আগুনের ধারে বসে কফি গিলছে মিলো ডজ আর রাস্টি বুচার্ড। শার্পস রাইফেলটা পাশে রেখেছে বুচার্ড।
পায়ে বুট গলিয়ে আগুনের কাছে চলে এলাম। ঘুমটা শুরুতে হালকা থাকিলেও গভীর হয়ে গিয়েছিল শেষদিকে, নইলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে জাগাতে হত না আমাকে। মনে মনে কিছুটা অসন্তুষ্ট হলাম নিজের ওপর। সাবধানী মানুষের ঘুম পাতলা হওয়া উচিত। গভীর ঘুম শুধু বিপদই ডেকে আনে।
কফিটা দারুণ গরম, কড়াও। বাবাও উঠে এসেছেন। ঠাণ্ডা একটা বিস্কুট ধরিয়ে দিলেন আমার হাতে। কফির সঙ্গে খেলাম ওটা।
সতর্ক থেকো সবাই। ট্যাগকে এমন অস্থির হতে দেখিনি আমি। রাতটা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে ও।
আমার জন্যে ডানে স্যাডল চাপিয়েছে টম জেপসন। স্যাডলে চড়ে ট্যাপ এডলের বেডরোলের দিকে তাকালাম। শূন্য ওটা। ট্যাপকে দেখেছ?
ঘুরে দাঁড়াল জেপসন। না, দেখিনি! প্রায় খেকিয়ে উঠল সে।
আগুনের কাছ থেকে সরে আসতে অন্ধকার গ্রাস করল আমাদের। জায়গাটা ব্লাফের পেছনে হওয়ায় ঠাণ্ডা বাতাসের অত্যাচার সইতে হচ্ছে না। তবে তৃণভূমিতে যেতে শীতল বাতাসের ঝাঁপটা অনুভব করলাম। একসঙ্গে পালের দিকে এগোলাম চারজন, কিছুক্ষণ পর ছড়িয়ে পড়লাম।
গভীর রাতে সামান্য শব্দও তীক্ষ্ণ এবং স্পষ্ট শোনায়। অতি চেনা শব্দও রহস্যময় বা অদ্ভুত মনে হতে পারে। প্রকৃতির সাধারণ শব্দ থেকে বিপজ্জনক শব্দ আলাদা করতে সক্ষম সতর্ক ও অভিজ্ঞ মানুষ, যারা বুনো প্রকৃতি আর রাতের নৈঃশব্দ্য সম্পর্কে অভ্যস্ত।
গাছে ডানা ঝাঁপটাচ্ছে পাখি। ছোট একটা সরীসৃপ বুকে হেঁটে এগোচ্ছে, ঘাস ঠেলে এগোচ্ছে ছোটখাট কোন পশু, বাতাসে পাতার মর্মরধ্বনি, গরুর শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়ার শব্দ বা নেহাত দুর্ঘটনাক্রমে দুটো গরুর শিঙের সংঘর্ষের আওয়াজ-সবই পরিচিত এবং স্বাভাবিক।
পালের ওপাশে একত্র হলাম আমরা। এবার জোড়ায় জোড়ায় রেকি শুরু করলাম, বরাবরের মতই,কার্ল ক্ৰকেট রয়েছে আমার সঙ্গে।
সবকিছু বড় বেশি শান্ত হয়ে গেছে হঠাৎ। স্বাভাবিক শব্দগুলোও শুনতে পাচ্ছি না এখন। এর তাৎপর্য একটাই: অস্বাভাবিক কোন ব্যাপার-আশপাশে একটা কিছু আছে কিংবা ঘটতে যাচ্ছে। কারণ ছোট ছোট পশু-পাখি নিজের চারপাশে অস্বাভাবিকতা টের পেলে শঙ্কিত হয়ে ওঠে, নিশ্ৰুপ হয়ে পড়ে ওরা।
কি মনে হয় তোমার, কার্ল?
কাছাকাছি আসার চেষ্টা করবে ওরা। অপঘাত
অন্য পাশ থেকে আসা মিলো ডজ আর রাস্টি বুচার্ডের মুখোমুখি হলাম আমরা। মিলো, ফিসফিস করে বললাম আমি। কার্ল আর আমি গাছপালার ওদিকে যাব। সম্ভবত ওদিক থেকে হামলা করবে শত্রুপক্ষ। ওরা আমাদের ওপর চড়াও হওয়ার আগেই মুখোমুখি হওয়া ভাল।
ঠিক আছে।
জায়গাটা দেখিয়ে দিলাম ওকে। বুচার্ডও দেখে নিল, ব্লাফের ঠিক সোজাসুজি।
কিন্তু সামান্য সুযোগও পেলাম না আমরা। মুহূর্তের মধ্যে ঘটে গেল অনেক ঘটনা। আচমকা খুরের ভোতা শব্দ হলো, পরপরই ছুটে এল ওরা। ব্লাফের গাঢ় কাঠামোর বিপরীতে বলে স্পষ্ট ঠাহর করা মুশকিল হয়ে পড়ল। নিশানা করব কি, ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে কোন টার্গেটই খুঁজে পেলাম না।
ছুটে এল ওরা, কেবল খুরের শব্দ হচ্ছে। লম্বা, ঘাসের কারণে ভোতা শোনাচ্ছে। তীক্ষ্ণ স্বরে গর্জে উঠল একটা পিস্তল। অন্যদের সতর্ক করে দেয়ার জন্যে অন্ধকার বরাবর ব্লাফের দিকে গুলি করেছি আমি।
সঙ্গে সঙ্গে তুমুল গোলাগুলি শুরু হলো। কাছাকাছি ভারী কিছু মাটিতে আছড়ে পড়ার শব্দ শুনতে পেলাম, অস্ফুট স্বরে যন্ত্রণা প্রকাশ করল কেউ। আবছা ভাবে সামনে সাদা একটা কাঠামো দেখতে পেলাম-সাদা ঘোড়ায় চেপেছে কেউ। সঙ্গে সঙ্গে গুলি করলাম।
আচমকা হোঁচট খেল যেন ঘোড়াটা, তীক্ষ্ণ মোচড় উঠল পেশীবহুল শরীরে। তুমুল গুলি বৃষ্টি শুরু হয়েছে ততক্ষণে, ঘোড়াটার দিকে মনোযোগ দেয়ার সুযোগ বা ফুরসত হলো না।
প্রতিপক্ষের চমক তেমন কাজে আসেনি। স্থান বা কৌশল নির্বাচনে কোন খুঁত নেই, কিন্তু সময়টা সামান্য এদিক-ওদিক হয়ে গেছে। আক্রমণের সময় নেহাত সৌভাগ্যবশত চারজনই কাছাকাছি ছিলাম আমরা। চারটে অস্ত্রের মুখে টিকতে না পেরে উল্টো দৌড় দিতে হলো ওদের। সমানে চেঁচাচ্ছে ওরা এখন, ছোটার মধ্যে গরুর পাল ছত্রভঙ্গ করে দিচ্ছে।
মাঝরাতে এমন তীব্র গোলাগুলি আর ছুটন্ত রাইডারদের তুমুল চিৎকারে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল গরুর দল। তুমুল বেগে উপত্যকার দিকে ছুটতে শুরু করল ওরা।
ফ্যাকাসে আকাশের পটভূমিতে এক লোকের কাঠামো দেখে গুলি করলামপরপর দু’বার। দ্রুত হাতে রিলোড করলাম পিস্তলটা, তারপর হামলাকারীদের পিছু পিছু ঘোড়া ছোটালাম।
কিন্তু যেমন আচমকা শুরু হয়েছিল, তেমনি হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেল জমজমাট লড়াই। ফলাফল: হামলাকারীরা পালিয়েছে। সঙ্গে আমাদের গরুর পাল উধাও।
ঘোড়া ছুটিয়ে আমার পাশে চলে এল কার্ল। রাস্টি বোধহয় গুলি খেয়েছে।
দেয়াশলাইয়ের কাঠি জ্বালালেন বাবা। ম্লান আলোয় রাস্টি বুচার্ডের নিথর দেহ চোখে পড়ল। বুকে বিঁধেছে গুলিটা।
মাশুল দিতে হবে ওদের! তপ্ত স্বরে শপথ করলেন তিনি। খোদার কসম, এজন্যে মাশুল দিতে হবে ওদের!
চারপাশে চক্কর দিলাম আমরা, মনে শঙ্কা হয়তো আরও কাউকে পাব। মৃত দুই হামলাকারীর লাশ খুঁজে পেলাম। একজনের নাম স্ট্রিটার, নসেজে রেঞ্জারদের আধিপত্যে টিকতে না পেরে কাউ-হাউসে চলে এসেছিল লোকটা। অন্যজনকে চেহারায় চিনি বটে, কিন্তু পরিচয় জানি না।
