আর কিছু না বলে চলে গেল সে ক্যাম্পের দিকে।
বিভিন্ন বিচারে সে একজন অদ্ভুত মানুষ। প্রায় তিন বছর ধরে আমাদের হয়ে কাজ করছে, অথচ লোকটার ধাত এখনও বুঝে উঠতে পারিনি। প্রথম পরিচয়ের সময় ওকে যতটা জানতাম, তারচেয়ে বেশি কিছু জানি না। এটা অবশ্য মোটেও অস্বাভাবিক নয়। ব্যক্তিগত বিষয় সয়ত্নে এড়িয়ে চলে সবাই, এটাই রীতি; আর টেক্সাসে আসা বেশিরভাগ মানুষ “ভূতুড়ে” অতীত পেছনে ফেলে এসেছে, যেটা ওরা নিজেরাও ভুলে যেতে পারলে স্বস্তি বোধ করবে।
টেক্সাসে কারও অতীত সম্পর্কে প্রশ্ন করা রীতিবিরুদ্ধ, কারণ জিনিসটা একান্তই তার নিজস্ব ব্যাপার। মানুষের পরিচয় কাজে। যার যা করা উচিত সেটা ঠিকমত করল কিনা, এটাই বিবেচ্য এবং যতক্ষণ পর্যন্ত কাজটা করছে সে, অতীতে কি ঝামেলায় পড়েছিল তা নিয়ে আমল দেয় না কেউ। আইনের ক্ষেত্রেও তাই। আইন সবাইকে নিজের মত থাকতে দেয়। কোন লোক অন্য কোথাও যতই অবাঞ্ছিত বা ফেরারী হোক, যতক্ষণ পর্যন্ত স্থানীয় কোন ঝামেলায় না জড়াবে, কেউই এ নিয়ে ভাববে না বা প্রশ্ন করবে না।
এ কারণেই বাবার হয়ে কাজ করছে এমন বেশ কয়েকজনের ঘোলাটে অতীত সম্পর্কে কিছু জানা নেই আমাদের, কিন্তু কাজে খুঁত নেই ওদের, ব্র্যান্ডের প্রতি আন্তরিকতায়ও খাদ নেই। আর এটাই আমাদের প্রত্যাশা।
রীজের ওপরে ডেকে উঠল একটা কয়োট, আকাশের তারাকে দুনিয়ার অভিযোগ জানাল বোধহয়? আসল কয়োর্ট, ইন্ডিয়ান নয়। ইন্ডিয়ানরা কয়োটের ডাক নকল করে সঙ্কেত দেয়। অনভিজ্ঞ লোকের জন্যে দুটোর মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল বৈকি, কিন্তু দুটোই যখন শোনে কেউ, পার্থক্য ধরতে অসুবিধা হয় না। কেবল মানুষের কণ্ঠেরই জোরাল প্রতিধ্বনি সৃষ্টি হয়, কয়োট বা নেকড়ের ডাকের প্রতিধ্বনি হলেও তীক্ষ্ণতায় সেটা দুর্বল, আর পেঁচা বা কোয়েলের ডাকের সামান্য প্রতিধ্বনিও সৃষ্টি হয় না।
পালের ওপাশে আছে ট্যাপ, নিচু স্বরে গান গাইছে। গলাটা মন্দ নয় ওর। “ব্রেনান অন দ্য মূর” গাইছে-বহু পুরানো আইরিশ গান। পালের চারপাশে চক্কর দেয়ার ফঁক ঘোড়ার রাশ টেনে থামলাম আমি, কান খাড়া করলাম।
কয়োটটা চুপ হয়ে গেছে…ট্যাপের গান শুনছে বোধহয়•••তারাগুলোর উজ্জ্বলতা বেড়ে গেছে। সবকিছু একেবারে শান্ত, আর কোন শব্দ নেই, শুধু ক্রীকে পানি প্রবাহের কুলকুল ধ্বনি শোনা যাচ্ছে।
বিশাল একটা বলদ উঠে দাঁড়িয়ে শরীর টানটান করল। ঠাণ্ডা ঝিরঝিরে বাতাস বয়ে যেতে ঝট করে মাথা তুলল ওটা। যে-লোক শুধু নিজের শ্রবণশক্তির ওপর আস্থা রাখে সে অাসলে নেহাত বোকা…শুধু দেখতে আর শুনতে সক্ষম হলেই চলে না; বরং পশু-পাখির প্রতিক্রিয়া বা আচরণ দেখেও অনেক কিছু অনুমান করতে হয়। আসন্ন বিপদের আভাস আগে থেকে টের পায় এরা, মানুষের ইন্দ্রিয়ে যা কখনোই ধরা পড়ে না।
একটা কিছু নড়াচড়া করছে ক্ৰীকের পাড়ের ঝোঁপের আড়ালে। ঘুরে দাঁড়িয়ে সেদিকে ফিরেছে বলদটা, দু’পা এগিয়ে গেছে। প্যাটার্সনটা একটু তুলে সন্তর্পণে হ্যামার টানলাম। ক্লিক শব্দটা নিস্তব্ধ রাতে জোরাল শোনা গেল, আমার দিকে একটা কান খাড়া করল বলদটা, কিন্তু ঝোঁপের ওপর সম্পূর্ণ মনোযোগ ওটার, দৃষ্টি সরায়নি মুহূর্তের জন্যেও।
পালের ওপাশে রয়েছে ট্যাপ, টের পেলাম ঘোড়াকে হটিয়ে নিয়ে এগিয়ে আসছে। শুধু বলদটাই নয়, কাছাকাছি অন্য গরুগুলোও টের পেয়ে গেছে অস্বাভাবিক কিছু একটা আছে ঝোঁপের আড়ালে। অস্বস্তিতে নড়াচড়া করছে ওরা।
খানিকটা ঝুঁকি নিয়ে বেরিয়ে এলাম অন্ধকার থেকে, দেখতে চাই ঘটনা কি। নিচু কোমল স্বরে কথা বললাম, আশ্বস্ত করতে চাইলাম গরুগুলোকে। ধীরে ধীরে ঝোঁপের কাছে চলে যাচ্ছে আমার ঘোড়া।
হয়তো বিপদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।
মাথা নিচু করে রেখেছে বিশাল বলদটা, এক পা এগোল। আবছা অন্ধকারেও ওটার নাকের পাটা ফুলে উঠতে দেখতে পেলাম। অদ্ভুত কোন কারণে রেগে গেছে ওটা; লড়াই করতে ইচ্ছুক-ব্যাপারটা বিস্মিত করে তুলল আমাকে।
গরু ইন্ডিয়ানদের উপস্থিতি বা গন্ধ পছন্দ করে না। কাছাকাছি কোন ইন্ডিয়ান এলে ছটফট করে ওরা…হয়তো রেডস্কিনদের গায়ের গন্ধের কারণে, কিংবা ওদের চামড়ার পোশাকের গন্ধে। কিন্তু গরুগুলোর আচরণ দেখে মনে হচ্ছে না আশপাশে কোন ইন্ডিয়ান আছে।
সাদা মানুষকে কাছে আসতে দেখলে মোটেই উত্তেজিত হয় না ওরা। বাঘ বা ভালুকের উপস্থিতি টের পেলে অস্থির বা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তেমনও করছে না গরুগুলো। ট্রেক্সাসের এসব পাহাড়ী অঞ্চল বা এডওয়ার্ডস প্লেটো এলাকায় গ্রিজলি বা সিংহের উপস্থিতি মোটেই অস্বাভাবিক নয়।
গ্রুলাটা এগোচ্ছে, রাইফেলটা আরও সিধে করলাম, তারপর কান পাতলাম।
আমার আগে আগে এগোচ্ছে বলদটা। ভয় পায়নি, বরং লড়াই করার জন্যে মুখিয়ে আছে ওটা। এদিকে, আমার উপস্থিতিতে স্বস্তিও বোধ করছে।
হঠাৎ শব্দটা কানে এল।
কান খাড়া করতে পরিষ্কার শুনতে পেলাম। ক্ৰীকের পাড়ে ঘাসের ওপর দিয়ে হেঁচড়ে এগোচ্ছে কেউ, কিংবা ভারী কিছু টেনে নিয়ে আসছে।
থেমে গেল শব্দটা, তারপর আবার শুরু হলো কয়েক মিনিট পর।
আমার পাশে চলে এসেছে ট্যাপ। ব্যাপার কি, ড্যান? ফিসফিস করে জানতে চাইল ও।
কিছু একটা পিছলে বা টেনে নিয়ে আসার শব্দ। কাভার করো আমাকে। দেখা দরকার।
