তো, ওখান থেকে সরে এলাম আমি, ভেতরে ভেতরে কিছুটা হলেও ক্ষরণ অনুভব করছি। নিজের ওপর রাগ হচ্ছে। লোকজন অযথাই নিজেদের বোকা বানায়। ইলেন আর আমি ঘুরতে বেরিয়েছি দুতিনদিন, সবাই তাতে মনে করেছে, স্থায়ী একটা সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে আমাদের মধ্যে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কি, বড়জোর বন্ধু বলা যাবে আমাদের। মেয়েটা অন্য কাউকে পছন্দ করলে বা বিয়ে করলে, একজন বন্ধু হারাব আমি, শুধু এটাই ক্ষরণের কারণ; কখনোই দাবি করব না যে ওর ব্যাপারে আমি বা আমার ব্যাপারে সিরিয়াস ছিল ইলেন।
সবকিছুর পরও, ক্ষণিকের আবেগতাড়িত উন্মাদনাই বলা যায় এটাকে। ইলেন আর আমার মধ্যে এমন কোন সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি, কিন্তু স্বামী হিসেবে ট্যাপ এডলেকে নির্বাচন করে নিঃসন্দেহে ভুল করেছে ইলেন। মেয়েটাকে কিছুটা হলেও চিনেছি, জানি ওর সম্পর্কে নিজের চারপাশে পুরুষদের দেখেছে ও, তাদের মধ্যে কাউকেই অসাধারণ মনে হয়নি, হঠাৎ উদয় হওয়া সুবেশী চটপটে ট্যাপ এডলে ওর চোখে হয়ে গেছে জবরদস্ত এক দেবদূত। এই দেবদূতকে নিজের কাঙ্ক্ষিত পুরুষ মনে করেছে।
সত্যি কথা বলতে কি, জোয়ান-বুড়ো সবাই স্বপ্ন দেখে, কাঙ্খিত মানুষটির ছবি নিজের মনে লালন করে, তাকে ভালবেসে সংসারী হতে চায়। স্বপ্নের পরিধি সীমাহীন, অথচ বাস্তবে তার প্রাপ্তির পরিমাণ অনেক কম-তাই অল্পতে তুষ্ট থাকে সবাই। এমনও হয়েছে, স্বামী-স্ত্রী একই বিছানায় পাশাপাশি ঘুমাচ্ছে, স্বপ্ন দেখে দু’জনেই-অথচ দু’জনের স্বপ্নের মধ্যে হাজার মাইল ফারাক। কারও চাওয়ার সঙ্গে কারও মিল নেই।
ট্যাপ এডলে ছন্নছাড়া-ড্রিফটারও বলা যাবে ওকে। হয়তো সত্যিই ইলেনের স্বপ্নের পুরুষ ও, কিংবা ইলেনের উসিলায় থিতুও হয়ে যেতে পারে। ব্যাপারটা যতই অস্বাভাবিক মনে হোক, এটা আমার মাথা ব্যথার বিষয় নয়। মাথা ঘামানোও উচিত নয়।
পালের একেবারে পেছনে এসে দলছুট একটা বলদকে খেদিয়ে পালে ঢুকিয়ে দিলাম। ধুলোর অত্যাচারে নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম, দাঁতের ব্যথায় আক্রান্ত গ্রিজলির মত করুণ মনে হচ্ছে নিজের অবস্থা।
আমার পাশে চলে এল মিলো ডজ। মেক্সিকামের সঙ্গে আলাপ হলো। তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাইছে ও।
আমার সঙ্গে?
তুমি ওকে খুঁজে পেয়েছ, তুমিই ওর কাছে নিয়ে গেছ আমাদের।
কোত্থেকে এসেছে ও?
নিজের ব্যাপারে কিছুই বলেনি। গালে মাকড়সার মূত ক্ষত আছে, এমন এক লোক সম্পর্কে জানতে চাইছিল বারবার। লোকট বিশালদেহী।
সেদিন অ্যান্টিলোপ কীকের ধারে ক্যাম্প করলাম আমরা। ক্রীকের পানি স্বচ্ছ, টলটলে এবং মিষ্টি। তীরে বিশাল ওক আর পেকানের সারি। প্রায় ত্রিশ-চল্লিশ একরের মত খোলা জায়গা বেছে নিয়েছি গরু রাখার জন্যে। ক্রীকের ধারে ছড়িয়ে পড়ল তৃষ্ণার্ত গরুর দল, তেষ্টা মেটানোর পর তৃণভূমিতে ফিরে এল।
পেকানের ছায়ায় বসে বিশ্রাম নিচ্ছি আমি, এ সময় এলেন বাবা। দারুণ সুন্দর জায়গা, ড্যান। এখানেই থেকে যেতে লোভ হচ্ছে।
মাথা ঝাঁকালাম। এখানে একটা দিন কাটিয়ে দিলে মন্দ হয় না। ইচ্ছামত পানি আর ঘাস খাওয়ার সুযোগ পাবে গরুগুলো। আমাদেরও বিশ্রাম নেওয়া হবে। ট্যাপের কাছ থেকে যা শুনেছি, শিগগিরই সামনে রুক্ষ এলাকা পড়বে। যত এগোব, ততই পানি বা ঘাস,কমে যাবে।
ট্যাপ আর কার্ল যোগ দিল আমাদের সঙ্গে। ক্ৰীকের ধারে একটা বৃত্তের আকারে রাখা হয়েছে ওয়্যাগনগুলো। ঝিরঝিরে বাতাস বইছে। কঞ্চো নদীর ওপাড়ের ব্লাফের দিকে চলে গেল ট্যাপের দৃষ্টি। কাছাকাছি, নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে অ্যান্টিলোপ ক্রীক। পরে পশ্চিমে চলে গেছে নদীটা।
ওই ব্লাফগুলো ঠিক পছন্দ হচ্ছে না আমার, যে-কেউ লুকিয়ে থাকতে পারবে ওখানে, চিন্তিত সুরে মন্তব্য করল ট্যাপ। তবে এরচেয়ে নিরাপদ জায়গা বোধহয় আশপাশে নেই।
এখানে একদিন বিরতি নেয়ার প্রস্তাব করলেন বাবা ট্যাপও সায় জানাল। আশ্রয় হিসেবে জায়গাটা দারুণ, ব্লাফের কারণে উত্তরের ঠাণ্ডা বাতাস আটকে যাবে, পর্যাপ্ত ঘাস আর পানিও আছে। কচি পাতার লোভে কয়েকটা বাছুর ইতোমধ্যে পেকানের সারিতে ঢুকে পড়েছে, গতবারের শীতে মোটামুটি টিকে গেছে কিছু পাতা।
একটা ডান ঘোড়ায় স্যাড়ল চাপিয়ে ক্যাম্পের দিকে রওনা দিলাম আমি। মেক্সিকান লোকটার ওয়্যাগনের সামনে চলে এলাম। ক্যানভাসের দৈয়ালের সঙ্গে পিঠ ঠেকিয়ে বসেছে সে, কিছুটা হলেও রঙ ফিরে এসেছে মুখে।
আমি ড্যান ট্রেভেন, পরিচয় দিলাম।
বাদামী শীর্ণ একটা হাত বাড়িয়ে দিল সে, স্মিত হাসল। ঝকঝকে সাদা লোকটার দাঁত। ঘেসিয়াস, অ্যামিগো। আমার জীবন বাঁচিয়েছ তুমি। মনে হয় না এরচেয়ে বেশি যেতে পারতাম।
অনেক পথ ক্রল করে এসেছ তুমি। বুঝতে পারছি না কিভাবে সম্ভব করেছ কাজটা।
শ্রাগ করল মেক্সিকান। পানি আর আশ্রয় দরকার ছিল আমার, ওগুলোর তাগিদেই এগিয়েছি। এবার গম্ভীর হয়ে গেল সে। সেনর, তোমাকে সূতর্ক করা আমার দায়িত্ব। আমাকে আশ্রয় দিয়ে আসলে শত্রু তৈরি করেছ…একাধিক শত্রু।
শত্রু কার নেই? যে যত ভাল ভাবে বেঁচে থাকে, তার শত্রু তত বেশি। যাকগে, আমার মনে হয় দু’একজন বাড়লে এমন কিছু যাবে আসবে না।
খুব খারাপ মানুষ ওরা…নিষ্ঠুর। কোমাঞ্চেরো।
কোমাঞ্চিদের সঙ্গে ব্যবসা করে যেসব মেক্সিকান, তাদের কথাই বলছ তো? শুনেছি ওদের সম্পর্কে।
