিল, মিটমিট করে জ্বলছে অনেকগুলো মোম। মেক্সিক্যান, আমেরিকান দুই ধরনের খাবারই পাওয়া যায়। পরিবেশনের দায়িতে, আছে একটি মেয়ে। গায়ে লাল জিপসি ব্লাউজ, মিষ্টি একটুকরো হাসি সারাক্ষণ লেগে থাকে মুখে। উল্টো দিকে বার। কৃষ্ণকায় সুদর্শন এক লোক আপনমনে, নিচু গলায় করুণ সুরে গান গাইছিল গিটার বাজিয়ে, মেক্সিক্যানদের অতি প্রিয় একটা প্রেমসংগীত। গ্রীন ঢুকতে বাজনা থামিয়ে গিটারটা বারের নীচে রেখে দিল সে। গ্রীনের আপাদমস্তক ভাল করে একবার জরিপ করে, পেছনের একটা পর্দার ওপাশে অদৃশ্য হলো।
ধীর পদক্ষেপে এগোল গ্রীন! নিচু সিলিং থেকে কয়েকটা তামার লণ্ঠন ঝুলছে। লালচে আলোয় ওর সদ্য দাড়ি কামানো মুখে গুটিকতক জখমের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে মাত্র। যখন টুপি সরাল ঘন কালো চুলে নাপিতের কাচির দাগ বেরিয়ে পড়ল।
অল্পক্ষণের মধ্যে বেরিয়ে এল মারিয়া। প্রশান্ত কমনীয় মুখশ্রী; ডাগর কালো চোখজোড়া উজ্জ্বল, গম্ভীর। পোশাক বদলে এখন ধূসর রঙের স্কার্ট পরেছে, গলা আর আস্তিনের মুড়ি সাদা। চুল টেনে আঁচড়ে বেনী করেছে পিঠের কাছে।
খুব সংক্ষেপে অভ্যর্থনা জানাল ও। এস।
পুঁথির পর্দা সরিয়ে ভেতরে যাবার সময় মাথা নিচু করল গ্রীন, বড়সড় রান্নাঘরে ঢুকল মারিয়াকে অনুসরণ করে। গরম গরম খাবারের গন্ধে পানি এসে গেল ওর জিভে। দেখল, হৃষ্টপুষ্ট বয়স্কা এক মহিলা ডিম দিয়ে ময়দা ছেনে কেক তৈরি করছে।
মারিয়া ভেতর বাড়ির দরজাটা খুলে দিতে, চুনসুরকির পাঁচিলে ঘেরা শান বাঁধানো ছোট্ট একটা উঠনে পা রাখল গ্রীন। দেয়াল জুড়ে বাগান। রকমারি মরু লতাপাতা আর ফুলের ঝাড় রয়েছে। ছোট বড় বিভিন্ন আকৃতির লাউ আর লাল, হলুদ গোলমরিচের ছড়া ঝুলছে জাফরি কাটা মাচান থেকে। একধারে ভারি ওক কাঠের টেবিল আর খানকতক চেয়ার পাতা। টেবিলের ওপর, মাচান থেকে চৌকোমত একটা লণ্ঠন জ্বলছে। তার আলোয় রঙিন মায়াবী হয়ে উঠেছে পরিবেশ।
সপ্রশংস দৃষ্টিতে বাগানটা দেখল গ্রীন। স্মিত হেসে মারিয়াকে বলল, চমৎকার। আমাকে তুমি দাওয়াত করেছ, সেজন্য আমি আনন্দিত।
আমি অতিথি পছন্দ করি। ঝট করে টেবিলের দিকে ঘুরল মারিয়া। টেকুইলার বোল আর দুটো বড় গ্লাস রাখা আছে ওখানে। পাশেই ছোট ছোট দুটো পিরিচে খানিকটা লবণ আর লেবুর কোয়া।
টেকুইলা ভালবাস তুমি?
খাইনি কখনও। আমাদের ওদিকে পাওয়া যায় না। শুধু হুইস্কি আর বিয়ার।
এভাবে খাবে।
বাঁ হাতের পিঠে একচিমটি লবণ রাখল মারিয়া, লেবুর একটা কোয়া তুলে নিল। লবণ চাখল ও, লেবু চুষল, তারপর টেকুইলার গ্লাস তুলে নিয়ে পান করল একঢোকে নির্জলা, চোখের পাতা না ফেলে। গ্রীনের দিকে তাকাল মারিয়া, এই প্রথম সামান্য হাসির রেখা ফুটেছে মুখে।
এবার তুমি খাও, বলল ও।
মারিয়ার অনুকরণে ছোট্ট আচার অনুষ্ঠানটি পালন করল গ্রীন; লবণ আর লেবুর স্বাদ বিদঘুঁটে ঠেকল জিভে জ্বালাময় পানীয়টা গলায় ঢেলে দিল ও, মুখ হাঁ করে গিলে ফেলার সময় ভয় হলো, আদৌ সে ওটা নীচে নামতে পারবে কিনা। মাথা পেছনে হেলিয়ে কিশোরীসুলভ হাসিতে ফেটে পড়ল মারিয়া। তোমার মুখ! খুব কড়া?
