পরবর্তী দুটো বাধা, খাল আর ব্যারিয়ার পেরোনো গেল সহজেই, কিন্তু ভ্রন্স্কির কানে আসতে লাগল ক্রমেই কাছিয়ে-আসা খুব আর নিঃশ্বাসের শব্দ। তিনি ঘোড়াকে তাগিদ দিলেন, এবং এটা টের পেয়ে খুশি হলেন যে ফ্লু-ফ্রু অনায়াসে গতি বাড়িয়ে চলেছে, গ্লাদিয়াতরের খুরের শব্দ শোনা যেতে লাগল আবার সেই আগের দূরত্ব থেকে।
যেভাবে এগিয়ে যেতে চেয়েছিলেন ভ্রন্স্কি এবং কর্ড যা পরামর্শ দিয়েছিল সেভাবেই এগিয়ে গেছেন তিনি; এখন তিনি সাফল্যে নিশ্চিত। তাঁর উত্তেজনা, আনন্দ ফ্লু-ফ্লু’র জন্য মমতা সবই বেড়ে উঠল। পেছনে একবার তাকিয়ে দেখার ইচ্ছে হয়েছিল তাঁর, কিন্তু সাহস পেলেন না, চেষ্টা করলেন নিজেকে শান্ত রাখতে, ঘোড়াকে তাড়া না দিতে, যাতে গ্লাদিয়াতরের মধ্যে যতটা শক্তির সঞ্চয় আছে বলে তিনি টের পাচ্ছিলেন ততটা শক্তিই যেন ফ্লু-ফ্রু’ওর থাকে। বাকি আছে কেবল একটা, সবচেয়ে কঠিন বাধা; সেটা যদি তিনি অতিক্রম করতে পারেন অন্যদের চেয়ে আগে, তাহলে তিনিই হবেন প্রথম। ঘোড়া তিনি ছোটালেন আইরিশ ব্যারিকেডের দিকে। ফ্লু-ফ্র’র সাথে দূর থেকেই ব্যারিকেড়টা দেখতে পেয়েছিলেন তিনি, দেখা দিল তাঁর ও ঘোড়ার মুহূর্তের সন্দেহ। ঘোড়ার কানে অনিশ্চিতি চোখে পড়ল তাঁর, চাবুকও উঠিয়েছিলেন, কিন্তু সাথে সাথেই অনুভব করলেন যে সন্দেহ ভিত্তিহীন; ঘোড়া জানে কি তার করা উচিত শরীর টানটান করে সে ভ্রনস্কি যা আশা করেছিলেন ঠিক তেমনি মাত্রা রেখে যথাযথভাবে লাফ দিল আর শূন্যে উঠে গা ছেড়ে দিল জাড্যের শক্তিতে যা তাকে উড়িয়ে নিয়ে গেল খাল ছাড়িয়ে অনেক দূরে; আর ঠিক একই তালে বিনা চেষ্টায় একই পায়ে ফ্লু-ফু চালিয়ে গেল তার দৌড়।
‘সাবাস ভ্রন্স্কি!’ একদল লোকের চিৎকার কানে এল তাঁর। তিনি জানতেন এরা তাঁর রেজিমেন্টের লোক এবং বন্ধু-বান্ধব, দাঁড়িয়ে ছিল এই প্রতিবন্ধকটার কাছে; ইয়াভিনের গলা ঠাহর করতে তাঁর ভুল হবার কথা নয়। তবে দেখতে পেলেন না তাঁকে।
‘আরে আমার লক্ষ্মীটি!’ ফ্লু-ফ্রু’কে বললেন মনে মনে, পেছন থেকে আসা শব্দের দিকে কান পেতে রেখে। ‘পেরিয়ে এল দেখছি!’ গ্লাদিয়াতরের খুরের শব্দ শুনতে পেয়ে ভাবলেন তিনি। বাকি রইল কেবল দুই আৰ্শিন চওড়া জলভরা শেষ খালটা। ভ্রন্স্কি সেদিকে তাকালেনও না, অনেক ব্যবধানে প্রথম হবার বাসনায় তিনি লাগাম চালাতে লাগলেন বৃত্তাকারে, খুরের তালে তালে ঘোড়ার মাথা উঠিয়ে আর নামিয়ে। তিনি টের পাচ্ছিলেন যে গোড়া ছুটছে তার শেষ শক্তিতে; শুধু তার গ্রীবা আর ঘাড় ভিজে উঠেছে তাই নয়, মাথা আর তীক্ষ্ণ কানেও বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে, নিঃশ্বাস পড়ছে ঘন ঘন, দমকা-মারা। কিন্তু তিনি জানতেন যে এই শেষ শক্তিটা বাকি দু’শ সাজেন দূরত্বের পক্ষে যথেষ্ট। নিজেকে মাটির কাছাকাছি বলে টের পাওয়ায় এবং গতির একটা বিশেষ লঘুতা দেখে ভ্রন্স্কি গেল যেন নজর না করেই। পেরিয়ে গেল যেন পাখির মত উড়ে; কিন্তু ঠিক এই সময়েই ভ্রন্স্কি আতংকে অনুভব করলেন যে ঘোড়ার গতির সাথে তাল রাখতে না পেরে তিনি নিজেই না বুঝে কেমন করে যেন একটা বিছ্ছিরি অমার্জনীয় কাণ্ড করে ফেলেছেন, বসে পড়েছেন জিনে। হঠাৎ অবস্থা ওঁর বদলে গেল, বুঝতে পারলেন ভয়াবহ কিছু-একটা ঘটেছে। কি ঘটেছে সেটা বুঝে উঠতে না উঠতেই পাটকিলে ঘোড়ার সাদা পা ঝলক দিল তাঁর কাছে, মাখোতিন দ্রুত ছুটে গেল তাঁর পাশ দিয়ে। ভ্রন্স্কির একটা পা ঠেকল মাটিতে, ঘোড়া লুটিয়ে পড়ল সেই পায়ের ওপর। পা’টা ছাড়িয়ে নিতে- না-নিতেই ঘোড়া একপাশে কাত হয়ে পড়ল, ঘড়ঘড়ে শব্দ করে উঠে দাঁড়াবার বৃথা চেষ্টায় শীর্ণ ঘর্মাক্ত ঘাড় বাড়িয়ে গুলি-বেঁধা পাখির মত ধড়ফড় করতে লাগল তাঁর পায়ের কাছে। ভ্রন্স্কির আনাড়ি কাণ্ডটায় ঘোড়ার পিঠ ভেঙে গিয়েছিল। কিন্তু সেটা তিনি বুঝতে পেরেছিলেন অনেক পরে। এখন তিনি শুধু দেখলেন মাখোতিন দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে আর কর্দমাক্ত অটল মাটির ওপর দাঁড়িয়ে তিনি টলছে, ভয়ানক হাঁপাতে হাঁপাতে তাঁর সামনে পড়ে আছে ফ্লু-ফ্লু, তাঁর দিকে ঘাড় বেঁকিয়ে তার অপরূপ চোখে তাকিয়ে দেখছে সে। কি ঘটেছে সেটা তখনো না বুঝে ভ্রন্স্কি টানাটানি করতে লাগলেন ঘোড়ার লাগাম। আবার ঘোড়া মাছের মত ছটফট করে, জিন ক্যাচকেঁচিয়ে সামনের দু’পা বাড়িয়ে উঠতে চেষ্টা করল, কিন্তু পাছা তুলতে পারল না, সাথে সাথেই লুটিয়ে পড়ল কাত হয়ে, ভ্রন্স্কির মুখ রিপুবেগে বিকৃত, বিবর্ণ, নিম্ন চিবুক কম্পমান, তাঁর জুতোর হিল দিয়ে তিনি লাথি মারলেন তার পেটে, আবার টানতে লাগলেন লাগাম। কিন্তু ঘোড়া নড়ল না, পশ্চাদ্দেশ মাটিতে গুঁজে সে তার মুখের দৃষ্টিতে চাইল প্রভুর দিকে।
‘আ-আ-আ!’ মাথা চেপে ধরে গড়িয়ে উঠলেন ভ্রন্স্কি, ‘আ-আ-আ! কি আমি করলাম!’ চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি, ‘দৌড়েও হেরে গেলাম! সবই আমার দোষ, কলঙ্কজনক, অমার্জনীয়! আর হতভাগ্য সুন্দর ঘোড়াটাও ধ্বংস হয়ে গেল! আ-আ-আ! আমি কি করলাম!’
লোকে—ডাক্তার, তার সহকারী, রেজিমেন্টের অফিসাররা ছুটে গেল তাঁর কাছে। সখেদে তিনি অনুভব করলেন যে তিনি অক্ষত, নিরাপদ। ঘোড়ার পিঠ ভেঙেছে, সিদ্ধান্ত হল তাকে গুলি করে মারা হোক। কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলেন না ভ্রন্স্কি, কথা বলতে পারলেন না কারো সাথে। ঘুরে দাঁড়িয়ে মাথা থেকে খসে পড়া টুপিটা না তুলেই তিনি ঘোড়দৌড়ের মাঠ ছেড়ে চললেন—নিজেই জানেন না কোথায়। নিজেকে হতভাগ্য বোধ হচ্ছিল তাঁর। জীবনে এই প্রথমবার এত গুরুতর দুর্ভাগ্য তাঁর ঘটল, সে দুর্ভাগ্য অপূরণীয় আর তার জন্য তিনি নিজেই দোষী।
