আমরা চেষ্টা করব যাতে সে বেঁচে থাকে, শান্ত স্বরে বললেন বাবা।
বাবার মুখ চৌকাকৃতির। মাথায় সযত্নে আঁচড়ানো ধূসর চুল, গোঁফ খাটো করেন নিয়মিত। যত দুঃসময় যাক কিংবা যতই কাজ থাকুক, নিয়মিত শেভ করেন; চুল থাকে আঁচড়ানো এবং পোশাক থাকে পরিপাটি। সারা জীবনে কখনও হেলান দিয়ে বা ঝুঁকে দাঁড়াতে দেখিনি ওঁকে-সবসময় নিজের পায়ের ওপর দাঁড়াতে অভ্যস্ত।
স্থির দৃষ্টিতে ট্যাপের দিকে তাকিয়ে আছেন বাবা। অবাক লাগছে আমার, ট্যাপ। তুমি ভাল করেই জানো কাউকে এমন বিপদের মধ্যে ছেড়ে দেব না আমি-বিশেষ করে একজন মহিলা আর আহত একজন লোককে। এমন বিপজ্জনক এলাকায় ওদের ছেড়ে যাওয়া অমানবিক হবে। ওদেরকে রক্ষা করতে যদি লড়াই করতে হয়, তাহলে তাই করব আমরা।
অপছন্দের দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে আছে ট্যাপ।“বাবা, এটা করতে পারো না তুমি! ওরা তোমার কে? কেউ না!. ওরা…
সাহায্য দরকার ওদের। অন্তত আমি যদ্দিন বেঁচে আছি, সব ধরনের সহযোগিতা পাবে ওরা। দরজার কাছ থেকে কোন লোককে ফিরিয়ে দেইনি আমি, দেবও না।
দীর্ঘ একটা নিঃশ্বাস নিল ট্যাপ। বাবা… প্রায় মিনতির সুরে বলল ও। ওই কোমাঞ্চেরোরা…কোমাঞ্চিদের চেয়েও খারাপ ওরা। বিশ্বাস করো, আর কেউ না জানলেও অন্তত আমি জানি ওরা কতটা খারাপ…
কিভাবে জানলে, ট্যাপ? শান্ত স্বরে জানতে চাইলেন বাবা।
চড় খেয়েছে যেন, বিস্ময়ে বাকশক্তি হারিয়ে ফেলল ট্যাপ। আচমকা ঘুরে দাঁড়াল। আমাদের সবাইকে নিরেট বোকা ভাবছে: ও, হয়তো ঠিকই। বাবা কখনোই কাউকে অনুরোধ বা অনুনয় করতে পছন্দ করেন না, নিজের সন্তানদের তো নয়ই। আমাদের শিখিয়েছেন ন্যায়ের পথে কিংবা নিজের বিশ্বাস টিকিয়ে রাখতে কিভাবে অটল, থাকতে হয়।
শেখানোর কথা বললাম, ব্যাপারটা আসলে তা নয়, বক্তৃতা বা গালভরা বুলি দিয়ে শেখানো হয়নি আমাদের; বরং উদাহরণ দেখে শিখেছি আমরা। এখানকার বেশিরভাগ লোকই বাবা সম্পর্কে জানে, জানে ন্যায়-অন্যায়ের প্রশ্নে ঠিক কোন্ পক্ষে থাকবে বিল ট্ৰেভেনের অবস্থান। এতে কোন ভুল নেই, ভুল বোঝাবুঝিরও সুযোগ নেই।
এমন নয় যে আসন্ন ঝামেলা বা বিপদের ব্যাপারে সন্দেহ আছে আমাদের। কোমাঞ্চিদের এলাকা এটা। কিন্তু বিপদের ভয়টা সম্ভবত কোমাঞ্চেরোদের কাছ থেকে বেশি, ইন্ডিয়ানদের চেয়েও খারাপ এরা। ট্যাপ ঠিকই বলেছে-জুয়ারেজকে খুন করতে আসবে ওরা।
হঠাৎ করেই আশার আলো দেখতে পেলাম, একটা সম্ভাবনা উঁকি দিয়েছে মাথায়। জুয়ারেজের ওপর দিয়ে যে-পরিমাণ ধকল গেছে, সম্ভবত ওকে মৃত বলে ধরে নেবে কোমাঞ্চেররারা। কিন্তু নিশ্চিত হওয়ার জন্যে যদি লাশ দেখতে চায়?
বাবা…আমার মনে হয় ওকে গোর দেয়া উচিত…জুয়ারেজের কথা বলছি।
ওয়াগন থেকে নেমে এসেছে জুয়ানিতা, আমার কথা শুনে থমকে দাঁড়াল।
ঠিক এখানে ওকে কবর দেয়া উচিত, বললাম আমি। …কবরের ওপর একটা মার্কার লাগিয়ে দেব।
ওয়্যাগনের ভেতর থেকে কোদাল নিয়ে এল স্যাম গার্ট। কেউ কিছু বলার আগেই এক পাশে সরে গিয়ে মাটিতে কোপ বসাল সে। আরেকটা কোদাল নিয়ে ওর সঙ্গে যোগ দিলাম আমি।
ছয় ফুট গভীর একটা কবর খুঁড়লাম আমরা, তারপর কয়েকটা বড়সড় পাথর ঠেলে ফেললাম ওটায়। ছোট ছোট পাথর ফেলে কবরটা পূর্ণ করলাম। কেউ যদি কৌতূহলী হয়ে ওঠে, সব পাথর খুঁড়ে আরও গভীরে যাওয়ার ধৈর্য হয়তো রাখতে পারবে না। সবশেষে মাটি দিয়ে কবর ভরাট করে ওপরে মার্কার পুঁতে রাখলাম।
নাম কি লিখব? জানতে চাইল গার্ট।
উঁহু, নাম-ধাম লেখার দরকার নেই। তাহলে ওরা বুঝে ফেলবে মুখ খুলেছে জুয়ারেজ। লেখো: হতভাগ্য এই মেক্সিকান ১৮৫৮ সালের ১৬ এপ্রিল এখানে মারা গেছে।
কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে রওনা দিলাম আমরা।
ট্যাপ মুখে কিছু না বলুক, ভেতরে ভেতরে যে প্রচণ্ড খেপে আছে। তাতে কোন সন্দেহ নেই। শীতার্ত র্যাটলারের মত ফুসছে যেন, চামড়া বদলের সময় প্রচণ্ড খেপা আর স্পর্শকাতর থাকে সাপটা, সামান্য উস্কানিতে খেপে ওঠে; এসময় অবশ্য র্যাটলার কখনও খটখট শব্দ করে না-বরং সামনে যা নড়ে, তাতেই ছোবল হানে।
কিন্তু অস্থির হয়ে আছে ট্যাপ। বেশিরভাগ সময় পালের সামনে স্কাউটিং করছে, পাহাড়সারি জরিপ করছে। কোমাঞ্চেররাদের পক্ষ থেকে হামলা হতে পারে, খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে প্রায় সবাই সশস্ত্র এখন। ধীর গতিতে এগোচ্ছে পাল, আরও পাঁচ মাইল পর সাউথ ফর্ক অতিক্রম করলাম আমরা। মাঝে মধ্যে এটাকে বয়েলিং কঞ্চোও বলা হয়। তবে সত্যিকার নদী একেই বলে-গভীর স্বচ্ছ পানি, স্রোতও রয়েছে বেশ। নদীর কিনারা ধরে ছড়িয়ে পড়ল তৃষ্ণার্ত গরুর দল, এদিকে ক্যাম্প করার জন্যে জুৎসই জায়গার খোঁজ করছি আমরা।
কাক্ষিত জায়গাটা ট্যাপই খুঁজে পেল-পাথুরে চাতালের নিচে খোলা একটা জায়গা, কাছেই নদী। বোল্ডারসারির ফাঁক গলে অনায়াসে ঢোকানো যাবে ওয়্যাগন। ভোলা জায়গায় যথেষ্ট মেস্কিট আর ওক রয়েছে। দুটো ওয়্যাগন ভেতরে ঢুকিয়ে গরুর দলকে খাড়ি ধরে এগোতে বাধ্য করলাম আমরা। সতেজ বড় বড় ঘাস দেখে উৎসাহ পেল গরুর দল। ডোভ ক্রীক পেরিয়ে, বিশ্রাম নেওয়ার পর গুড স্প্রিং ক্রীর্কের দিকে এগোলাম।
পানি স্বচ্ছ। টলটলে এবং ঠাণ্ডা। ঘাসও চমৎকার। আশপাশে যথেষ্ট কাঠ বা বাফেলো চিপস রয়েছে। ওয়াগন বৃত্তাকারে রেখে সব গরু ভেতরে ঢোকাতে ঢোকাতে প্রায় সন্ধে হয়ে গেল।
