ঝোঁপঝাড়ের কিনারা থেকে বোল্ডার আর পাথুরে দেয়ালের শুরু হয়েছে, বেশ উঁচু দেয়ালটা, গাছের মাথা ছাড়িয়ে গেছে প্রায়। দেয়ালের দিকে চলে গেছে ঘোড়াটার ট্র্যাক, ওপাশের খোলা মাঠে হারিয়ে গেছে। খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে এগিয়ে গেলাম।
পানির কুলকুল ধ্বনি ছাড়াও ঝর্নার পানি আছড়ে পড়ার শব্দ কানে এল। বাতাসে নড়ে উঠল গাছের পাতা। তারপর একেবারে নিশ্ৰুপ হয়ে গেল চারদিক।
কান খাড়া হয়ে গেছে আমার ঘোড়ার, সঙ্কীর্ণ ট্রেইল ধরে এগোচ্ছে ওটা। এতই সঙ্কীর্ণ যে দু’পাশে গাছের পাতার সঙ্গে লেগে যাচ্ছে। স্টিরাপ। প্রায় ত্রিশ গজ এগোনোর পর আচমকা অগভীর একটা খাদ চোখে পড়ল, ওকের শাখা-প্রশাখা ঝুঁকে পড়েছে খাদের ওপর। পাশে পঞ্চাশ ফুট ব্যাসের খোলা জায়গা, ক্ষীণ ঝর্না নেমে এসেছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ঝোঁপের কিনারে দারুণ সুন্দর কালো ঘোড়াটা চোখে পড়ল, আমার ঘোড়ার উপস্থিতি টের পেয়ে কান খাড়া করে তাকাল ওটা, নিচু, স্বরে হেষাধ্বনি করল।
ঝর্নার কাছাকাছি মাটিতে ক্যাম্প করেছে কেউ। গর্ত করে আগুন জ্বেলেছে, স্টোভে কফির পানি ফুটছে; আর বাতাসে বেকনের সুবাস।
যেখানে আছ, ওখানেই দাঁড়াও, সেনর! তীক্ষ্ণ একটা কণ্ঠ শুভেচ্ছা জানাল আমাকে। নইলে ঠিক পেট ফুটো করে ফেলব তোমার?
সতকর্তার সঙ্গে কাঁধের ওপর দু’হাত তুললাম। রাইফেলের হ্যামার টানার ক্লিক শব্দ শুনতে ভুল হয়নি, কিন্তু কণ্ঠটা কোন মেয়ের!
৩. মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী
মেয়েটা অপূর্ব সুন্দরী। বড়জোর উনিশ কি বিশ হবে বয়েস। লালচে সোনালী চুল ঝলমল করছে সূর্যের আলোয়। হাতে ধরা রাইফেলটা একটুও নড়ছে না, নগ্ন কালো নল স্থির হয়ে আছে আমার পেট বরার।
ফ্ল্যাট-ক্রাউন স্প্যানিশ হ্যাট পড়ে আছে মেয়েটার কাঁধে, চিবুকের স্ট্র্যাপ নেমে এসেছে গলার কাছাকাছি। বাকস্কিনের পোশাক ওর পরনে, ডিভাইডেড স্কার্ট-এই প্রথম কোন মেয়ের পরনে দেখলাম আমি। যদিও জিনিসটার কথা বহুবার শুনেছি।
কে তুমি? আমাকে অনুসরণ করছ কেন?
তুমি যদি গরুচোরদের একজন না হয়ে থাকে, তাহলে নিশ্চিন্ত হতে পারো যে তোমাকে অনুসরণ করছি না। গরুচোরদের অনুসরণ করছিলাম আমরা। গতরাতে আমাদের সব গরু তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে ওরা। মাইল কয়েক পেছনে তোমার ট্র্যাক দেখে কৌতূহল হলো।
রাইফেল বা মেয়েটার দৃষ্টি, সামান্যও নড়ল না। কে তুমি? কোত্থেকে এসেছ?
অদ্ভুত একটা ধারণা এসেছে আমার মাথায়। অসম্ভব হলেও হয়তো ঠিক এটাই ঘটেছে। আমার নাম ড্যান ট্রেভেন। কাউ-হাউসের ওদিক থেকে এসেছি আমরা। নিউ মেক্সিকোয় ড্রাইভ নিয়ে যাচ্ছি। হয়তো কলোরাভোয়ও থামতে পারি। নতুন বসতি খুঁজছি আমরা।
গরুচোরদের কথা বলছিলে তুমি।
গতরাতে আমাদের গরু তাড়িয়ে নিয়ে এসেছে ওরা। সম্ভবত কাউ-হাউসে আমাদের কিছু প্রতিবেশী এর সঙ্গে জড়িত। আসলে ওরা রাসলার। গরু নিয়ে আমরা চলে আসায় বিপদে পড়ে গেছে। গায়ে খেটে কামাই করার ইচ্ছে নেই ওদের।
ঠাণ্ডা, সাবধানী চাহনি মেয়েটার বেগুনী চোখে। যদিও আমার মনে হলো কথাগুলো বিশ্বাস করেছে ও।
তুমি নিশ্চই কয়েক ঘণ্টা আগে গরুর পাল চলে যেতে দেখেছ বা শব্দ শুনেছ, যোগ করলাম আমি! তো, আমি কি হাত নামাতে পারি, ম্যাম?
মাথা ঝাঁকাল সুন্দরী। কিন্তু সাবধান, বেতাল কিছু করলে পস্তাবে!
সতর্কতার সঙ্গে হাত নামিয়ে স্যাডল-হর্নের ওপর রাখলাম। চারপাশে কৌতূহলী দৃষ্টি চালালাম। দেখে তো মনে হচ্ছে বাড়ি থেকে অনেকদূর চলে এসেছ তুমি, তাও একা…
একা নই আমি, বাধা দিল মেয়েটা, হাতের রাইফেলে চাপড় মারল। এটা আছে সঙ্গে।
ঘোড়াটা দারুণ তোমার, ম্যাম। কি জানো, আঙুল দিয়ে হ্যাট পেছনে ঠেলে দিলাম। তোমাকে অনুসরণ করার এটাও একটা কারণ। ঘোড়াটাকে দেখার ইচ্ছে ছিল আমার।
কিছুটা নিচু হলো রাইফেলের নল। কফি খাবে? হঠাৎ প্রস্তাব করল মেয়েটা। শুধু শুধু বাম্প হচ্ছে।
কৃতজ্ঞচিত্তে স্যাডল ছেড়ে নামলাম আমি। ধন্যবাদ। এক কাপ গিলেই কেটে পড়ব। অন্যরা আমার চেয়ে এগিয়ে গেছে। ঘণ্টা খানেকের মধ্যে গরুচোরদের ধরে ফেলতে পারব বোধহয়।
স্যাডল-হর্নের সঙ্গে নিজের কাপ ঝুলিয়ে রাখি আমি। ওটা নিয়ে কেতলি থেকে কাপে কফি ঢাললাম। তারপর তাকালাম মেয়েটির দিকে। অস্বীকার করব না, সারা জীবনেও এত সুন্দরী মেয়ে দেখিনি আমি। তো, আমার ধারণা কি জানো…তুমি বোধহয় কারও খোঁজ করছ?
ঝট করে আমার দিকে তাকাল মেয়েটি। কেন মনে হলো?
আন্দাজ, কফিতে চুমুক দিলাম। কোমাঞ্চেবরাদের সম্পর্কে কিছু জানো তুমি?
জায়গামত পড়েছে ঢিল! মেয়েটার চেহারাই বলে দিচ্ছে ঠিক আন্দাজ করেছি।
জানি ওদের সম্পর্কে, চেষ্টাকৃত নির্লিপ্ত স্বরে বলল ও।
আসার পথে এক লোককে খুঁজে পেয়েছি আমরা। কোমাঞ্চেরোরা গুলি করেছে ওকে।
বেঁচে আছে ও? কেমন আছে এখন?
তোমার বন্ধু?
কোথায় ও? ওর কাছে যাব আমি!
অবস্থা বিশেষ ভাল নয় ওর। নেকড়ের দল আক্রমণ করেছিল ওকে। তার আগে কোমাঞ্চেরোরা ল্যাসোয় বেঁধে হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যাচ্ছিল। সাধ্যমত লড়েছে ও, বেশ কয়েক জায়গায় জখম হয়েছে। কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে ঝর্নার পানিতে কাপটা ধুয়ে ফেললাম। তিনজন মানুষের সমান সাহস ওর। নার্ভ বটে! কিভাবে ক্রল করে যে এতদূর গেল, কেবল খোদাই জানে!
