বার তিনেক সওয়াররা লাইন দিল, কিন্তু প্রতিবারই কারো না কারো ঘোড়া এগিয়ে যায়, সুতরাং আবার শুরু করতে হয় গোড়া থেকে। দৌড় শুরুর ব্যাপারে সমঝদার কর্নেল সেস্ক্রিন চটে উঠতে যাচ্ছিলেন, তবে শেষ পর্যন্ত চতুর্থবারের বার হাঁক দিলেন : ‘ছুট!’ ছুটল সওয়াররা।
সওয়াররা যখন লাইন দিচ্ছিল, সমস্ত চোখ, সমস্ত দূরবীন ছিল তাদের চিত্রবিচিত্র দলটার দিকে নিবদ্ধ। প্রতীক্ষার স্তব্ধতার পর এবার চারদিক থেকে শোনা গেল, ‘শুরু হয়েছে। দৌড়াচ্ছে।’
ভালো করে দেখার জন্য লোকে একা একা বা জোট বেঁধে ছোটাছুটি লাগার এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় প্রথম মুহূর্ত থেকেই সওয়ারীদের দলটা লম্বা হয়ে যায়, বেশ দেখা যাচ্ছিল দুই বা তিনজন করে তারা একের পর এক এসে যাচ্ছে নদীটার কাছে। দর্শকদের মনে হয়েছিল ওরা দৌড় শুরু করেছে একসাথে, কিন্তু সওয়ারদের কাছে এক সেকেন্ডের পার্থক্যই তাৎপর্য ধরে অনেক।
উত্তেজিত এবং বড় বেশি স্নায়ুচঞ্চল ফ্লু-ফু প্রথম মুহূর্তটা ফসকায়, কয়েকটা ঘোড়া স্টার্ট নেয় তার আগে, কিন্তু নদী পর্যন্ত পৌঁছতে পৌঁছতে অনুস্কি লাগামে বাঁধা ঘোড়াটাকে প্রাণপণে আয়ত্তে এনে অনায়াসে ছাড়িয়ে গেলেন তিনি সওয়ারকে, এখন তাঁর সম্মুখে শুধু মাধোতিনের পাটকিলে গ্লাদিয়াতর, ভ্রন্স্কির সামনেই তার পাছাটা নড়ছে সমতালে, অনায়াসে, আর অপরূপা দিয়ানা সবার আগে অর্ধমৃত কুজোভলেভকে নিয়ে ছুটছে।
প্রথম কয়েক মুহূর্ত ভ্রন্স্কির কোন দখল ছিল না, না নিজের ওপর, না ঘোড়ার ওপর। প্রথম প্রতিবন্ধক নদী পর্যন্ত তিনি সামলাতে পারেননি ঘোড়ার গতিবিধি।
গ্লাদিয়াতর আর দিয়ানা নদী পর্যন্ত পৌছায় একসাথে এবং প্রায় একই মুহূর্তে : পলকের মধ্যে তার নদীর ওপর লাফ দিয়ে চলে গেল ওপরে; অলক্ষ্যে ফ্র-ফ্রু যেন উড়ে গেল তাদের পেছনে। কিন্তু ভ্রন্স্কি যখন টের পেলেন যে তিনি শূন্যে; ঠিক সেই মুহূর্তে হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন তাঁর ঘোড়ার ঠিক পায়ের তলেই কুজোড়লেভ, নদীর ওপারে দিয়ানার সাথে মাটিতে লুটাচ্ছে (লাফের পর কুজোভলেভ লাগামে ঢিল দেন, ঘোড়াও ডিগবাজি খায় তাঁকে নিয়ে)। এসব কথা ভ্রন্স্কি বিশদে জানতে পেয়েছিলেন কেবল পরে, তখন কিন্তু তিনি শুধু এটুকু দেখছিলেন যে যেখানে ফু- ফ্রুর নামার কথা সেখানে ঠিক আর পায়ের নিচেই সে মাড়িয়ে দিতে পারে দিয়ানারা পা অথবা মাথা। কিন্তু পড়ন্ত বেড়ালের মত ফ্লু-ফু তার লাফের মধ্যেই পা আর পিঠ বাঁকিয়ে ঘোড়াটাকে এড়িয়ে আগে চলে গেল।
ভ্রন্স্কি মনে মনে ভাবলেন, ‘ওহ্ সোনা আমার!’
ভ্রন্স্কি নদীর পর পুরোপুরি দখলে আনলেন ঘোড়াটাকে এবং তাকে সংযত রেখে স্থির করলেন বড় প্রতিবন্ধকটা পেরোবেন মাখোতিনের পেছন পেছন আর তার পরে যে দু’শ সাজেন দূরত্বে কোন প্রতিবন্ধক নেই সেখানে ওকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করা যাবে।
জার মঞ্চের সামনে ছিল বড় প্রতিবন্ধকটা। সম্রাট, গোটা দরবার, জনতার দৃষ্টি ওঁদের দিক নিবদ্ধ, ভ্রন্স্কি আর এগিয়ে থাকা মাখোতিন যখন শয়তানের (নীরেট দেয়ালটা এই নামেই অভিহিত হত) কাছে আসছিল, তাঁদের দিকে। চারদিক থেকে তাঁর প্রতিদৃষ্টি ভ্রন্স্কি টের পাচ্ছিলেন, কিন্তু নিজের ঘোড়ার কান আর ঘাড়, তাঁর দিকে ধেয়ে আসা জমি, গ্লাদিয়াতরের পশ্চাদ্দেশ আর সাদা ঠ্যাং ছাড়া কিছুই দেখছিলেন না, একই ব্যবধান বজায় রেখে দ্রুত তাল ঠুকে গ্লাদিয়াতর ছুটছে সামনে। কোথাও কিছু ধাক্কা না খেয়ে ছোট্ট লেজটা নেড়ে গ্লাদিয়াতর লাফিয়ে উঠল এবং অন্তর্ধান করল ভ্রন্স্কির দৃষ্টিপথ থেকে
কে যেন বলে উঠল, ‘সাবাস!’
ঠিক সেই মুহূর্তে ভ্রন্স্কির চোখের সামনে, তাঁর সামনেই ঝলক দিল প্রতিবন্ধকের তক্তা। গতি একটুও না বদলিয়ে তাঁর ঘোড়া লাফিয়ে উঠল, পেরিয়ে গেল তক্তা, শুধু পেছনে খট করে উঠল কি যেন। সামনে ছুটন্ত গ্লাদিয়াতর দ্বারা উত্তেজিত হয়ে গোড়াটা প্রতিবন্ধকের সামনে লাফিয়ে উঠেছিল একটু আগেই, তাতে পেছনের খুর ঠুকে গিয়েছিল কিন্তু গতি তার বদলাল না, মুখে একতাল কাদা মেখে ভ্রন্স্কি টের পেলেন যে গ্লাদিয়াতরের কাছ থেকে তিনি সেই একই ব্যবধানে রয়েছেন। আবার তাঁর সামনে দেখতে পেলেন তার পশ্চাদ্দেশ, ছোট লেজ, আবার সেই দ্রুতগতি সাদা পা, যা দূরত্ব বাড়িয়ে তুলতে পারছিল না।
ভ্রন্স্কি যখন ভাবছিলেন এবার মাখোতিনকে ছাড়িয়ে যেতে হয়, ফ্লু-ফ্লুও তখনি ভ্রন্স্কির মনোভাব টের পেয়ে কোনরকম তাগাদা ছাড়াই গতি অনেকটা বাড়িয়ে সবচেয়ে সুবিধানজনক দিক, ভেতরকার দিক থেকে কাছিয়ে আসতে লাগল মাখোতিনের। সে দিকটা মাখোতিন ছাড়ছিল না। বাইরের দিক থেকেও ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব, ভ্রন্স্কি এই কথা ভাবতেই ফ্লু-ফ্লুও অমনি গতি বদলিযে সেভাবেই ছুটতে লাগল। ঘামে কালো হয়ে উঠতে শুরু করা ফ্লু-ফ্রুর ঘাড় সমান হয়ে উঠল গ্লাদিয়াতরের পশ্চাদ্দেশের সাথে। কিছুক্ষণ তারা দৌড়াল পাশাপাশি। কিন্তু যে প্রতিবন্ধকটার কাছে তারা আসছিল তার আগে বাইরের বৃত্ত দিয়ে যাতে না যেতে হয় তার জন্য ভ্রন্ল্কি লাগাম চালাতে লাগলেন এবং দ্রুত, একেবারে ঢিপিটাতেই ছাড়িয়ে গেলেন মাখোতিনকে। কাদা ছিটকে লাগা তার মুখটা শুধু এক ঝলক দেখতে পেলেন তিনি। তাঁর এমন কি এও মনে হল যে, মাখোতিন হাসছে। ওকে তিনি ছাড়িয়ে গেলেন বটে, কিন্তু টের পাচ্ছিলেন ঠিক কাছেই তার উপস্থিতি, অবিরাম শুনতে পাচ্ছিলেন পেছনে সমতাল খুরের শব্দ আর গ্লাদিয়াতরের নাসারন্ধ্র থেকে দমকা-মারা তাজা নিঃশ্বাস।
