উজ্জ্বল রোদ্দুরে দিন। বেশ দ্রুতই এগোচ্ছে গরুর পাল, গুটিকয়েক বেয়াড়া গরু দলছুট হতে চাইছে। একে একে সবকটা গরু যাত্রা করার পর পিছু পিছু এগোলাম আমি। সবচেয়ে উঁচু ব্লফের চূড়ায় উঠে এসে চারপাশের এলাকা নিরীখ করলাম। যদ্র চোখে পড়ল, বিস্তীর্ণ প্রান্তরে বাতাসে দুলছে সবুজ ঘাস, অন্য কিছুই নেই। ড্র থেকে বেরিয়ে এসে পাহাড়ের দিকে এগোল একটা কালো অবয়ব, পিছু নিল আরও একটা…মোষ।
ট্রেইলে নজর রাখার সময় মেক্সিকানের কথা মনে পড়ল। ট্র্যাক ফেলে এসেছে সে-নিচু হয়ে পড়া ঘাস চোখে পড়ল, এখনও সিধে হয়নি। বোধহয় রাতে তৃণভূমি পেরিয়েছে লোকটা।
প্যাটার্সনটা হাতে রেখে ঢালু পথ ধরে নামতে শুরু করলাম। খুঁটিয়ে দেখছি ক্ষীণ ট্র্যাকগুলো। একেবারে কাছ থেকেও ঠিকমত চোখে পড়ছে না, যদিও মোটামুটি এগোতে পারছি।
ঘাসের ওপর রক্ত পড়েছে।
এগোতে এগোতে লোকটার দৃঢ় প্রত্যয় ও সাহসের নমুনা দেখতে পেলাম। মেক্সিকানের অবর্ণনীয় কষ্ট আর দুর্ভোগের জন্যে যারা দায়ী, তাদের প্রতি ঘৃণা অনুভব করছি। জাতশত্রুও এত কষ্ট দেয় না মানুষ। টেক্সাসের অনেক লোক, এমনকি আমার পরিচিত অনেকেই মনে করে ব্রা বিশ্বাস করে: ইন্ডিয়ান আর মেক্সিকানরা কেবলই করুণার পাত্র। যে-কোন অন্যায়ই এদের বিরুদ্ধে ন্যায্য।
মেক্সিকানের পরিচয় যাই হোক, বহু পথ সরে এসেছে। দারুণ সাহস দেখিয়েছে। মনে মনে লোকটার প্রতি সমীহ বোধ করছি। সাহস আম বীরত্ব প্রায় সমার্থক। কিন্তু খুব কমই খুঁটিয়ে বিবেচনা করে মানুষ। মুখে বলা এক কথা, কাজে প্রমাণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন। শারীরিক দুর্ভোগ, সীমাহীন কষ্ট, যন্ত্রণা বা অত্যাচার সহ্য করা সত্যিই কঠিন। মরা সবসয়ই সহজ, স্রেফ হাল ছেড়ে দিলেই হলো; ব্যস, মৃত্যুর সঙ্গে অবসান হবে সমস্ত যন্ত্রণা বা দুর্ভোগের। কিন্তু লড়াই করার অর্থ আরও দুর্ভোগ, আরও যন্ত্রণা। এমনকি সেটা কয়েকগুণ বেশিও হতে পারে। কষ্ট সহ্য করার এই সাহস করতে পারে না সবাই। যে পারে, সে শুধু সমীহ নয় বরং শ্রদ্ধা এবং প্রশংসার দাবীদার।
শুধু সাহস নয়, রীতিমত বীরত্ব দেখিয়েছে মেক্সিকান।
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রবল মনের জোরে ক্রল করে বহু পথ পাড়ি দিয়েছে সে, প্রতি পদে প্রাণের ঝুঁকি ছিল। অন্ধকারে লড়েছে নেকড়ের বিরুদ্ধে, মৃত্যুর প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিল; অথচ প্রাণপণ লড়াই করেছে লোকটা-সামান্য একটা ছুরি দিয়ে নেকড়ের দলকে ঠেকিয়ে দিয়েছে। সুস্থ থাকলে নেকড়ের দল কখনোই আক্রমণ করত না ওকে, অথচ দুর্বল বলেই একজন মানুষকে আক্রমণ করার দুঃসহাস দেখিয়েছে নিষ্ঠুর নেকড়ের দল। এরকম অসমসাহসী লোককে বন্ধু হিসেবে চাই আমি, কারণ এ ধরনের লোক সত্যিই বিরল।
গিরিখাতের কাছে এসে বাঁক নিয়ে দ্রুত ঘোড়া ছোটালাম, আড়াআড়ি পথে গরু পালের কাছে চলে যাওয়ার ইচ্ছে।
লোকটার মধ্যে এমন কি ছিল যে এভাবে মরিয়া হয়ে উঠেছিল? স্রেফ বেঁচে থাকার তীব্র ইচ্ছে, সমস্ত প্রতিকূলতা উতরে যাওয়ার দৃঢ় সংকল্প? নাকি অন্য কোন কারণে? যারা ওকে গুলি করে স্যাডল থেকে ফেলে দিয়েছিল, তাদের প্রতি ঘৃণাই শক্তি যুগিয়েছে, ওকে? প্রতিশোধ স্পৃহা, নাকি অন্য কিছু?
পালের কাছে পৌঁছে দেখলাম কার্লের সঙ্গে ড্রাগিঙের দায়িত্বে রয়েছেন বাবা।
মিলো বলছে লোকটার অবস্থা ভাল না, বললেন বাবা। কিছু দেখতে পেলে?
গতরাতে ক্রল করে অনেক পথ এসেছে লোকটা। ব্যস, এই।
দীর্ঘ সারিতে গরু জড়ো করা হচ্ছে, ড্রাগের কেন্দ্র থেকে প্রায় আধ-মাইল লম্বা হয়ে গেছে সারির দৈর্ঘ্য। বাবার সঙ্গে হাত লাগালাম, আরও কিছু গরুকে একত্র করলাম, টানা চলার মধ্যে থাকতে বাধ্য করলাম ওদের। কাউ-হাউসের সঙ্গে যতটা সম্ভব দূরত্ব সৃষ্টি করা দরকার, এবং যত জলদি শুকনো এলাকা পেরিয়ে যেতে পারব ততই মঙ্গল।
তবে দ্রুত এগোনোর ব্যাপারে অনিচ্ছুক গরুগুলো, কাউ-হাউসের তৃণভূমিতে ফিরে যাওয়ার আশা ছাড়েনি এখনও। দলছুট হওয়ার চেষ্টা করছে কোন কোনটা, কিন্তু সুবিধে করতে পারছে না।
এখন পর্যন্ত হর্নার আউটফিট বা রেনিগেডদের কোন নমুনা চোখে পড়েনি। সন্ধে হলো যখন, ততক্ষণে আরও পনেরো মাইল পেছনে ফেলে এসেছি আমরা। কলোরাডো নদীর কাছাকাছি একটা ব্লাফের ছায়ায় ক্যাম্প করলাম।
পরদিন থেকে নদীর কিনারা ধরে এগোলাম। ধুলো বা বৃষ্টি গ্রাহ্য করছি না, এগোতে পারলেই হলো। সারাদিন টানা চলার মধ্যে থাকে গরুগুলো, রাতে সবুজ তৃণভূমিতে চরে বেড়ায়। কলোরাডো নদীর পানি তেষ্টা মেটাচ্ছে ওদের। প্রতিদিন সকালে সূর্য ওঠার আগেই যাত্রা করছি, সন্ধের আগে থামছি না।
বৃষ্টি হয়নি বললেই চলে। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়েছে কয়েকবার, তাতে ট্রেইলের ধূলো থিতিয়ে এসেছে বটে, কিন্তু ওঅটরহোলে পানি জমেনি। নদী ক্রমশ শুকিয়ে আসছে দেখে উদ্বেগ ফুটে উঠল ট্যাপের মুখে। তবে কিছুই বলল না সে। বাবাও এ নিয়ে কথা বললেন না।
পশ্চিম যাত্রায় সর্বস্ব বাজি ধরেছি আমরা, সবকিছু হারানোর ঝুঁকি নিয়েছি। সামনে কি আছে জানি সবাই, এও জানি আশি মাইল দীর্ঘ রুক্ষ খটখটে জমি পেরিয়ে যেতে হবে স্বপ্নের এলাকায়।
দারুণ কষ্টকর যাত্রা। ক্লান্তিকর, একঘেয়ে। ক্ষারের মিহি প্রলেপ পড়েছে আমাদের মুখে, প্রায় সাদা হয়ে গেছে সবার মুখ, ঘোড়া আর পোশাকে ধুলোর পুরু আস্তর জমেছে। ঘামের ধারা পিঠে বা শরীরে জমে থাকা ধুলোর জমিনে আঁকাবাঁকা রেখা তৈরি করেছে। চেহারার আদল বদলে গেছে, যেন কিম্ভুতকিমাকার মুখোশ পরেছে সবাই। চলার পথে ওয়্যাগন থেকে নেমে আসছে বাচ্চারা, বাফেলো চিপস সংগ্রহ করছে, রাতে আগুন জ্বালাতে কাজে লাগবে ওগুলো। চিপস বহন করার জন্যে প্রতিটি ওয়াগনের পেছনে গরুর চামড়ার তৈরি বিশাল থলে ঝুলছে।
