মেয়েদের মঞ্চের দিকে তাঁর দৃষ্টিপাত থেকে আন্না বুঝেছিলেন যে উকি ওঁকে খুঁজছেন (তিনি সোজা আন্নার দিকেই তাকিয়েছিলেন, কিন্তু মসলিন, রিবন, পালক ছাতা আর ফুলের ভিড়ে তাঁকে চিনতে পারেননি), আন্নাও ইচ্ছে করেই তাঁকে দেখতে না পাওয়ার ভান করলেন।
প্রিন্সেস বেত্সি তাঁর উদ্দেশে চেঁচিয়ে উঠলেন, ‘কারেনিন! আপনি নিশ্চয় স্ত্রীকে দেখতে পাচ্ছেন না; এই যে এখানে!’
কারেনিন তাঁর নিষ্প্রাণ হাসি হাসলেন।
‘এখানে এমন চাকচিক্য যে চোখ ধাঁধিয়ে যায়’, এই বলে তিনি এলেন মঞ্চে। স্ত্রীর উদ্দেশে হাসলেন তিনি, সদ্য সাক্ষাতের পর আবার স্ত্রীকে দেখে যেভাবে স্বামীর হাসা উচিত, প্রিন্সেস এবং অন্যান্য পরিচিতিদের সম্ভাষণ জানালেন, প্রত্যেককেই দিলেন তাদের উচিতমত প্রাপ্য, অর্থাৎ রহস্য করলেন মহিলাদের সাথে আর মাথা নোয়ালেন পুরুষদের উদ্দেশে। নিচে মঞ্চের কাছে দাঁড়িয়ে ছিলেন কারেনিনের কাছে সম্মানীয়, মনীষা ও শিক্ষাদীক্ষায় সুখ্যাত এক জেনারেল- অ্যাডজুট্যান্ট। কারেনিন কথা বলতে লাগলেন তাঁর সাথে।
দৌড়ের মাঝখানে তখন বিরতি, তাই আলাপে বাধা পড়ার মত কিছু ছিল না। জেনারেল-অ্যাডজুট্যান্ট ঘোড়দৌড়ের নিন্দা করছিলেন, তাতে আপত্তি করে কারেনিন দাঁড়ালেন তার সমর্থনে। আন্না তাঁর একটা কথাও বাদ না দিয়ে শুনছিলেন তাঁর মিহি সমতাল কণ্ঠস্বর আর তাঁর প্রতিটি কথাই তাঁর মনে হচ্ছিল মিথ্যা, কানে বিঁধছিল যন্ত্রণা দিয়ে।
যখন চার ভার্স্টের হার্ডল রেস শুরু হয়, তখন আন্না সামনে ঝুঁকে পড়ে চোখ না সরিয়ে দেখছিলেন যে অনস্কি ঘোড়র কাছে এসে তাতে চাপছেন আর সেই সাথে শুনছিলেন স্বামীর এই অবিশ্রাম বিরক্তিকর কণ্ঠস্বর। ভ্রন্স্কির জন্য আশংকায় কষ্ট হচ্ছিল তাঁর, কিন্তু আরো বেশি কষ্ট হচ্ছিল কথার পরিচিত টানা সমেত স্বামীর মিহি গলায় যা কখনো থামবে না বলে মনে হচ্ছিল তাঁর।
আন্না ভাবছিলেন, ‘আমি একটা খারাপ মেয়ে, নষ্টা মেয়ে। কিন্তু মিথ্যে বলতে আমার ভালো লাগে না, সইতে পারি না মিথ্যে, কিন্তু ওর (স্বামীর) খোরাক এই মিথ্যেই। সব ও জানে, সব দেখতে পাচ্ছে; অথচ অমন শান্তভাবে কথা বলতে যখন ও পারছে তখন কি তার অনুভূতির দাম? যদি খুন করত আমাকে, খুন করত ভ্রন্স্কিকে, তাহলে বরং সম্মান করতাম ওকে। কিন্তু না, ওর দরকার কেবল মিথ্যা আর শোভনতা’, নিজেকে বোঝাচ্ছিলেন আন্না, কিন্তু ভাবছিলেন না ঠিক কি তিনি চান স্বামীর কাছ থেকে, ঠিক কি বেহারায় তাঁকে দেখতে চান। তিনি বুঝতে পারছিলেন না যে স্বামীর এখনকার অতি বিরক্তিকর এই বাগবাহুল্য তাঁর অন্তরের উদ্বেগ ও অস্থিরতার প্রকাশ মাত্র। চোট খাওয়া শিশু যেভাবে লাফালাফি করে পেশীর সঞ্চালনে বেদনা চাপা দিতে চায়, তেমনি কারেনিনের কাছেও প্রয়োজন ছিল মানসের সঞ্চালন, যা তাঁর স্ত্রীর উপস্থিতিতে, ভ্রন্স্কির উপস্থিতি, ক্রমাগত তাঁর নামের উল্লেখ স্ত্রীর সম্পর্কে যে ভাবনা জাগত তা চাপা দেবার জন্য। শিশু যেমন স্বাভাবিকভাবেই লাফালাফি করে, ভালো করে বুদ্ধিমানের মত কথা বলাও ছিল তাঁর পক্ষে তেমনি স্বাভাবিক। তিনি বলছিলেন : সৈন্যদের, ঘোড়সওয়ার অফিসারদের দৌড়ের একটা আবশ্যিক শর্তই হল বিপদের ঝুঁকি। ইংলন্ড যে সামরিক ইতহাসে অশ্বারোহী বাহিনীর চমৎকার কৃতিত্ব দেখাতে পেরেছে, তার কারণ পশু ও মানুষের এই শক্তিটা সে বাড়িয়ে তুলেছে ঐতিহাসিক দিক দিয়ে।আমার মতে, ক্রীড়ার গুরুত্ব প্রভূত, অথচ বরাবরের মত, আমরা দেখি কেবল ওপরটুক।’
প্রিন্সেস ভেস্কায়া বললেন, ‘ওপরটুকু নয়। শুনছি একজন অফিসার তার পাঁজরার দুটো হাড়ই ভেঙেছে। কারেনিন তাঁর নিজস্ব হাসি হাসলেন যাতে তাঁর দাঁত ছাড়া আর কিছুই প্রকাশ পেল না।
বললেন, ‘মানছি প্রিন্সেস, এটা ওপরকার নয়, ভেতরকার ব্যাপার, কিন্তু সেটা কোন কথা নয়।’ এবং আবার তিনি ফিরলেন জেনারেলের দিকে যার সাথে কথা বলছিলেন গুরুত্ব সহকারে। ভুলবেন না যে দৌড়াতে নেমেছে সামরিক লোকেরা, যারা এই কাজটা বেছে নিয়েছে এবং নিশ্চয় স্বীকার করবেন যে প্রত্যেক কাজেরই আছে পদকের উলটো পিঠ। এটা আসে সরাসরি সামরিক কর্তব্যের মধ্যে। ঘুসোঘুসি অথবা স্পেনের তরিয়াদরদের কদর্য খেলাগুলো বর্বরতার লক্ষণ। কিন্তু বিশেষীকৃত ক্রীড়া, সেটা লক্ষণ বিকাশের।’
‘না, দ্বিতীয়বার আমি আর আসব না এখানে; বড় ব্যাকুল লাগে’, বললেন প্রিন্সেস বেত্সি, ‘তাই না আন্না?’
‘তা লাগে, তবে চোখ ফেরানো যায় না’, বললেন অন্য এক মহিলা, ‘আমি যদি হতাম রোমের মেয়ে, তাহলে কোন মল্লভূমিতেই হাজির হতে আমি ছাড়তাম না।
আন্না কিছুই বললেন না, দূরবীন না নামিয়ে তাকিয়ে ছিলেন কেবল একটা জায়গাতেই।
এ সময় দীর্ঘকায় এক জেনারেল মণ্ডপ দিয়ে যাচ্ছিলেন। আলাপ থামিয়ে কারেনিন তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়িয়ে তবে মর্যাদা নিয়েই নিচু হয়ে তাঁকে অভিবাদন করলেন।
জেনারেল ঠাট্টা করে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনি দৌড়াচ্ছেন না?
‘আমার দৌড় আরো কঠিন কাজ’, সসম্ভ্রমে জবাব দিলেন কারেনিন।
এবং যদিও জবাবটার বিশেষ কোন মানে হয় না, তাইলেও জেনারেল এমন ভাব করলেন যেন বুদ্ধিমান লোকের কাছ থেকে একটা বুদ্ধিমান উক্তি শোনা গেল এবং পুরোপুরি বুঝছেন তার মজা কিসে।
