ঘর্মাক্ত, দৌড়ের পর ক্লান্ত ঘোড়াগুলোকে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সহিসেরা। আসন্ন দৌড়ের জন্য দেখা দিতে থাকল একের পর এক নতুন নতুন তাজা ঘোড়া। বেশির ভাগই বিলাতি, সাজ পরানো, এঁটে বাঁধা পেট, দেখাচ্ছিল বিরাট বিরাট অদ্ভূত কি-সব পাখির মত। ডান দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল টানটান সুঠাম শরীরের সুন্দর ফ্র-ফ্লু’কে, রীতিমত লম্বা স্থিতিস্থাপক টেংরিতে ভর দিয়ে সে পা ফেলছিল স্প্রিঙের মত। তার অদূরে দীর্ঘকর্ণ গ্লাদিয়াতরের চাদর খোলা হচ্ছিল। অজ্ঞাসতারেই ভ্রন্স্কি তাকিয়ে রইলেন সুন্দর সুগঠিত ঘোড়াটার দিকে, চমৎকার তার পাছা, খাটো টেংরি একেবারে খুরের ওপর বসানো। ভ্রন্স্কি নিজের ঘোড়ার কাছে যাবেন ভাবছিলেন, কিন্তু আবার তাঁকে আটকালেন একজন পরিচিত।
আলাপ জমিয়ে পরিচিতটি বলল, ‘ওই যে কারেনিন! বৌকে খুঁজছে, সে ওদিকে মঞ্চের মাঝখানে। আপনি দেখেননি ওকে?’
‘না, দেখিনি’, ভ্রন্স্কি বললেন এবং পরিচিতটি মঞ্চের যেখানে কারেনিনাকে দেখাচ্ছিলেন সেদিকে দৃকপাতও না করে গেলেন নিজের ঘোড়ার কাছে।
ঘোড়ার জিন নিয়ে কিছু নির্দেশ তাঁর দেবার ছিল, কিন্তু সেটা ভালো করে দেখতে-না-দেখতেই মঞ্চে সওয়ারীদের ডাক পড়ল নম্বর টেনে নিজের নিজের জায়গায় যেতে। সতেরো জন অফিসার গুরুত্বপূর্ণ, কঠোর অনেক বিবৰ্ণ মুখে মঞ্চে গিয়ে নম্বর টানলেন। ভ্রন্স্কির ভাগে পড়ল সাত। হুকুম শোনা গেল : ‘ওঠো ঘোড়ায়!’
সবার চোখ যেদিকে নিবদ্ধ, তিনি এবং অন্যান্য সওয়ারীরা যে তার কেন্দ্র সে সম্পর্কে সচেতন হয়ে ধীরে, শান্ত পদক্ষেপে তিনি গেলেন তাঁর ঘোড়ার কাছে, উত্তেজিত হলে সাধারণত তিনি একরকমই করেন। ঘোড়দৌড়ের সম্মানে তার পোশাকী কস্টিউম পরেছে কর্ড : বোতাম-আঁটা কালো ফ্রক-কোট, গালে ঠেলে ওঠা কড়া মাড় দেওয়া কলার, গোল কালো টুপি আর জ্যাক বুট। বরাবরের মতই সে ধীর, গুরুগম্ভীর, ঘোড়ার সামনে দাঁড়িয়ে সে নিজের ধরে ছিল তার দুটো লাগামই। ফ্লু-ফ্লু তখনো কেঁপে যাচ্ছিল যেন জ্বর উঠেছে। দীপ্ত চোখে সে কটাক্ষে চাইলে সমাগত ভ্রন্স্কির দিকে। জিনের তলে আঙুল ঢোকালেন ভ্রন্স্কি, ঘোড়াটা আরো চোখ পাকাল, দাঁত বার করল, কান এঁটে রইল তার নিজ বাঁধা পরখ করা হল দেখে হাসি ফোটাবার জন্য ঠোঁটা কুঞ্চিত করল ইংরেজটি।
‘উঠে বসুন, অস্থিরতা বোধ করবেন কম।’
শেষবারের মত ভ্রন্স্কি তাকালেন তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের দিকে। উনি জানতেন যে দৌড়ের সময় তিনি ওদের আর দেখবেন না। যেখান থেকে দৌড় শুরু হবার কথা, দু’জন এর মধ্যেই আগে আগে চলতে শুরু করেছে সেদিকে। ভ্রন্স্কির একজন বিপজ্জনক প্রতিযোগী ও বন্ধু গাৎসিন ঘুরঘুর করছিরেন তাঁর বাদামি ঘোড়াটার কাছে, জিনে তাঁকে উঠতে দিচ্ছিল না সে। আঁটো ব্রিচেস পরা ছোটখাট একজন হুসার জিনের পেছনে ভর দিয়ে ইংরেজ জকিদের কায়দায় বেড়ালের মত ঝুঁকে পড়ে ঘোড়া ছুটিয়ে গেল। প্রিন্স কুজোভলেভ তাঁর গ্রাবভ প্রজনন কেন্দ্রের জাত ঘুড়ির পিঠে বসে ছিলেন বিবর্ণ হয়ে, একজন ইংরেজ তাঁর লাগাম ধরে নিয়ে যাচ্ছিলে। ভ্রন্স্কি এবং তাঁর সমস্ত সাথীরা কুজোলেভকে এবং তাঁর ‘দুর্বল’ স্নায়ু আর সাঙ্ঘাতিক আত্মাভিমানের কথা জানতেন। তাঁরা জানতেন যে সব কিছুতেই উনি ভীত, ভয় পেতেন এমন কি লড় য়ে ঘোড়াতে চাপতে; এখন ব্যাপারটা ভয়াবহ বলে, লোকের হাড়গোড় ভাঙছে আর প্রতিটি হার্ডলের সামনেই ডাক্তার, নার্স সমেত ক্রস টাঙানো হাসপাতাল মার্কা গাড়ি বরাদ্দ আছে বলেই তিনি দৌড়ে যোগ দেবেন ঠিক করলেন। চোখাচোখি হল ওঁদের, সাদরে, সানুমোদনে চোখ মটকালেন ভ্রন্স্কি। শুধু একজনকে তিনি দেখতে পেলেন না, তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, গ্লাদিয়াতরের সওয়ার মাখোতিনকে।
ভ্রন্স্কিকে কর্ড বলল, ‘তাড়াহুড়া করবেন না। শুধু একটা কথা মনে রাখবেন : হার্ডলের সামনে থমকাবেন না, তাড়া দেবেন না, ঘোড়াটা যেমন চায় করতে দিন।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে’, লাগাম নিয়ে ভ্রন্স্কি বললেন।
‘সম্ভব হলে দৌড়ের আগে আগেই ছুটবেন, কিন্তু পেছনে পড়ে গেলেও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হতাশ হবেন না।’ ঘোড়াটা এগোতে-না-এগোতেই ভ্রন্স্কি লঘু বলিষ্ঠ ভঙ্গিতে ইস্পাতের দাঁড়ালো রেকাবে পা দিয়ে অনায়াসে তাঁর পেটাই করা দেহ স্থাপন করলেন চামড়ার ক্যাঁচকেঁচে জিনে। ডানের রেকাবে পা ঢুকিয়ে তিনি তাঁর অভ্যস্ত চালে আঙুলগুলোর মধ্যে সমান করে নিলেন লাগাম দুটো, কর্ডও হাত নামিয়ে নিল। কোন পা-টা আগে ফেলবে তা যেন স্থির করতে না পেরে ফ্লু-ফ্লু তার ঘাড় লম্বা করে টান দিল লাগামে, তারপর তার স্থিতিস্থাপক পিঠের ওপর আরোহীকে দোলাতে দোলাতে এগিয়ে গেল যেন স্প্রিঙের ওপর দিয়ে। তাড়াতাড়ি পা ফেলে কর্ড চলতে লাগল তাঁর পেছনে পেছনে। উত্তেজিত ঘোড়াটা কখনো এপাশ কখনো ওপাশ থেকে লাগামে টান দিয়ে আরোহীকে ঠকাবার চেষ্টা করছিল আর ভ্রনৃস্কি মুখে আওয়াজ করে হাত থাবড়ে তাকে বৃথাই শান্ত করার চেষ্টা করলেন।
বাঁধ দেওয়া নদীটার কাছে গিয়ে যেখান থেকে দৌড় শুরু হবে সেদিকে যাচ্ছিলেন তাঁরা। সওয়ারদের অনেকে আগে, অনেকে পিছনে, হঠাৎ ভ্রনৃস্কি শুনতে পেলেন রাস্তার কাদায় কদমে ছোটা ঘোড়ার শব্দ, মাখোতিন তার সাদা ঠেঙে দীর্ঘকর্ণ গ্লাদিয়াতরে পেরিয়ে গেল তাঁকে। লম্বা লম্বা দাঁত বের করে মাখোতিন হাসল, কিন্তু ভ্রন্স্কি তার দিকে চাইলেন ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে। এমনিতেই মাখোতিনকে তিনি দেখতে পারতেন না, আর এখন তো তাকে নিজের সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী বলেই গণ্য করছেন। ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গিয়ে তাঁর ঘোড়াটাকে উত্তেজিত করল বলে রাগ তাঁর। কদমে ছোটার জন্য বাঁ পা বাড়িয়ে দিয়েছিল ফু-ফু, দু’বার লাফও দিল, কিন্তু লাগামের টানে চটে উঠে ছুটল দুলকি চালে সওয়ারকে ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে কর্ডও ভুরু কুঁচকে প্রায় ভ্রন্স্কির পেছন পেছন ছুটতে লাগল।
আন্না কারেনিনা – ২.২৫
পঁচিশ
সতের জন অফিসার ঘোড়দৌড়ে নামল। দৌড় হওয়ার কথা মঞ্চের সামনে চার ভার্স্ট দীর্ঘ উপবৃত্তে। এতে প্রতিবন্ধক গড়া হয়েছে নয়টি; নদী, ঠিক মঞ্চের সামনে দুই আর্শিন উঁচু নীরেট একটা বড় দেয়াল, শুকনো খাল, পানি ভরা খাল, ঢিপি, আইরিশ ব্যারিকেড (সবচেয়ে কঠিন একটা প্রতিবন্ধক) – খেংরা কাঠি গোঁজা ঢিপি, তার ওপারে ঘোড়ার কাছে অদৃশ্য খাল, ফলে দুই বাঁধা ঘোড়াকে এক লাফে পেরোতে হবে নয় মারা পড়তে হবে; তারপর আরো দুটো পানি ভরা এবং একটা শুকনো খাল, দৌড়ের শেষ মঞ্চের সামনে। তবে শুরুটা বৃত্ত থেকে নয়, সেখান থেকে একশ সাজেন দূরে আর তার মাঝখানেই প্রথম বাঁধা—তিন আর্শিন চওড়া পানিতে ভরা নদী, আরোহীর ইচ্ছেমত তা লাফিয়ে অথবা পানি ভেঙে যাওয়া যাবে।
