প্রথম রাতে পনেরো মাইল দুরে ক্যাম্প করলাম আমরা। ঝর্নার পাড়ে এক চিলতে খোলা জায়গা বেছে নিয়েছি, যথেষ্ট ঘাস রয়েছে। আশা করা যায় দলছুট হবে না গরুগুলো। সঙ্গে কি কয়েক মাইল দূরে লিয়ন নদীতে গিয়ে পড়েছে।
রাতের প্রথম দিকে পাহারায় থাকল বেন টিল্টন আর জিম মুর, পালের ওপর নজর রাখছে সারাক্ষণ। চাক-ওয়্যাগনের কাছে চলে এল অন্যরা, মেয়েরা রান্নার আয়োজন করছে।
এখন থেকে প্রায় রুটিনমাফিক চলবে সবকিছু ব্যতিক্রম হবে খুবই কম। যদি না কোন ঝামেলা হয়। সারাদিনে পনেরো মাইল এগোনো সম্ভব, যদিও গড়ে বারো মাইল হলেও সন্তুষ্ট হব আমরা। ঘোড়া কম আমাদের, মাথা পিছু পাঁচটা করে আছে: কিন্তু এতবড় ড্রাইভের জন্যে জনপ্রতি অন্তত আট-নয়টা ঘোড়া দরকার।
পাল যেহেতু বিশাল, পানি পান করার জন্যে ছড়িয়ে পড়বে গরুগুলো, মাইল খানেক দূরে সরে যাওয়াও বিচিত্র নয়। ঘাসে চরার পর ভরপেট খেয়ে ঘুমাবে ওরা, প্রায় মাঝরাতে জেগে উঠবে, হাত-পা ঝেড়ে খানিক ঘোরাফেরা করবে, তারপর আবার ঘুমিয়ে পড়বে। কয়েক ঘন্টা পর, জেগে আড়মোড়া ভেঙে ফের ঘুমিয়ে পড়বে। দ্বিতীয়বারের সময় কিছু গরু হয়তো সরে পড়তে পারে। কিন্তু ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াবে সব গরু, চলার জন্যে তৈরি হয়ে যাবে। সাধারণ আবহাওয়ায় ওদের সামলে রাখার জন্যে দুজনই যথেষ্ট, কিন্তু ঝড় হলে প্রতিটি লোককে দরকার হবে।
কাপ আর টিনের থালা হাতে আগুনের কাছে চলে গেলাম, বেন টিল্টনের কণ্ঠ কানে এল-ঘুম তাড়ানোর জন্যে গান গাইছে। গান গাওয়ার বাড়তি একটা সুবিধে রয়েছে-নিজেকে নিঃসঙ্গ মনে হয় না; এর আংশিক কারণ: কণ্ঠটা মানুষের-বেশিরভাগ কাউহ্যান্ড যখন গান গায়, কণ্ঠটা ওদের নিজের কাছেই অপরিচিত মনে হয়। গরুগুলোর ওপরও গানের প্রভাব রয়েছে। রাইডারের উপস্থিতিতে শান্ত থাকে ওরা, মানুষের চলন্ত ছায়া দেখে আশ্বস্ত হয়, বুঝে নেয় সবকিছু স্বাভাবিক আছে।
আমার কাপ আর থালা ভরে দিল ইলেন।
রাইড করতে অসুবিধে হয়নি তো? জানতে চাইলাম।
দায়সারা গোছের মাথা নাড়ল ও, আমাকে ছাড়িয়ে চলে গেল। দৃষ্টি-ট্যাপের দিকে।
মানুষটা ও ভালই, শুকনো স্বরে বললাম।
চিবুক উঁচু হয়ে গেল মেয়েটার, গলায় আপসের সুর। ওকে পছন্দ করি আমি। মুহূর্ত খানেক পর যোগ করল: যত যাই হোক, তোমার ভাই।
খাবার নিয়ে ট্যাপের পাশে গিয়ে বসলাম।
কেমন চলছে তোমার, কিড? জানতে চাইল সে।
নীরবে খাওয়া সেরে নিলাম আমরা। সম্ভবত সবাই কম-বেশি ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে, অতীতটাও চলে আসছে ভাবনায় পেছনে কি ফেলে এসেছি সেটা মোটেও গুরুত্বপূর্ণ নয় এখন, বরং ভবিষ্যতে কি আছে সেটাই আসল ব্যাপার। সামনে বিস্তীর্ণ বন্ধুর প্রান্তর; বসন্ত বলে মোটামুটি ঘাস রয়েছে তৃণভূমিতে, তাই যে-কোন সময়ের চেয়ে আমাদের সম্ভাবনা এখন অনেক বেশি। হর্স হেড ক্রসিং পর্যন্ত ভালই কাটার কথা।
প্যাটার্সনটা পরিষ্কার করে ক্যাম্প থেকে সরে এলাম। সারাদিনে প্রচণ্ড খাটুনির পর একটা বিছানাই হতে পারে সবচেয়ে উপযুক্ত জায়গা। অন্যদের কাছ থেকে কিছুটা দূরে বিছানা করলাম যাতে রাতের শব্দ ঠিকমত শুনতে পাই, ক্যাম্পের সাড়াশব্দ বাইরের, সমস্ত আওয়াজ ঢেকে ফেলবে।
মেঘের দল ছুটছে বাতাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে, আকাশ পরিষ্কার এখন। চাঁদের ম্লান আলোয় ভাসছে নিসর্গ। তৃণভূমির ঘাসে চরছে গরুর পাল। কোথাও কোন অস্বাভাবিকতা নেই। নিশাচর কয়েকটা পাখি ডেকে উঠছে মাঝে মধ্যে।
ঘুমিয়ে পড়লাম।
কাঁধে কারও ঝাঁকুনিতে ঘুম ভাঙল আমার। চার্লি হীথ। দ্বিতীয় পালায় সে আর বুচার্ড পাহারা দিয়েছে।
বেডরোল ছেড়ে মাথায় হ্যাট চাপালাম। পায়ে বুট গলিয়ে দেখলাম এখনও একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে টিল্টন, তামাক চিবুচ্ছে। কিছু বলার জন্যে মুখ খুলল সে, শেষ মুহূর্তে মত পাল্টে ঘুরে দাঁড়াল, হেঁটে আগুনের দিকে চলে গেল। আগুনে শিখা নেই এখন, জ্বলন্ত কয়লার কোমল কিন্তু ম্লান উষ্ণতায় ক্যাম্পের কিছু অংশ চোখে পড়ছে।
প্যাটার্সন হাতে আগুনের কাছে চলে গেলাম আমি। গোড়ালির ওপর ভর দিয়ে বসে আছে ট্যাপ, আমার সঙ্গে ওর পাহারা দেয়ার কথা। দু’হাতের তালুয় গরম কাপ ধরে রেখেছে বাড়তি উষ্ণতার আশায়, কফিতে চুমুক দিচ্ছে মাঝে মধ্যে। মুখ তুলে আমার দিকে তাকাল ও, তবে কিছু বলল না।
ড্রাইভ চলাকালীন সময়ে হসল্যারের দায়িত্ব নিয়েছে টম জেপসন। যখনই প্রয়োজন হচ্ছে, ঘোড়া তৈরি করে দিচ্ছে। খেয়াল করলাম জেগে গেছে সে, আমার জন্যে একটা গ্রুপ্সাও ধরেছে। সাধারণত যার যার ঘোড়া তার নিজেরই ধরতে বা স্যাডল পরাতে হয়, কিন্তু ইদানীং রাতে তেমন ঘুম হয় না বলে স্বেচ্ছায় কাজটা নিয়েছে টম। তবে আমার কাছে মনে হচ্ছে ওর যে সমস্যা, অযথা উদ্বেগে না ভুগে বরং আরও বেশি বিশ্রাম নেওয়া উচিত ওর।
রাতটা শীতল। চাঁদের দিকে তাকিয়ে সময় আন্দাজ করলাম, ভোর হতে আরও তিন ঘণ্টার মত বাকি। কড়া কালো আরেক কাপ কফি গিলে ঘোড়ার কাছে চলে এলাম, স্যাড়লে চাপলাম। প্রথমে দু’বার চক্রাকারে ক্যাম্পের চারপাশে চক্কর মারল ঘোড়াটা, হালকা পা ফেলছে। পালের কাছে চলে এলাম।
শান্ত, সংক্ষেপে জানাল টিল্টন। একেবারে শান্ত সবকিছু।
