স্বামীর দিকে হাত বাড়িয়ে আর ঘরের লোক স্লিউদ্দিনকে হেসে স্বাগত করে তিনি বললেন, ‘আহ্ বেশ ভালো হল!’ আর প্রথম যে কথাটা তাঁর প্রতারণার ঝোঁক তাঁর মুখে জুগিয়ে দিলে, সেটা হল, ‘রাত কাটাচ্ছ তো? এবার আমরা একসাথে রওনা দেব। দুঃখের কথা বেত্সিকে কথা দিয়েছি। সে আমাকে নিতে আসবে।’
বেত্সির নাম শুনে মুখ কোঁচকাল কারেনিনের।
তিনি তাঁর বরাবরের রহস্যের সুরে বললেন, ‘আরে না, অবিচ্ছেদ্যকে বিচ্ছিন্ন করতে আমি যাব না। আমি যাব মিখাইল ভাসিলিয়েভিচের সাথে। ডাক্তারও আমাকে হাঁটাহাঁটি করতে বলছে। হেঁটে যাব রাস্তা দিয়ে আর কল্পনা করব যে আছি খনিজ পানির এলাকায়।’
আন্না বললেন, ‘তাড়াহুড়ার কিছু নেই। চা খাবে?’ ঘণ্টি দিলেন তিনি।
‘চা দিন-না, সেরিওজাকে বলুন যে কারেনিন এসেছেন। তা কেমন আছ তুমি? মিখাইল ভাসিলিয়েভিচ আমাদের এখানে আপনারা আসেননি, দেখুন কি সুন্দর আমাদের ঝুল-বারান্দা,’ বললেন তিনি কখনো একে কখনো ওকে লক্ষ্য করে।
কথা বলছিলেন তিনি সহজ-স্বাভাবিক সুরে কিন্তু বড় বেশি এবং বড় তাড়াতাড়ি। নিজেই তিনি তার টের পাচ্ছিলেন, বিশেষ করে মিখাইল ভাসিলিয়েভিচ যে কৌতূহলী দৃষ্টিতে চাইছিলেন তা থেকে তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, উনি কেমন যেন নজর করে দেখছেন তাঁকে
মিখাইল ভাসিলিয়েভিচ তখনই চলে গেলেন বারান্দায়।
আন্না স্বামীর পাশে বসলেন। বললেন, ‘তোমার চেহারা খারাপ দেখাচ্ছে।’
উনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আজ ডাক্তার এসেছিল। এক ঘণ্টা সময় নিয়েছে। মনে হয় আমার বন্ধু-বান্ধবদের কেউ পাঠিয়েছিল। আমার স্বাস্থ্য এদের কাছে খুবই মূল্যবান…’
‘কিন্তু কি সে বলল?’
ওঁর স্বাস্থ্য, কাজকর্মের কথা জিজ্ঞেস করলেন আন্না, বললেন বিশ্রাম দরকার, চলে আসুন তাঁর কাছে।
আন্না এসবই খুশির সুরে বললেন, চোখে ঝিলিক তুলে; কিন্তু কারেনিন সে সুরে কোন তাৎপর্য দিলেন না, তিনি শুধু তাঁর কথা শুনলেন এবং শুধু তাদের সোজাসাপটা মানেটাই ধরলেন। তিনি জবাবও দিলেন সাদাসিধে, যদিও রহস্য করে। আলাপটায় বিশেষত্ব কিছু ছিল না, কিন্তু পরে লজ্জার একটা যন্ত্রণা ছাড়া এই ছোট দৃশ্যটা স্মরণ করতে পারতেন না আন্না।
গৃহশিক্ষিকা সমভিব্যহারের ঘরে ঢুকল সেরিওজা। কারেনিন যদি পর্যবেক্ষণ করার সাহস রাখতেন, তাহলে দেখতে পেতেন যে ছেলেটা ভীরু ভীরু বিহ্বল দৃষ্টিতে চাইল প্রথমে বাবা, পরে মায়ের দিকে। কিন্তু কিছুই তিনি দেখতে চাইছিলেন না এবং দেখলেন না।
‘আ, নবযুবক যে। বেড়ে উঠেছে…সত্যি, একেবারে মরদ। স্বাগত নবযুবক।’
করমর্দনের জন্য তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন সন্ত্রস্ত সেরিওজার দিকে। বাবার সাথে সম্পর্কে সেরিওজা আগেও ছিল সংকুচিত। আর এখন কারেনিন তাকে ‘নবযুবক’ বলে ডাকতে শুরু করা এবং ভ্রন্স্কি শুধু না মিত্র এই প্রহেলিকাটা মাথায় ঘুরতে থাকার পর বাপ তার কাছে একেবারে পর হয়ে উঠেছে। মায়ের দিকে সে চাইল যেন সাহায্য প্রার্থনা করে। শুধু মায়ের কাছে থাকলেই সে ভালে বোধ করত। কারেনিন ওদিকে গৃহশিক্ষিকার সাথে কথা বলতে বলতে কাঁধ ধরে রেখেছেন ছেলের, সেরিওজা এমন যন্ত্রণাকর অস্বস্তি হচ্ছিল যে আন্না দেখতে পেলেন যে ছেলেটার কান্না পাচ্ছে।
ছেলে ঘরে ঢুকতেই আন্না লাল হয়ে উঠেছিলেন, আর এখন সেরিওজার অস্বস্তি হচ্ছে লক্ষ্য করে ছেলের কাঁধ থেকে কারেনিনের হাত সরিয়ে দিয়ে, তাকে চুমু খেয়ে নিয়ে গেলেন বারান্দায় এবং তখনই ফিরে এলেন।
নিজের ঘড়ি দেখে বললেন, সময় কিন্তু হয়ে গেছে। বেত্সি আসছে না কেন! …
‘হ্যাঁ,’ বলে কারেনিন উঠে দাঁড়িয়ে আঙুল মটকালেন। ‘আমি আরো এলাম তোমাকে টাকা দেবার জন্যে, কেননা রূপকথা শুনে তো আর নাইটিঙ্গেলের পেট ভরে না’, তিনি বললেন, ‘মনে হয়, তোমার এটা দরকার।’
‘না দরকার নেই…ও হ্যাঁ, দরকার আছে’, স্বামীর দিকে না তাকিয়ে মাথার চুলের গোড়া পর্যন্ত লাল হয়ে আন্না বললেন, ‘ঘোড়দৌড়ের পর তুমি এখানে আসবে আশা করি।’
কারেনিন বললেন, ‘হ্যাঁ’, তারপর জানালা দিয়ে অনেক উঁচুতে বসানো ছোট্ট কোচবক্স আর বরারের টায়ার লাগানো বিলাতি গাড়ি আসতে দেখে যোগ করলেন, ‘এই যে পিটার্সহফের সুন্দরী, প্রিন্সেস ভেস্কায়া। কি জমকালো! আহা মরি! তাহলে আমরাও চলি।’
প্রিন্সেস ভেস্কোয়া গাড়ি থেকে নামলেন না শুধু বুট, কেপ আর কালো টুপি পরা তাঁর খানসামা নেমে এল দেউড়ির কাছে।
‘আমি চললাম, আসি’, বলে ছেলেকে চুমু খেযে আন্না স্বামীর কাছে গিয়ে হাত বাড়িয়ে দিলেন, ‘এসে খুব ভালো করেছ।’
আলেক্সেই আলেক্সান্দ্রভিচ কারেনিন তাঁর হাতে চুমু খেলেন।
‘আসি তাহলে। তুমি চা খেতে আসবে তো, চমৎকার হবে।’ এই বলে আন্না বেরিয়ে গেলেন হাসিখুশিতে ঝলমলিয়ে। কিন্তু স্বামী চোখের আড়াল হতেই হাতের যেখানটায় তাঁর ঠোঁটের ছোঁয়া লেগেছিল সেটা অনুভব করে কেঁপে উঠলেন ঘৃণায়।
আটাশ
যখন ঘোড়দৌড়ের মাঠে কারেনিন পৌঁছলেন, আন্না তখন বেত্সির পাশে সেই মঞ্চে বসে ছিলেন যেখানে জমা হয়েছিল গোড়া উঁচু সমাজের লোকজন। স্বামীকে তাঁর চোখে পড়েছিল দূর থেকেই। দুটো মানুষ, স্বামী আর তাঁর প্রণয়ী ছিল তাঁর জীবনের দুই কেন্দ্র, বাহ্যিক অনুভূতির সাহায্য ছাড়াই তিনি টের পাচ্ছিলেন তাঁদের নৈকট্য। দূর থেকেই তিনি অনুভব করছিলেন স্বামী কাছিয়ে আসছেন, আর যে জনতরঙ্গের মধ্যে দিয়ে তিনি এগোচ্ছিলেন, তার ভেতর অজ্ঞাসতারেই লক্ষ্য করছিলেন, তাঁকে। তিনি দেখলেন, মঞ্চের দিকে আসতে আসতে তিনি কখনো তোষামোদে অভিবাদনের উত্তর দিচ্ছিলেন কৃপা প্রদর্শনের ভঙ্গিতে, কখনো সমক্ষকদের অভিনন্দন জানাচ্ছিলেন প্রীতিভরে, অন্যমনস্কের মত, কখনো সমাজের গণ্যমান্যদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টায় উদ্গ্রীব হয়ে তাঁর কানের ডগা চেপে ধরা মস্ত গোল টুপিটা খুলছিলেন। এই সমস্ত ধরন-ধারন আন্নার জানা আছে, আর সবই তাঁর কাছে জঘন্য লাগছিল। তাঁর মনে হল, ‘এ সবই কেবল আত্মাভিমান, শুধুই উন্নতির বাসনা-মাত্র এই আছে তার মনের ভেতর। আর বড় বড় কথা, শিক্ষাবিস্তার, ধর্মের জন্যে অনুরাগ—এগোলো কেবল উন্নতি করতে পারার উপায়।’
