দৃঢ়চিত্তে আন্নার কাছে গিয়ে তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, আপনি, আমি, কেউই আমরা আমাদের সম্পর্কটাকে খেলা বলে নিইনি, আর এখন স্থির হয়ে গেল আমাদের ভাগ্য। যে মিথ্যার মধ্যে আমরা আছি’, আশেপাশে তাকিয়ে দেখে তিনি বললেন, ‘তার ইতি হয়ে যাক।’
‘ইতি? কি করে ইতি হবে আলেক্সেই?’ আন্না বললেন মৃদুস্বরে। এখন শান্ত হয়ে এসেছেন তিনি, মুখে তাঁর উদ্ভাসিত হয়ে উঠল কোমল হাসিতে।
‘স্বামীকে ছেড়ে দিয়ে আমাদের জীবন মেলাতে হবে।’
‘সে তো এমনিতেই মিলে আছে’, অস্ফুট স্বরে আন্না বললেন।
‘কিন্তু পুরোপুরি, পুরোপুরি।’
‘কিন্তু কিভাবে আলেকসেই, শিখিয়ে দাও আমায়, কিভাবে?’ আন্না বললেন তাঁর অবস্থার নিরুপায়তায় বিষণ্ণ উপহাস নিয়ে, ‘এই অবস্থা থেকে বেরোবার উপায় আছে কি? আমি কি আমার স্বামীর স্ত্রী নই?’
‘বেরোবার উপায় থাকে সব অবস্থাতেই। দরকার, মন স্থির করে নেওয়া’, ভ্রন্স্কি বললেন, ‘তুমি, যে অবস্থায় আছ তার চেয়ে যে-কোন অবস্থাই ভালো। আমি তো দেখতে পাচ্ছি কিভাবে তুমি কষ্ট পাচ্ছ সমাজ, ছেলে, স্বামী – সব কিছু থেকে।’
‘আহ্, শুধু স্বামী নয়’, স্রেফ ব্যঙ্গভরেই বললেন আন্না, ‘আমি, ওকে চিনি না, ভাবি না, ওর কথা। নেই।’
‘তুমি সত্যি কথা বলছ না। তোমাকে আমি চিনি। ওর জন্যেও তুমি কষ্ট পাচ্ছ।’
আন্না বললেন, ‘ও তো জানেই না’, এবং হঠাৎ তাঁর মুখে ফুটে উঠল জ্বলজ্বলে রঙ; কপোল ললাট গ্রীবা রাঙা
হয়ে উঠল, চোখে দেখা ছিল গ্লানিবোধের অশ্রু। ‘যাক গে, থাক ওর কথা।
তেইশ
ভ্রন্স্কি এর আগেও কয়েকবার আন্নাকে তাঁর অবস্থার আলোচনায় টেনে আনার চেষ্টা করেছেন, যদিও এবারের মত এত দৃঢ়চিত্তে নয়। আর আজ যেভাবে তাঁর চ্যালেঞ্জার জবাব দিলেন আন্না প্রতিবারই তিনি যুক্তির সেই অগভীরতা ও লঘুতার সম্মুখীন হয়েছেন। য়েন এর মধ্যে এমন একটা কিছু আছে যা আন্না নিজের কাছে পরিষ্কার করে তুলতে পারছেন না বা চাইছেন না, যেন এ বিষয়ে কথা বলতে শুরু করলেই তিনি, আসল আন্না নিজের মধ্যে, কোথায় যেন ডুবে যান আর দেখা দেয় অদ্ভূত, ভ্রনস্কির কাছে অনাত্মীয় এক নারী, যাকে তিনি ভালোবাসেন, না ভয় করেন, যে প্রতিহত করছে তাঁকে। কিন্তু আজ সব কিছু বলবেন বলে স্থির করলেন তিনি।
ভ্রন্স্কি বললেন তাঁর অভ্যস্ত দৃঢ় ও প্রশান্ত কণ্ঠে, ‘উনি জানেন কি জানেন না, তাতে আমাদের কিছু এসে যায় না। আমরা আর এভাবে থাকতে পারি না… আপনি পারেন না, বিশেষ করে এখন।’
‘আপনার মতে তাহলে কি করা উচিত?’ সেই একই লঘু বিদ্রূপে আন্না জিজ্ঞেস করলেন। তাঁর গর্ভধারণকে ভ্রুনস্কি পাছে হালকাভাবে নেন বলে যাঁর ভয় হয়েছিল, তাঁর এখন বিরক্ত লাগল যে ভ্রন্স্কি এ থেকে কি একটা ব্যবস্থা নেবার প্রয়োজনীয়তা দেখাচ্ছেন।
‘সব কিছু বলে দিয়ে ওঁকে ত্যাগ করেন। ‘
‘বেশ, ধরা যাক আমি তাই করলাম’, আন্না বললেন। ‘এ থেকে কি দাঁড়াবে জানেন? আমি আগেই বলে দিচ্ছি, তাঁর মুহূর্তপূর্বের কোমল চোখে ঝিকিয়ে উঠল হিংস্র ছটা, ‘বটে, আপনি অন্যকে ভালোবাসেন আর তার সাথে একটা পাতকী সম্পর্ক পাতিয়েছেন?’ (স্বামীকে নকল করে আন্না ঠিক একইভাবে ‘পাতকী’ কথাটার ওপর জোর দিলেন, যেমন দিয়েছেন কারেনিন।) ‘ধর্মীয় নাগরিক, পারিবারিক দিক থেকে এর পরিণাম সম্পর্কে আপনাকে আমি সাবধান করে দিয়েছিলাম। আপনি আমার কথা শোনেননি। এখন আমি নিজের নাম কলংকিত হতে দিতে পারি না।…’ এবং ছেলের নাম, বলতে চেয়েছিলেন আন্না, কিন্তু ছেলেকে নিয়ে তিনি ঠাট্টা করতে পারেন না, ‘নিজের নামের কলংক এবং এই গোছের আরো কিছু, যোগ দিলেন আমার, ‘মোটের ওপর তার তার সরকারী কেতায়, স্পষ্টতায়, যথাযথতায় ও বলবে যে সে আমাকে ছাড়তে পারে না, কেলেঙ্কারি ঠেকাবার জন্য সে যথাসাধ্য ব্যবস্থা নেবে। আর যা বলবে সেটা সে করবে স্থির মাথায়, পরিপাটী করে। এই হবে ব্যাপার। এ যে মানুষ নয়, যন্ত্র, হিংস্র যন্ত্র যখন চটে ওঠে’, কারেনিনের চেহারার সমস্ত খুঁটিনাটি, তাঁর ভেতরের খারাপ যত কিছু খুঁজে পেয়েছেন তাঁর জন্য অপরাধী সাব্যস্ত করলেন তাঁকে, আর যে মহা অপরাধে তিনি নিজে তাঁর কাছে অপরাধী, তার জন্য ক্ষমা করতে পারলেন না তাঁকে।
‘কিন্তু আন্না’, বোঝাবার মত করে নরম গলায় বললেন ভ্রন্স্কি, চেষ্টা করলেন তাঁকে শান্ত করতে, ‘তাহলেও ওঁকে বলা প্রয়োজন, তারপর কি ব্যবস্থা উনি নেন তাই দেখে বলা যাবে।’
‘তার মানে, পালাবে?’
‘কেনই বা নয়? এভাবে চালিয়ে যাওয়ার কোন সম্ভাবনা আমি দেখছি না। সেটা নিজের জন্যে নয়। আমি দেখতে পাচ্ছি যে, আপনি কষ্ট পাচ্ছেন।
হ্যাঁ, পালিয়ে গিয়ে হব আপনার রক্ষিতা?’ ক্ষেপে বললেন আন্না।
‘আন্না!’ ভ্রন্স্কি বললেন কোমল ভর্ৎসনায়।
আন্না আবার বললেন, ‘হ্যাঁ, পালিয়ে গিয়ে আপনার রক্ষিতা হব। আর ডোবাব সবাইকে…’
এবারও বলতে চেয়েছিলেন : ‘ছেলেকে’, কিন্তু কথাটা মুখে এল না।
ভ্রন্স্কি বুঝতে পারছিলেন না নিজের সুদৃঢ়, সৎ প্রকৃতি সত্ত্বেও কি করে আন্না প্রবঞ্চনার এই অবস্থাটা সয়ে যেতে পারেন, তা থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছেন না কেন; তিনি বুঝতে পারেননি যে এর প্রধান কারণ হল ‘ছেলে’ নামক শব্দটা, যা আন্না উচ্চারণ করতে পারছিলেন না। যখন তিনি ছেলে আর বাপকে ছেড়ে যাওয়া মায়ের সাথে তার ভবিষ্যৎ সম্পর্কের কথা ভাবতেন, তখন কৃতকর্মের জন্য তাঁর এমন ভয় হত যে বিচার করে দেখতে পারতেন না, নারী হিসেবে মিথ্যা যুক্তি ও কথায় নিজেকে প্রবোধ দিতেন যাতে সব কিছু আগের মতই থাকে, ছেলের কি হবে এই ভয়াবহ প্রশ্নটা যাতে ভুলে যাওয়া যায়।
