ধীরে-সুস্থে পোশাক বদলিয়ে (কখনো তিনি তাড়াহুড়া করতেন না, আত্মসংযম হারাতেন না কখনো), ভ্রন্স্কি হুকুম কররেন ব্যারাকে যেতে। ব্যারাক থেকে তাঁর চোখে পড়ল ঘোড়দৌড়ের মাঠ ঘিরে গাড়ি-ঘোড়া, পদচারী, সৈনিকদের ভিড়, মঞ্চে গিজগিজ করছে লোক। নিশ্চয় দ্বিতীয় দৌড়ে চলছে, কেননা যখন তিনি ব্যারাকে ঢোকেন, তখন হুইসিল শোনা গিয়েছিল। আস্তাবলে যেতে গিয়ে তিনি দেখলেন মাখোতিনের সাদা-মোজা পাটকিলে গ্লাদিয়াতরকে কমলা-নীল আস্তরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ঘোড়দৌড়ের মাঠে, আস্তরের জন্য প্রকাণ্ড দেখাচ্ছিল তার নলীরঙা খাড়া কান।
তিনি সহিসকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কর্ড কোথায়?’
‘আস্তাবলে। জিন চাপাচ্ছে।’
স্টলে খোলা, ফ্রু-ফ্রু’র ওপর নিজ বাঁধা হয়ে গেছে, উপক্রম হচ্ছে তাকে নিয়ে যাবার।
‘দেরি হয়নি?’
‘অল রাইট, অল রাইট, সব ঠিক আছে, ঠিক আছে’, বলল ইংরেজটি, ‘শুধু উত্তেজিত হবেন না।’
ভ্রন্স্কি আরেকবার তাঁর প্রিয়পাত্র, সর্বাঙ্গে কম্পমান অপরূপ ঘোড়াটার দিকে তাকালেন। বহু কষ্টে দৃশ্যটা থেকে চোখ ফিরিয়ে বেরিয়ে এলেন ব্যারাক থেকে। নিজের প্রতি কারো দৃষ্টি আকর্ষণ না করার মত সবচেয়ে অনুকূল মুহূর্তটিতেই তিনি পৌঁছিলেন মঞ্চের কাছে। সবে শেষ হচ্ছে দুই ভার্স্ট দৌড়, সবার দৃষ্টি সামনের হর্স গার্ড আর পেছনের হুসারের দিকে নিবদ্ধ, প্রাণপণে তারা ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে সমাপ্তি পোস্টের দিকে। বৃত্তের মাঝখানে আর বাইরেকার সমস্ত লোক ভিড় করেছে পোস্টের কাছে, একদল হর্স গার্ড সৈন্য ও অফিসার নিজেদের সাথী ও অফিসারের প্রত্যাশিত বিজয়ে উল্লাস প্রকাশ করছে উচ্চকণ্ঠে চিৎকার করে। ভ্রন্স্কি অলক্ষ্যে ভিড়টার মাঝখানে ঢুকলেন ঠিক যখন দৌড়ে শেষ হবার ঘণ্টা পড়ল। আর অগ্রবর্তী কাদা-মাখা দীর্ঘাঙ্গ হর্স গার্ড জিনে গা ছেড়ে দিয়ে বসে ঢিল দিল তার ধূসর, ঘামে কালচে হয়ে ওঠা প্রচণ্ড হাঁসফাঁস করা ঘোড়াটার লাগামে।
কষ্টে ঠ্যাং চেপে ঘোড়াটা তার বিশাল দেহটার দ্রুতগতি কমিয়ে আনল আর হর্স গার্ড অফিসার গভীর ঘুম থেকে জেগে ওঠা মানুষের মত চারদিকে তাকিয়ে দেখে জোর করে হাসল। নিজেদের দলের এবং বাইরের জনতা ছেঁকে ধরল তাকে।
উচ্চ সমাজের যে নির্বাচিত দলটা মঞ্চের সামনে সংযতভাবে এবং অবাধে ঘোরাফেরা করছিল আর আলাপ চালাচ্ছিল নিজেদের মধ্যে, তাদের ইচ্ছে করে এড়িয়ে গেলেন ভ্রন্স্কি। তিনি জানতে পেলেন যে কারেনিনা, বেত্সি এবং তাঁর ভাবী আছে সেখানে, তবে চিত্ত বিক্ষিপ্ত হতে না দেবার জন্য মতলব করেই সেদিকে গেলেন না। কিন্তু অনবরত তাঁর দেখা হচ্ছে পরিচিতদের সাথে আর যে দৌড়গুলো হয়ে গেল তার বিশদ বিবরণ দিচ্ছিল তারা, জিজ্ঞেস করছিল কেন তাঁর দেরি হল।
পুরস্কার নেবার জন্য যখন অশ্বারোহীদের ডাক পড়ল মঞ্চে এবং সবাই তাকাল সেদিকে, ভ্রন্স্কির ভাই আলেক্সান্দর এলেন তাঁর কাছে। ইনি কর্নেল, কাঁধপট্টিতে গিঁট, মাথায় উঁচু নন, আলেক্সেইয়ের মতই গাঁটাগোট্টা, তবে আরো সুপুরুষ লালচে গাল, রাঙা নাক, খোলামেলা নেশাতুর মুখমণ্ডল।
‘আমার চিরকুট পেয়েছিস? তোকে যে ধরাই যায় না কখনো।
আলেক্সান্দর ভ্রন্স্কি লম্পট, বিশেষ করে মদ্যপ জীবনযাত্রার জন্য নামকরা, তাহলে খুবই দরবারী চালের লোক এখন ভাইয়ের সাথে তাঁর পক্ষে খুবই অপ্রীতিকর একটা বিষয় নিয়ে কথা বলার সময় অনেকের দৃষ্টি তাঁদের দিকে নিবদ্ধ থাকতে পারে জানা থাকায় তিনি হাসি-হাসি মুখ করলেন, যেন তুচ্ছ কোন ব্যাপার নিয়ে ঠাট্টা-তামাসা করছেন ভাইয়ের সাথে।
আলেকসেই বললেন, ‘পেয়েছি, কিন্তু সত্যি বুঝতে পারছি না কি নিয়ে তোমার মাথা ব্যথা।
‘এজন্যে যে আমি জানতে পেরেছি যে তুই এখানে নেই, সোমবার তোকে দেখা গেছে পিটার্সহফে ‘
‘এমন কিছু ব্যাপার আছে যা শুধু তাদের মধ্যেই আলোচ্য যারা তার সাথে সোজাসুজি জড়িত। আর তুমি যা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছ সেটা এই ধরনেরই ব্যাপার।’
‘তাহলে ফৌজে কাজ করা তোর চলে না এবং… ‘
‘আমি তোমাকে মিনতি করছি, মাথা গলাতে এসো না, ব্যস।’
আলেক্সেই ভ্রন্স্কির ভ্রূকুঞ্চিত মুখ বিবর্ণ হয়ে উঠল, কেঁপে উঠল নিচের প্রকটিত চিবুক যা তাঁর ঘটে কদাচিত। খুবই ভালো মনের লোক হওয়ায় তিনি কমই চটে উঠতেন, কিন্তু একবার যদি চটেন আর থুতনি যদি কেঁপে ওঠে তাহলে তখন খুবই বিপজ্জনক লোক তিনি। আলেক্সান্দর ভ্রন্স্কি সেটা জানতেন, তাই তিনি ফুর্তির ভাব করে হেসে উঠলেন।
‘আমি শুধু মায়ের চিঠি দিতে এসেছিলাম তোকে। জবাব দিস, দৌড়ের আগে মেজাজ বিগড়াস না আবার। সাফল্য কামনা করি’, কথাটা যোগ করে হেসে ভাইয়ের কাছ থেকে তিনি চলে গেলেন।
কিন্তু তাঁর পরে আবার প্রিয় সম্ভাষণ ভ্রন্স্কির থামাল।
‘বন্ধুকে চিনতে চাচ্ছিস না যে। সুপ্রভাত, mon cher!’ বললেন অব্লোন্স্কি। এখানে, এই পিটার্সবুর্গী দীপ্তির মধ্যেও তিনি তাঁর রাঙা মুখ আর পরিপাটী করে আঁচড়ানো চেকনাই গালপাট্টায় ঝিলিক দিচ্ছিলেন মস্কোর চেয়ে কম নয়। ‘এসেছি কাল, তোমার জয় দেখা যাবে বলে আনন্দ হচ্ছে। কবে দেখা হবে?’
‘কাল মেসে এসো’, বল ভ্রন্স্কি তাঁর ওভারকোটের আস্তিন চাপ দিয়ে মাপ চেয়ে চলে গেলেন মাঠের মাঝখানে, বড় রেসটার জন্য ইতিমধ্যেই সেখানে ঘোড়া আনা হচ্ছিল।
