পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমার গ্রুলার লাগাম চেপে ধরল ও।
সাবধান, কিড! ইন্ডিয়ান হতে পারে।
স্যাডল ছেড়ে সন্তর্পণে ঝোঁপের দিকে এগোলাম। নিঃশব্দে ঢুকে পড়লাম। প্রায় পুরোটা জীবন বুনো এলাকায় কেটেছে আমার, প্রকৃতির সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। চিতার ক্ষিপ্রতায় চলতে শিখেছি, ঘুটঘুঁটে অন্ধকারে পাতার ওপর দিয়েও নিঃশব্দে এগোতে পারি।
কয়েক পা এগিয়ে, থেমে কান পাতলাম। গোড়ালির ওপর বসে ঝোঁপের দিকে উঁকি দিলাম। কিন্তু গাঢ় অন্ধকারের কারণে কিছুই চোখে পড়ল না। ক্ষীণ খসখসে, এবং শ্বাস টানার শব্দ কানে এল..বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়েছে কেউ!
শব্দের উৎস বরাবর প্যাটার্সনের মাজল স্থির করলাম, নিচু স্বরে সতর্ক করলাম লোকটাকে: পাঁচ শটের একটা প্যাটার্সনে কাভার করেছি তোমাকে, মিস্টার। যদি বিপদে পড়ে থাকো, নিশ্চিন্তে বলতে পারো। কিন্তু বেতাল কিছু করলে রাইফেল খালি করে ফেলব আমি।
অস্কুট একটা শব্দ হলো, মনে হলো কেউ কথা বলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে কোন কারণে। তারপর একেবারে নীরব হয়ে গেল চারপাশ।
ঝোঁপের ভেতরে আলগোছে সেঁধিয়ে গেলাম আমি। উইলোর সারির ফাঁকে সরু একটা পথ ধরে কয়েক গজ এগোতে খোলা জায়গায় পৌঁছলাম। আকাশে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। আবছা ভাবে ঘাসের ওপর গাঢ় একটা আকৃতি চোখে পড়ল।
কথা বলো! আরেকটু জোরাল স্বরে বললাম।
জবাব এল না। হঠাৎ পাশে ক্ষীণ নড়াচড়ার শব্দ শুনতে পেলাম, ঘেউ করে ডেকে উঠল একটা কুকুর। কার্ল ক্রকেটের কুকুর।
সাবধান, বাছা! কুকুরটার উদ্দেশে ফিসফিস করলাম আমি। গন্ধ শুকে এগিয়ে যাচ্ছে ওটা।
কোন পশু নয়, নিশ্চিত ধারণা আমার। কৌতূহলী হয়ে এগোলাম, অস্পষ্ট একটা কাঠামো চোখে পড়ল। প্রায় মুমূর্ষ একজন মানুষ।
ট্যাপ? নিচু স্বরে উকিলাম। আহত একজন লোক। জখমটা গুরুতর বোধহয়।
আসছি আমি, সঙ্গে সঙ্গে জানাল সে।
তুমি বরং মিলোকে নিয়ে এসো।
আমাদের মধ্যে কেবল মিলো ডজই জখমের চিকিৎসা বা শুশ্রূষা সম্পর্কে মোটামুটি জানে। বুনো নির্জন এলাকায় ডাক্তার পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। সত্যি কথা বলতে কি, পঁচিশ বছরের জীবনে এ পর্যন্ত কোন ডাক্তার দেখিনি আমি, যদিও অস্টিনে থাকে একজন; সম্ভবত স্যান এন্টোনিয়াতেও আছে দু’একজন। কেউ অসুস্থ বা জখম হলে, যেহেতু কোথাও ছুটে যাওয়ার মত জায়গা নেই, সাধ্যমত নিজেরাই চিকিৎসা করি আমরা।
মিনিট কয়েকের মধ্যে মিলো ডজকে নিয়ে ওখানে পৌঁছল ট্যাপ। ইতোমধ্যে শুকনো ডালপালা যোগাড় করে ছোটখাট একটা আগুনের কুণ্ড জ্বালিয়ে ফেলেছি আমি।
আহত লোকটা মেক্সিকান। ছিপছিপে দেহ, সুদর্শন মানুষ। কালো গোঁফ। কাউকে এত বিধ্বস্ত অবস্থায় কখনও দেখিনি আমি। শার্ট জ্যাকেট ছাড়িয়ে হাঁটু পর্যন্ত পুরো প্যান্ট রক্তে ভিজে গেছে। হেঁচড়ে, ক্রল করে বহুদূর এসেছে লোকটা, কিন্তু এখনও তার এক হাতে একটা ছোরা রয়েছে, এত শক্ত ভাবে চেপে ধরে রেখেছে যে আমরা কেউই মুঠি থেকে ওটা খসাতে পারলাম না।
ছিড়ে ফালাফালা হয়ে যাওয়া জ্যাকেটের আস্তিনের দিকে ইঙ্গিত করল মিলো। নেকড়ে আক্রমণ করেছিল ওকে! লোকটার কজির চামড়া ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। ছুরি দিয়ে নেকড়ের বিরুদ্ধে লড়েছে ও। কঠিন সময় পার করেছে বেচারা!
গরুর কাছে ফিরে যাচ্ছি আমি, বলল ট্যাপ। মিলোর সঙ্গে থাকো, ড্যান ফ্রি স্কয়ার পালের দায়িত্বে থাকবে আমার সঙ্গে।
নড়ে উঠল মেক্সিকান, বিড়বিড় করে বলল কি যেন। এদিকে ছুরি দিয়ে রক্তাক্ত কাপড় কৈটে ফেলেছে মিলো। লোকটাকে পরীক্ষা করতে ঘটনাটা ক্রমে পরিষ্কার হয়ে গেল।
কয়েকদিন আগে, অন্য কোথাও গুলি খেয়ে স্যাডল থেকে পড়ে যায় লোকটা। ঘোড়াটা হেঁচড়ে টেনে নিয়ে যায় ওকে অসমতল পথে: হেঁচড়ানোর কারণে সমস্ত বুক আর পেটের চামড়া ছিলে গেছে। কোন ভাবে পিস্তল বের করে, গুলি করে উন্মত্ত ঘোড়াটাকে থামায় সে। পশ্চিমে অস্ত্র বহন করার এটাও একটা কারণ, যেহেতু আধ-পোষা বুনো ঘোড়ায় চড়তে হয় আমাদের, যে-কোন সময় পিঠ থেকে সওয়ারীকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে ঘোড়াটা।
তারপর ক্রল করেছে মেক্সিকান। রক্তের গন্ধ পেয়ে ওক আক্রমণ করে নেকড়ের দল। কাজ শেষ হওয়ার পর ছুরি দিয়েই নেকড়ের মোকাবিলা করেছে সে।
বাঁচার জন্যে মরিয়া ছিল ও, শুকনো স্বরে বলল মিলো। লড়েছেও আপ্রাণ!
ভাবছি কে গুলি করেছে ওকে!
আমার দিকে ফিরলো মিলো। আমার ধারণা, পশ্চিম দিক থেকে এসেছে ও।
পানি গরম করে ক্ষতের শুশ্রূষা করলাম আমরা। মেক্সিকানের পুরো শরীর মুছে দিলাম। বুলেট আর হেঁচড়ানোর ক্ষতগুলো কয়েকদিনের পুরানো, কিছু কিছুতে সংক্রমণ শুরু হয়েছে। কজিতে নেকড়ের দাঁতের দাগ পরের-কালকের বোধহয়।
বুলেটটা ছেদা করে ফেলেছে তাকে, পিঠের চামড়ার বিপরীতে গিয়ে থেমেছে। বাউই ছুরি দিয়ে ছোট একটা ফুটো তৈরি করল মিলো, সীসা বের করে ফেলল মেক্সিকানের শরীর থেকে। তারপর সেজ পাতার পুলটিশ দিয়ে বুলেটের দুটো চেরাই ভরে দিল।
শুশ্রূষা যখন শেষ হলো, ততক্ষণে পুরোপুরি সকাল হয়ে গেছে। একটা ওয়্যাগন নিয়ে এসে মেক্সিকানকে তুলে নিয়েছে কার্ল ক্ৰকেট।
গরুর দল যাত্রা শুরু করেছে। সবার শেষে ছিলাম আমরা। অন্যান্য ওয়্যাগন আগেই চলে গেছে। টিম অটম্যানের দেয়া ম্যাট্রেসের ওপর মেক্সিকান ইয়ে দেয়া হয়েছে ওয়্যাগনের পাটাতনে।
