নদীর কিনারা ধরে কিছুটা উত্তরে চলে এসেছি আমরা। এতটা উত্তরে আসার কথা নয়, এদিকে একটা ট্রেইল পাওয়ার কথা। যত দূরে আশা করেছি, তারচেয়ে বেশিই চলে এসেছি। কিন্তু ট্রেইলের দেখা নেই। অন্য ট্রেইলেও যেতে পারতাম, সমস্যা সেখানেও আছে, তবে জানা ট্রেইল ধরে এগোলে সমস্যা মোকাবিলা করা সহজ।
ফোট ফ্যান্টম হিলের কাছাকাছি এসে উদ্দিষ্ট ট্রেইল খুঁজে পেলাম আমরা, দক্ষিণে বাঁক নিয়ে পশ্চিমে এগোলাম আবার।
কেউ অনুসরণ করছে আমাদের…দিনের বেলায় পেছনে ধুলোর মেঘ চোখে পড়েছে; আর রাতে গরুর অস্থিরতায় বোঝা গেছে খুব বেশি দূরে নেই তারা। পৃনি চুরি, কিংবা চাদির চামড়া শিকারে আসা কোমাঞ্চি হতে পারে এরা, কিংবা ব্র্যাজোস অঞ্চল বা কাউ-হাউস থেকে আসা রেনিগেড।
একটা মোষ মেরেছে ট্যাপ। মাংস পেয়ে খুশিই হলো সবাই। পরে অবশ্য অ্যান্টিলোপও শিকার করেছে ও; এবং আশপাশে ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতির নমুনা দেখতে পেয়েছে। ক্রমশ বুনো হয়ে আসছে ট্রেইল আর আশপাশের এলাকা। একেবারে জনমানবশূন্য। পেকোসের হর্স হেড ক্রসিঙের দিকে যাচ্ছি আমরা। মেক্সিকোয় রেইড করার সময় ট্রেইলটা ব্যবহার করত কোমাঞ্চিরা। অদ্ভুত নামকরণের সার্থকতা ওই ট্রেইলে গেলে চোখে পড়ে-অসংখ্য ঘোড়ার খুলি আর কঙ্কাল ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে আশপাশে। মেক্সিকো থেকে রেইড করে ফেরার পথে সর্বোচ্চ গতিতে ঘোড়া ছোটায় নিষ্ঠুর কোমাঞ্চিরা, অনেক ঘোড়াই প্রাণ হারায় পথে।
মাঝে মধ্যে ট্র্যাক চোখে পড়ছে। একসময় ধারণা ছিল ইন্ডিয়ানরা নালহীন আর সাদারা নালঅলা ঘোড়ায় চাপে, কিন্তু ধারণাটার গুরুত্ব নেই এখন; কারণ রেডস্কিনরা অহরহ নালঅলা ঘোড়া চুরি করছে র্যাঞ্চ থেকে, এবং সাদা মানুষও নালহীন ঘোড়ায় চড়ছে ইদানীং।
ওঅটরহোলের তলায় প্রায় শুকনো কাদা উদ্বিগ্ন করে তুলছে আমাদের। নদীতে পানি আছে বটে, কিন্তু একেবারে কম। অথচ কয়েকবার বৃষ্টি হয়েছে আর বসন্ত চলছে এখন। মাস খানেক পর কি অবস্থা হবে মাটির, সূর্যের তাপে উনুনের মত শুকনো হয়ে উঠবে না?
অনিশ্চয়তা আর আশঙ্কার দোলায় দুলছে সবাই। ক্যাম্পে গান থেমে গেছে, গলায় জোর পাচ্ছে না কেউ। গরুর পালটাই এখন আমাদের সর্বস্ব। এই যাত্রায় ভবিষ্যৎ-হয়তো জীবনেরও ঝুঁকি নিয়েছি আমরা।
সবার সামনে ট্যাপ, সাধারণত বাবা থাকছেন ওর সঙ্গে বুনো রুক্ষ প্রান্তর ধরে এগিয়ে নিয়ে চলেছে আমাদের। রাতে নেকড়ের চিৎকার শুনতে পাচ্ছি, দিনের বেলায় দু’একটাকে চোখে পড়ছে; ধান্ধায় আছে ওরা, যদি কোন রকমে একটা গরুকে কজা করা যায়।
সঙ্গে অস্ত্র বাখছি, আমরা। সারাক্ষণই সতর্ক, সজাগ; যে-কোন পরিস্থিতির জন্যে, তৈরি। ত্যক্ত ও মেজাজী হয়ে উঠেছে সবাই, অল্পতে ধৈর্য হারাচ্ছে। তাই পরস্পরকে যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলছি আমরা। এমন পরিস্থিতিতে উত্তপ্ত দু’একটা বাক্য অঘটন ঘটিয়ে ফেলতে পারে জানি বলেই জিভ সামলে রাখার চেষ্টা করছি সবাই।
ইলেন এড়িয়ে চলছে আমাকে। ট্যাপ আসার আগে একসঙ্গে ঘুরেছি, রাইড করেছি আমরা। কিন্তু ইদানীং দেখাই হচ্ছে না ওর সঙ্গে যতটা সম্ভব ট্যাপের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছে ও।
আজ অটম্যানদের ওয়াগনটা চালাচ্ছে ইলেন। পাল থেকে কিছুটা সরে এসে, ঘোড়া দাবড়ে ওয়্যাগনের কাছে চলে এলাম আমি। আমার উপস্থিতি টের পেলেও ফিরে তাকাল না ইলেন, মনোযোগ আর দৃষ্টি দুটোই ট্রেইলের দিকে।
ইদানীং তোমার সঙ্গে দেখাই হয় না, বললাম।
চিবুক উঁচু হয়ে গেল ওর। ব্যস্ত ছিলাম।
হ্যাঁ, খেয়াল করেছি।
আমি তোমার সম্পত্তি নই। তোমার প্রশ্নের উত্তর দিতেও বাধ্য নই।
ঠিকই বলেছ তুমি, ম্যাম। তাছাড়া…ট্যাপ খুব ভালমানুষ। হাজার জনের মধ্যেও ওর মত কাউকে পাওয়া যাবে না।
ঘাড় ফিরিয়ে আমার চোখে চোখ রাখল ও। ওকে বিয়ে করব আমি।
ট্যাপকে বিয়ে করবে? ব্যাপারটা অসম্ভব মনে হচ্ছে। ট্যাপ এডলে আগাগোড়া ছন্নছাড়া স্বভাবের মানুষ, থিতু হওয়া দূরে থাক, কোথাও বেশিদিন থাকতে পারে না সে। এটা অবশ্য পুরোপুরি আমার ধারণা। ভুলও হতে পারে। মনস্থির করার জন্যে একটুও দেরি করোনি তুমি, মন্তব্য করলাম শেষে। অথচ সপ্তাহ খানেক আগে পরিচয় হয়েছে তোমাদের।
তাতে কি? আচমকা চটে উঠল মেয়েটা। সবাই তো বলবে ওর মত মানুষই হয় না-হাসি-খুশি, চটপটে। সব কাজেই ওস্তাদ। সত্যিকার পুরুষ! হাজার বছর চেষ্টা করলেও ওর মত হতে পারবে না তুমি!
ইলেন অটম্যানের মন্তব্যে খেপে ওঠার কারণ নেই, শুধু একটা ব্যাপারে খটকা লাগছে-মেয়েটা যেন তর্ক করার জন্যে মুখিয়ে আছে! হয়তো, একমত হলাম আমি। ট্যাপ সত্যিই ভালমানুষ। কোন সন্দেহ নেই এতে। কিন্তু সত্যিকার পুরুষ কিনা, সেটা দৃষ্টিভঙ্গির ওপর নির্ভর করে। আমি যদি মেয়ে হতাম, তাহলে এ নিয়ে বিস্তর চিন্তা ভাবনা করতাম। আসলে ও বাঁধনহীন পুরুষ মানুষ-নিজের কাজ করে ঠিকমত, সমর্থ, আন্তরিক
তো?
এক জায়গায় বসে থাকার লোক নয় ট্যাপ। আমার মনে হয় না কখনও বদলাবে ও।
বদলায় কিনা দেখবে তুমি! জোরাল, তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বললেও খুব একটা আত্মবিশ্বাসী মনে হলো না ইলেনকে। আমার সন্দেহ হলো আদৌ এ নিয়ে কখনও ভাবেনি ও। মেয়েরা প্রেমে পড়লে শুধু আবেগ নিয়ে ব্যস্ত থাকে, পরিণতিতে কি হতে পারে ভাবার অবকাশই পায় না। উপলব্ধিও করতে পারে না। ঘোর কেটে যাওয়ার পর আচমকা টের পায় যে-মানুষটিকে ভালবাসে, ভালবাসার মানুষ হিসেবে সে অদ্বিতীয়, কিন্তু স্বামী হিসেবে জঘন্য।
