ইতোমধ্যে বড়শি নিয়ে ক্রীকে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে স্যাম গার্ট। সন্ধের আগে আগেই কয়েকটা বেস (Bass) ধরে ফেলল, সবকটাই হৃষ্টপুষ্ট। মাছগুলো একে তো ছিল ক্ষুধার্ত, তারওপর বড়শি সম্পর্কে একেবারে অনভিজ্ঞ, তাই টোপ ফেলার সঙ্গে সঙ্গে গিলে নিয়েছে।
মাছ খেতে ভালই লাগল। কেউ কিছু বলছে না বটে, কিন্তু সবাই জানি, রসদ ফুরিয়ে এসেছে আমাদের। ড্রাইভের শুরুতে করা হিসেব অনুসারে যত দিন যাবে ধরা হয়েছিল, ততদিন যাবে না। চলার পথে শিকার করার ইচ্ছে ছিল আমাদের, রসাদের তালিকায় তা বিবেচনাও করা হয়েছিল; কিন্তু এ পর্যন্ত তেমন কোন শিকার চোখে পড়েনি; এবং কোন বলদও জবাই করিনি, কারণ এর প্রতিটাই দরকার হবে আমাদের। বলদ ছাড়াও, উঠতি কিছু স্টকের ওপর নির্ভর করছি আমরা।
কেউই তেমন কথা বলছে না, দ্রুত খাওয়ার পালা চুকিয়ে শুয়ে পড়ার ইচ্ছে। বেন টিল্টন আর স্যাম গার্ট, প্রথমে পাহারায় থাকবে, তবে ট্যাপও জেগে আছে। কিছুক্ষণ আগুনের পাশে বসে ধূমপান করল ও, তারপর হেঁটে চলে গেল ওয়্যাগনের দিকে। ঘুমানোর আগে ওকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম আমি।
টম জেপসন জাগাল আমাকে। গম্ভীর থমথমে, দেখাচ্ছে ওর মুখ, প্রায় অভদ্র ভাবে জাগিয়েছে আমাকে। বেডরোল ছাড়তে ঠাণ্ডা বাতাস কামড় বসাল, শরীরে, মাথায় হ্যাট চাপিয়ে পায়ে বুট গলালাম। কিছু না বলেই চলে গেছে টম, খেপে বোম হয়ে আছে।
কার্ল ক্ৰকেট রয়েছে আগুনের কাছে, আমার দিকে তাকাল চোখে প্রশ্ন নিয়ে। টমকে দেখেছ নাকি?
হ্যাঁ।
ব্যাপারটা ভাল ঠেকছে না আমার। শয়তান ভর করেছে ওর ওপর, কিছু একটা ঘটিয়ে ছাড়বে ও।
ট্যাপের বিছানার দিকে তাকালাম, ঘুমাচ্ছে সে। স্যাড়লে চেপে পালের কাছে চলে এলাম আমরা-কেলসি আর স্কয়ারের জায়গায় পাহারা দেব।
শান্ত সব, জানাল কেলসি।
ক্যাম্পের দিকে চলে গেল ওরা। পালের ওপাশে চলে গেল কার্ল। কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছি আমি, টম জেপসনকে দেখতে পেলাম-বেডরোল বিছিয়ে শুয়ে পড়ল সে। ট্যাপের বিছানার দিকে চলে গেল দৃষ্টি, ঝোঁপের কারণে স্পষ্ট দেখা না গেলেও, মনে হলো শূন্য ওটা। তবে এ নিয়ে মাথা ঘামালাম না। এটা আমার ব্যাপার নয়।
ধীর গতিতে পালের চারপাশে চক্কর মারা শুরু করলাম। বিশাল একটা রোয়ানে চেপেছি এখন, খানিকটা বেয়াড়া স্বভাবের হলেও ঘোড়াটা শক্তিশালী, স্রেফ আকারের কারণেই দ্রুত গতির ও।
হঠাৎ করেই ব্লন্ড সেই গানম্যানের কথা মনে পড়ল, ওয়েব হর্নারের সঙ্গে ছিল সে। লোকটাকে নিয়ে উদ্বিগ্ন আমি, পুরো ঘটনাটাই নির্লিপ্ততার সঙ্গে নিয়েছে লোকটা, ওয়েব হর্নার খুন হওয়ার পরও বিন্দুমাত্র বিকার দেখা যায়নি ওর মধ্যে। অবচেতন মন বলছে লোকটার সঙ্গে আবারও দেখা হবে। আর বাড সাটক্লিফ তো আছেই।
প্রায় এক ঘণ্টা পর, গরুগুলো তখন উঠে দাঁড়িয়ে আড়মোড়া ভাঙছে; কয়েকটা চরতে শুরু করেছে আবার। হঠাৎ কান খাড়া করল বিশাল একটা লংহর্ন। উত্তরের ঝোঁপের দিকে তাকিয়ে আছে ওটা। গরুটার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকালাম, অন্ধকারে ওকের পাঢ় অবয়ব চোখে পড়ল শুধু।
প্যাটার্সন হাতে রেখে হাঁটুর গুঁতোয় এগোনোর নির্দেশ দিলাম রোয়ানটাকে। গাছের প্রায় ত্রিশ গজের মধ্যে পৌঁছে গেছি। লংহর্ন গৃহপালিত পণ্ড হিসেবে সমাদৃত হলেও, আসলে ওরা বুনো প্রকৃতির, যে-কোন উদ্দীপনায় বুনো প্রাণীর মতই সাড়া দেয়। তাই বিপদের পূর্বাভাস এদের আচরণ থেকে পাওয়া সম্ভব।
হঠাৎ চোখের কোণ দিয়ে গাঢ় অন্ধকারে, ক্ষীণ নড়াচড়া দেখতে পেলাম, পিস্তলের ব্যারেলে ক্ষণিকের জন্যে ঝিকিয়ে উঠল ম্লান আলো।
গাছের ফাঁকফোকরে তল্লাশি চালাচ্ছে অন্য কেউ-আমাদের ক্যাম্পের কোন লোক। একটা ঝোঁপকে চক্কর মেরে এগিয়ে গেলাম, আমি, প্রায় ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে এসে দাঁড়ালাম। কৌতূহলী হয়ে উঠেছে ঘোড়াটা, আমার মত ওটাও বিপদ আঁচ করতে পেরেছে, তাই হালকা এবং ধীর গতিতে, প্রায় নিঃশব্দে পা ফেলছে।
ক্ষীণ নড়াচড়ার শব্দ কানে এল। ফিসফিস করে কথা বলল কেউ, তারপর নারীকণ্ঠের চাপা হাসির শব্দ হলো।
মুহূর্তে, থমকে দাঁড়ালাম আমি। অজান্তে মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠল, ঘাড়ে গরম রক্তপ্রবাহ টের পাচ্ছি। দৃশ্যত, ওকের আড়ালে মিলিত হয়েছে দু’জন নারী-পুরুষ। দেখতে না পেলেও এদের পরিচয় নিয়ে কোন সন্দেহ নেই আমার।
রোয়ানটাকে ঝোঁপের ফোকর বরাবর আগে বাড়ালাম। খুরের নিচে শুকনো ডাল ভাঙার মটমট শব্দ হলো, ঝোঁপের সরু ফাঁক দিয়ে এক লোককে রাইফেল তুলে নিশানা করতে দেখতে পেলাম। তৎক্ষণাৎ স্পার দাবালাম, লাফিয়ে আগে বাড়ল ঘোড়াটা, মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে গেলাম লোকটার পাশে। রাইফেল গর্জে উঠার আগেই ব্যারেলটা তুলে দিলাম ওপরের দিকে। তারপর হঁচকা টান মারলাম, বিস্ময়ের কারণেই রাইফেল ছেড়ে দিল লোকটা-কি থেকে কি হয়েছে, এখনও বুঝতে পারেনি।
নিচু স্বরে কাউকে সতর্ক করল কেউ, স্পষ্ট বুঝতে পারলাম না। তারপর শীতল একটা কণ্ঠ শুনতে পেলাম, আমার উদ্দেশে বলল কেউ ছেড়ে দাও ওকে, বয়! আমাকে যদি শিকার করতেই এসে থাকে, সুযোগটা দাও ওকে।
রাইফেলটা দাও আমাকে, ড্যান! টম জেপসনের খেপা স্বরের নির্দেশ। আজীবন যা দেখে এসেছি, একেবারে সহজ-সরল মিতভাষী মানুষটি আর নেই, সে, এ মুহূর্তে ঠাণ্ডা মাথার বিপজ্জনক একজন লোক।
