‘আমি তোমাকে অনুরোধ করছি, মিনতি করছি’, হঠাৎ ভ্রন্স্কির হাত টেনে নিয়ে অন্য সুরে, অকপট নরম গলায় আন্না বললেন, ‘এ নিয়ে আর কখনো কিছু আমাকে বলো না।’
‘কিন্তু আন্না…’
‘কখনো না। সব কিছু ছেড়ে দাও আমার ওপর। নিজের অবস্থার সমস্ত হীনতা, সমস্ত ভয়াবহতা আমি জানি; কিন্তু তুমি যা ভাবছ অমন সহজ তাতে তার মীমাংসা হয় না। আমার ওপর ছেড়ে দাও এবং আমার কথা শোন। কখনো কিছু আর বলো না—এ নিয়ে। কথা দিচ্ছ তো?…না-না, কথা দাও!…’
‘সব কিছু কথা আমি দিচ্ছি, কিন্তু শাস্তি আমি পাব না, বিশেষ করে তুমি যা বললে তার পর। শান্তি আমি পাব না যখন তুমি শান্তিতে থাকতে পারছ না।…
‘আমি!’ পুনরুক্তি করলেন আন্না, ‘হ্যাঁ, মাঝে মাঝে কষ্ট হয় আমার; কিন্তু ওটা কেটে যাবে যদি এই কথাটা কখনো না তোলো। ওটা যখন আমাকে বল, যন্ত্রণা হয় কেবল তখনই।’
‘আমি বুঝতে পারছি না’, অন্ল্কি বললেন।
ওঁকে থামিয়ে দিয়ে আন্না বললেন, ‘তোমার সৎ প্রকৃতির পক্ষে মিথ্যাচার কত কষ্টকর তা আমি জানি, সে জন্যে মায়া হয় তোমার ওপর। প্রায়ই আমি ভাবি আমার জন্যে কিভাবে নষ্ট করছ তোমার জীবন।’
‘আমি তো এখনই তাই ভাবছিলাম’, ভ্রন্ল্কি বললেন, ‘আমার জন্যে কি করে তুমি বিসর্জন দিতে পারলে সব কিছু?’ তুমি যে দুর্ভাগিনী এর জন্যে নিজেকে আমি ক্ষমা করতে পারব না।’
‘আমি দুর্ভাগিনী?’ ভ্রন্স্কির কাছ ঘেঁষে এসে ভালোবাসার হ্লাদিত হাসি নিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন আন্না, ‘আমি সেই উপোসী যে খাবার পেয়ে গেছে। হয়ত সে শীতে কাঁপছে, পোশাক তার ছেঁড়া-খোঁড়া। লজ্জা হচ্ছে তার কিন্তু হতভাগ্য সে নয়। আমি দুর্ভাগিনী? না, এই যে আমার সুখ…’
ফিরে আসা ছেলের গলা শুনতে পেয়ে তিনি বারান্দায় ত্বরিত দৃষ্টিক্ষেপ করে ঝটকা মেরে উঠে দাঁড়ালেন। ভ্রন্স্কির পরিচিত ঝলক তাঁর চোখে, দ্রুতভঙ্গিতে তিনি তাঁর অঙ্গুরীশোভিত সুন্দর হাতে ভ্রন্স্কির মাথা ধরে দীর্ঘদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন তাঁর দিকে, স্থিত স্ফূরিত অধরে তাঁর দিকে মুখ নামিয়ে দ্রুত তাঁর ঠোঁটে আর দুই চোখে চুমু খেয়ে তাঁর ঠেলে দিলেন। চলে যেতে চাইছিলেন তিনি, কিন্তু অনুল্কি তাঁকে ধরে রাখরেন।
আন্নার দিকে উচ্ছ্বসিত চোখে তাকিয়ে তিনি ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কখন?’
‘আজ রাত একটায়’, দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিসিয়ে বললেন আন্না, তারপর দ্রুত লঘু পায়ে গেলেন ছেলের দিকে।
সেরিওজা যখন বড় বাগিচায়, তখন বৃষ্টি নেমেছিল, ধাই মা’র সাথে সে বসে ছিল কুঞ্জকুটিরে।
‘তাহলে অপেক্ষায় রইলাম,’ আন্না বললেন অঙ্কিকে, ‘এখন শিগগিরই ঘোড়দৌড়ে, বেত্সি কথা দিয়েছেন— আমাকে নিয়ে যাবার জন্যে আসবেন বলে।’
ঘড়ি দেখে তাড়াতাড়ি করে চলে গেলেন ভ্রন্স্কি।
চব্বিশ
ভ্রন্স্কি যখন কারেনিনদের বারান্দায় ঘড়ি দেখেছিলেন, তখন তিনি নিজের চিন্তায় এতই উদ্বিগ্ন আর নিমগ্ন ছিলেন যে ঘড়ির কাঁটাই শুধু তাঁর চোখে পড়েছিল, বুঝতে পারেননি ক’টা বেজেছে। সড়কে এসে সাবধানে কাদায় পা ফেলে ফেলে তিনি গেলেন তাঁর গাড়ির কাছে। মনে তাঁর শুধু আন্নার ভাবনা, ক’টা বেজেছে, ব্রিয়াঙ্কির কাছে যাবার সময় আছে কি না সে খেয়াল তাঁর ছিল না। প্রায়ই যা ঘটে থাকে, শুধু একটা ভালবাসা স্মৃতি রয়ে গিয়েছিল কিসের পর কি করতে হবে। ইতিমধ্যেই ঝাঁকড়া লাইম গাছের হেলে পড়া ছায়ায় বক্সে ঘুমন্ত কোচোয়ানের কাছে এসে ঘর্মাক্ত ঘোড়াগুলোর ওপর ঘূর্ণায়মান ডাঁশামাছির ঝিলমিলে কুণ্ডলীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কোচোয়ানকে জাগালেন, গাড়িতে উঠে হুকুম করলেন ব্রিয়াঙ্কির কাছে যেতে। ভার্স্ট সাতেক যাবার পরই কেবল ঘড়ি দেখার মত সজ্ঞান হতে পারলেন ভ্রন্স্কি এবং বুঝলেন যে সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে, দেরি হয়ে গেছে তাঁর।
ঘোড়দৌড় ছিল সেদিন একাধিক : অশ্বারোহী গার্ড রেস, তারপর অফিসারদের দুই ভার্স্ট আর চার ভাৰ্ট দৌড়, তারপর হার্ডল রেস, যাতে অনুস্কি নিজে নামছেন। নিজের দৌড়ের নামের সময় কখনো আছে, কিন্তু যদি ব্রিয়ানস্কর, কাছে যান, তাহলে পৌঁছাবেন কোনক্রমে, যখন সমস্ত দরবার জমায়েত হয়ে গিয়েছে। এটা ভালো দেখায় না। কিন্তু ব্রিয়ান্স্কিকে কথা দিয়েছেন যে যাবেন, তাই ঠিক করলেন যাবেনই, কোচোয়ানকে বললেন ঘোড়ার মায়া না করতে।
ব্রিয়াস্কির কাছে গিয়ে মিনিট পাঁচেক সেখানে থেকে আবার ফিরে এলেন। এই দ্রুত সফরটায় শাস্তি বোধ করলেন তিনি। আন্নার সাথে তাঁর সম্পর্ক যা-কিছু ছিল দুঃসহ, কথোপকথনের পর যা-কিছু অনির্দিষ্টতা, সব দূর হয়ে গেল তাঁর মন থেকে; এখন পরিতোষের সাথে উত্তেজনায় ভাবছিলেন শুধু দৌড়ের কথা, ভাবছিলেন যে যতই হোক, দেরি হয়নি। আজ রাতে আন্নার সাথে অভিসারের ব্যাপারটা ব্যাপারটা থেকে থেকে ঝলক দিচ্ছিল তাঁর কল্পনায়।
যতই তিনি পল্লীভবন আর পিটার্সবুর্গ থেকে আগত গাড়িগুলোকে অতিক্রম করে ঘোড়দৌড়ের মেজাজে পৌছাচ্ছিলেন, ততই আসন্ন দৌড় তাঁকে ক্রমেই পেয়ে বসছিল।
সবাই গেছে ঘোড়দৌড়ে, তাঁর বাসায় তখন কেউ ছিল না। খানসামা তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল গেটের কাছে। উনি যখন পোশাক বদলাচ্ছিলেন, খানসামা বলল যে দ্বিতীয় দৌড় শুরু হয়ে গেছে। অনেক সাহেব এসেছিলেন তাঁর খবরাখবর করতে, আস্তাবল থেকে ছোকরা এসেছিল দু’বার।
