ইয়াভিন টুপিটা তুলে নিয়ে তাঁর সঙ্গ ধরলেন, তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দিলেন। আধ ঘণ্টা বাদে ভ্রন্স্কি প্রকৃতিস্থ হলেন, কিন্তু এ দৌড়ের স্মৃতি অনেক-অনেক দিন তাঁর মর্মে জীবনের সবচেয়ে দুঃসহ যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি হয়ে ছিল।
ছাব্বিশ
কারেনিনের স্ত্রীর সাথে বাইরের সম্পর্ক আগের মতই ছিল। শুধু একমাত্র পার্থক্য হল এই যে, তিনি কাজে ব্যস্ত থাকতে লাগলেন আগের চেয়ে বেশি। আগের বছরগুলোর মতই বসন্ত শুরু হতেই তিনি হাওয়া বদলাতে বিদেশে যান শীতকালের পরিশ্রমে প্রতি বছর ভেঙে পড়া স্বাস্থ্য ফেরাবার জন্য এবং বরাবরের মত জুলাই মাসে ফিরে বর্ধিত কর্মোদ্যোগে কাজে লেগে যান। বরারের মত স্ত্রী উঠে এসেছিলেন পল্লীভবনে আর তিনি থেকে যান পিটার্সবার্গে।
প্রিন্সেস ভেস্কায়ার ওখানে সেই সন্ধ্যার পরে যে কথাবার্তা হয়েছিল তার পরে তিনি আন্নার কাছে নিজের সন্দেহ আর ঈর্ষার কোন প্রসঙ্গ তোলেননি। কারো একটা বর্ণনা দেবার সময় যে সুরে তিনি কথা বলতেন সেটা তাঁর স্ত্রীর প্রতি তাঁর বর্তমান সম্পর্কের সাথে এত খাপ খায়নি আর কখনো। স্ত্রীর প্রতি কিছুটা নিরুত্তাপ হয়ে ওঠেন তিনি। প্ৰথম যে নৈশ আলাপটা আন্না অগ্রাহ্য করেন তার জন্য আন্নার প্রতি তাঁর সম্পর্কে বিরক্তির আভাস থাকত, কিন্তু তার বেশি কিছু নয়। ‘তুমি আমার সাথে বোঝাবুঝি করে নিতে চাওনি’, তিনি যেন মনে মনে বলতেন আন্নাকে, ‘সেটা তোমার পক্ষেই খারাপ। এবার তুমি আমাকে অনুরোধ করবে, আর আমি কিছুই বোঝাতে যাব না। সেটা তোমার পক্ষেই খারাপ’, তিনি মনে মনে কথা বলতেন সেই মানুষের মত, যে আগুন নেভাবার বৃথা চেষ্টা করেছে এবং নিজের ব্যর্থতায় রেগে উঠে বলতে পারত ‘চুলোয় যা! পড়ে মর এর জন্যে।’
রাজকর্মের ব্যাপারে বুদ্ধিমান ও সূক্ষ্মদর্শী এই লোকটা স্ত্রীর প্রতি এরূপ মনোভাবের নির্বুদ্ধিতা বুঝতেন না। বুঝতেন না কারণ নিজের সত্যিকার অবস্থা বুঝতে যাওয়া তাঁর পক্ষে ছিল বড় বেশি ভয়াবহ, তাই মনের মধ্যে যে বাক্সটায় পরিবারের প্রতি, অর্থাৎ স্ত্রী ও ছেলের প্রতি তাঁর হৃদয়াবেগগুলো থাকত সেটা তিনি বন্ধ করে তালা এঁটে সীল মেরে রেখেছিলেন। মনোযোগী পিতা তিনি, শীতের শেষ তিনি সবিশেষ নিরুত্তাপ হয়ে ওঠেন ছেলের প্রতি, স্ত্রীর মত ছেলের ক্ষেত্রেও তিনি একই ঠাট্টার সুর তিনে। ‘আর, যুবাপুরুষ যে!’ ছেলেকে সম্বোধন করতেন তিনি।
কারেনিন মনে করতেন এবং বলতেন যে এবারের মত আর কোন বছরে কাজের এত চাপ তাঁর কখনো হয়নি; কিন্তু সচেতন ছিলেন না যে কাগজগুলো তিনি নিজেই ভেবে বের করছেন আর যে বাক্সটায় থাকত স্ত্রীর এবং ছেলের প্রতি হৃদয়ানুভূতি, তাদের নিয়ে ভাবনা, সেটা না খোলার একটা উপায় এটা, আর যতদিন তা বাক্সে বন্ধ থাকছে ততই ভয়াবহ হয়ে উঠছে সেগুলো। স্ত্রীর আচরণ সম্পর্কে কি তিনি ভাবছেন এ কথা জিজ্ঞেস করার অধিকার যদি কারো থাকত, তাহলে নিরীহ, নম্র কারেনিন কোন জবাব দিতেন না নিশ্চয়, কিন্তু যে লোক এ কথা জিজ্ঞেস করেছে তার ওপর তিনি ভয়ানক চটে উঠতেন। এজন্যই ওঁর স্ত্রীর স্বাস্থ্য কেমন আছে কেই জিজ্ঞেস করল, কারেনিনের মুখে ফুটে উঠত একটা গর্ব আর কঠোরতার ভাব। স্ত্রীর আচরণ ও হৃদয়াবেগ নিয়ে ভাবতে চাইতেন না তিনি এবং সত্যি সত্যিই ভাবতেন না কারেনিনের স্থায়ী পল্লীভবন ছিল পিটার্সহফে, কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা সাধারণত গ্রীষ্মটা কাটাতেন সেখানেই, আন্নার প্রতিবেশী হিসেবে তাঁর সাথে অবিরাম যোগাযোগ রেখে। এ বছর কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভনা পিটার্সহফে থাকতে চাননি, একবারেও আসেননি আন্না আর্কাদিয়েভনার কাছে, বেত্সি আর ভ্রন্স্কির সাথে আন্নার অন্তরঙ্গতা যে অস্বস্তিকর, কারেনিনের কাছে এ ইঙ্গিত তিনি করেছেন একাধিকবার। কারেনিন তাঁকে রূঢ়ভাবে থামিয়ে দিয়েছেন এই বলে যে, তাঁর স্ত্রী সন্দেহের ঊর্ধ্বে এবং সেই থেকে কাউন্টেস লিদিয়া ইভানোভেনাকে তিনি এড়িয়ে চলছেন। তিনি দেখতে চাইতেন না এবং দেখতেন না যে অনেক লোকেই তাঁর স্ত্রীর দিকে চাইছি বাঁকা চোখে, বুঝতে চাইতেন না এবং বুঝতেন না কেন তাঁর স্ত্রী জারস্কোয়ে সেলোতে উঠে যাবার জন্য পীড়াপীড়ি করছেন যেখানে থাকতেন বেত্সি ভ্রন্স্কির রেজিমেন্ট ছাইনি পেতেছে যেখানে থেকে দূরে নয়। এ নিয়ে নিজেকে ভাবতে তিনি দিতেন না এবং ভাবতেন না; কিন্তু সেই সাথে নিজেকে এ কথা কখনো না বলে এবং কোন প্রমাণ শুধু নয়, সন্দেহের কোন কারণ না পেয়েও তিনি অন্তরের গভীরে গভীরে নিশ্চিত জানতেন যে তিনি প্রতারিত স্বামী, আর সে জন্য গভীর দুর্ভাগ্য বোধ করতেন।
স্ত্রীর সাথে আট বছরের সুখী জীবনে অন্যের বিশ্বাসঘাতিনী স্ত্রী আর প্রবঞ্চিত স্বামীর দিকে তাকিয়ে কতবার না তিনি মনে মনে ভেবেছেন : ‘কি করে এটা ওরা হতে দিচ্ছে? এই বিশ্রী অবস্থাটা থেকে বেরিয়ে আসছে না কেন?’ কিন্তু এখন, বিপদ যখন ভেঙ্গে পড়েছে তাঁরই মাথায়, তখন এই বিশ্রী অবস্থাটা ঢুকিয়ে তিনি জানতেও চাইলেন না। চাইলেন না—কারণ সেটা বড় বেশি ভয়ংকর, বড় বেশি অস্বাভাবিক।
বিদেশ থেকে ফিরে কারেনিন তাঁর পল্লীভবনে গেছেন দু’বার। একবার সেখানে দিবাহার সারেন, দ্বিতীয়বার সন্ধ্যা কাটান নিমন্ত্রিতদের সাথে। কিন্তু কোনবারই রাত কাটাননি, যা করেছেন আগের বছরগুলোয়।
