ঘোড়দৌড়ের দিনটা ছিল কারেনিনের কাছে খুবই কর্মব্যস্ত একটা দিন; কিন্তু সকালেই দিনের কর্মসূচি স্থির করার সময় তিনি ভেবেছিলেন তাড়াতাড়ি দিবাহার সেরে তিনি পল্লীভবনে যাবেন স্ত্রীর কাছে, সেখান থেকে ঘোড়দৌড়ে, যেখানে থাকবে গোটা রাজদরবার, তাঁরও সেখানে থাকা উচিত। স্ত্রীর কাছে তিনি যাচ্ছেন কারণ শোভনতার জন্য সপ্তাহে একবার করে সেখানে যাবেন বলে স্থির করেছিলেন। তাছাড়া সেদিন পনেরোই, এই তারিখে খরচার জন্য টাকা দেবার একটা রেওয়াজ গড়ে উিেছল।
তিনি স্ত্রীর সম্পর্কে এটুকু ভাবার পর যেটা স্ত্রীর ব্যাপার নিজের ভাবনার ওপর দখল থাকায় সেখানে নিজের ভাবনা প্রসারিত হতে দিলেন না।
এই সকালটায় কারেনিনের কাজ ছিল প্রচুর। আগের দিন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা পিটার্সবুর্গে আগত একজন নামকরা পর্যটকের চীন ভ্রমণ সম্পর্কে পুস্তিকা পাঠিয়ে লিখেছিলেন যে তাঁকে যেন ডাকা হয়, নানা কারণে লোকটা চিত্তাকর্ষক ও প্রয়োজনীয়। সন্ধ্যায় বইটি কারেনিন পড়ে উঠতে পারেননি, সেটা শেষ করলেন আজ সকালে। তারপর যাজকেরা আসে, শুধু হল রিপোর্ট লেখা, আপ্যায়ন করা, নিয়োগ বরখাস্ত পুরস্কার, পেনশন, মাহিনা দানের হুকুম, পত্রালাপ। অর্থাৎ কারেনিন যাকে বলতেন দৈনন্দিন কাজ যাতে অনেক সময় যায়। তারপর ছিল তাঁর নিজের কাজ, ডাক্তারের আগমন, সরকার। সরকার বেশি সময় নেয়নি। কারেনিনকে প্রয়োজনীয় টাকাটা দিয়ে সে কেবল সংক্ষেপে বিষয়-আশয়ের হাল জানায় যায় বিশেষ ভালো যাচ্ছিল না। কেননা বর্তমান বছরে ব্যক্তিগত সফরের জন্য অনেক খরচ হওয়ায় টান পড়েছে টাকায়। কিন্তু ডাক্তার, পিটার্সবুর্গের নামকরা ডাক্তারটা কারেনিনের সাথে সৌহার্দ্য থাকায় সময় নিলেন অনেক। কারেনিন আজ তাঁকে আশা করেননি, তাঁর আসায় তিনি অবাক হয়েছিলেন আরো এই জন্য যে তিনি খুব মন দিয়ে তাঁর স্বাস্থ্যেও কথা জিজ্ঞেস করেন, বুকে স্টেথস্কোপ লাগিয়ে শোনেন, যকৃৎ টিপে দেখেন। কারেনিন জানতেন না যে তাঁর বন্ধু লিদিয়া ইভানোভনা তাঁর স্বাস্থ্য খারাপ যাচ্ছে দেখে রোগীকে পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তারকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর কাছে যেতে। আমার জন্যে এই কাজটুকু করুন’, বলেছিলেন কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা।
ডাক্তার জবাব দিয়েছিলেন, ‘এটা আমি করব রাশিয়ার জন্যে, কাউন্টেস।’
কাউন্টেস বলেছিলেন, ‘অমূল্য মানুষ!’
কারেনিনকে পরীক্ষা করে ডাক্তার খুবই অসন্তুষ্ট হলেন। দেখলেন তাঁর যকৃৎ অনেক বেড়েছে, কমে গেছে পুষ্টি, কোন ফল হয়নি খনিজ জলে।তিনি বরাত করলেন যথাসম্ভব শারীরিক গতিবিধি বাড়িয়ে যথাসম্ভব মানসিক চাপ কমাতে, প্রধান কথা কোনরকম দুশ্চিন্তা চলবে না, যা কারেনিনের কাছে নিঃশ্বাস না নেওয়ার মতই অসম্ভব; চলে গিয়ে ডাক্তার কারেনিনের মনে এমন একটা ধারণা রেখে গেলেন যে তাঁর শরীরে কিছু-একটা গড়বড় হয়েছে যা সারানো যাবে না।
কারেনিনের কাছ থেকে চলে যেতে অলিন্দে ডাক্তারের হয়ে গেল তাঁর সুপরিচিতি, কারেনিনের বাড়ির সরকার স্লিউদিনের সাথে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁরা ছিলেন সহপাঠী, কালেভদ্রে দেখা হলেও তাঁরা ছিলেন বন্ধু এবং পরস্পরের প্রতি সশ্রদ্ধ, সেই কারণে স্লিউদিনকে ছাড়া আর কাউকে ডাক্তার জানাতেন না রোগী সম্পর্কে তাঁর অভিমত।
স্লিউদিন বললেন, ‘আপনি এসেছেন বলে কি যে খুশি হয়েছি। উনি সুস্থ নন, আর আমার মনে হয়…কিন্তু কি হয়েছে?’
‘হয়েছে এই’, স্লিউদিনের মাথার ওপর দিয়ে গাড়ি আনার জন্য কোচোয়ানকে ইঙ্গিত করে ডাক্তার বললেন, তারপর তাঁর সাদা হাতে নরম দস্তানায় আঙুল ঢুকিয়ে যোগ করলেন, হয়েছে এই-একটা তন্তুকে টান না করে ছেঁড়াবার চেষ্টা করে দেখুন-খুবই কঠিন; কিন্তু যথাসাধ্য টানটান করতে পারলে আঙুলের একটা ভারেই তা ছিঁড়ে পড়বে। আর উনি তাঁর পরিশ্রম আর কর্তব্য-বোধ টানটান হয়ে উঠেছেন একেবারে শেষ মাত্রায়। তাছাড়া বাইরের চাপ পড়ছে, খুবই বেশি চাপ’, অর্থব্যঞ্জকভাবে ভুরু তুলে সমাপ্তি টানলেন ডাক্তার, এবং নিয়ে আসা গাড়িটায় উঠতে উঠতে যোগ করলেন, ‘ঘোড়দৌড়ে যাচ্ছেন? হ্যাঁ, হ্যাঁ, অনেক সময় যাবে বৈকি’, স্লিউদিন কি-একটা বলেছিলেন যা তাঁর কানে যায়নি, তার জবাবে বললেন তিনি।
ডাক্তার অনেক সময় নিয়ে চলে যাবার পর এলেন নামকরা পর্যটক আর কারেনিন তাঁর সদ্যপঠিত পুস্তিকা এবং আগের জ্ঞান কাজে লাগিয়ে পর্যটককে বিস্মিত করলেন বিষয়টা সম্পর্কে তাঁর জ্ঞানের গভীরতা ও সুশিক্ষিত দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতায়।
তাঁকে পর্যটকের সাথে সাথেই গুবের্নিয়া-প্রধানের আগমন সংবাদ জানানো হল। তিনি পিটার্সবুর্গে এসেছিলেন এবং তাঁর সাথে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপারগুলো সারতে হল, তারপর একটা গুরুত্বপূর্ণ জরুরি ব্যাপারে যেতে হল জনৈক ব্যক্তির কাছে। ফিরতে পারলেন কেবল তাঁর আহারের সময় বেলা পাঁচটা নাগাদ। সরকারের সাথে আহার সেরে তিনি তাঁকে আমন্ত্রণ করলেন তাঁর সাথে একত্রে পল্লীভবনে এবং পরে ঘোড়দৌড়ে যেতে।
ব্যাপারটা সম্পর্কে সজ্ঞান না থেকেই স্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎকালে এখন কোন তৃতীয় ব্যক্তি যাতে উপস্থিত থাকে তিনি তার প্রয়োজন বোধ করছিলেন।
সাতাশ
আন্না ওপরতলায় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আনুশ্কার সাহায্যে তাঁর গাউনে শেষ ফিতে আঁটছিলেন। এমন সময় সদরের কাছে নুড়ি মাড়িয়ে যাওয়া চাকার শব্দ শুনতে পেলেন। ভাবলেন, বেত্সির তো এত তাড়াতাড়ি আসার কথা নয়।’ জানালা দিয়ে দেখতে পেলেন একটা গাড়ি আর তা থেকে বেরিয়ে আছে একটা কালো টুপি আর কারেনিনের অতি পরিচিত কান। ভাবলেন, ‘দ্যাখো কাণ্ড, কি অসময়ে আসা; রাতে থাকবে নাকি?’ এবং তার ফলে যা ঘটতে পারে সেটা তাঁর কাছে এতই সাংঘাতিক আর ভয়ংকর মনে হল যে মুহূর্তের জন্যও কিছু না ভেবে হাসিখুশি উজ্জ্বল মুখে এগিয়ে গেলেন তাঁর দিকে। মিথ্যাও প্রবঞ্চনার যে ঝোঁক তাঁর পরিচিত নিজের মধ্যে তার উপস্থিতি টের পেয়ে আত্মসমর্পণ করলেন সেই ঝোঁকে, কথা বলতে শুরু করলেন কি বলছেন নিজেই তা না জেনে।
