যা তাঁরা জানেন অথচ জানতে চাইছেন না তা থেকে কতটা বিচ্যুতি ঘটল তা জানাবার কম্পাস হল জীবন সম্পর্কে সরল দৃষ্টির এই ছেলেটা।
এবার সেরিওজা বাড়িতে ছিল না। বেড়াতে গিয়ে বৃষ্টিতে আটকা-পড়া ছেলের আগমন প্রতীক্ষায় আন্না বারান্দায় বসে ছিলেন একেবারে একা। ছেলেকে খোঁজার জন্য একটা চাকর আর চাকরানি পাঠিয়ে তার অপেক্ষা করছিলেন। : চওড়া এম্ব্রয়ডারির সাদা গাউন পরে তিনি বারান্দার এক কোণে বসে ছিলেন ফুলগাছগুলোর পেছনে ভ্রন্স্কির আসা শুনতে পাননি। কোঁকড়া কালো চুলে ভরা মাথা নুইয়ে রেলিং বসানো ঠাণ্ডা ঝারিতে কপাল চেপে ঝারি ধরে ছিলেন তাঁর সুন্দর দুটো হাতে, যাতে পরা ছিল ভ্রন্স্কির অতি পরিচিত আংটিগুলি। তাঁর দেহের গোটা গড়ন মাথা, গ্রীবা, হাতের সৌন্দর্য প্রতিবারই ভ্রন্স্কিকে অভিভূত করত তার অভাবনীয়তায়। থেমে গিয়ে ভ্রন্স্কি মুগ্ধ হয়ে তাঁকে দেখলেন। কিন্তু সেই তাঁর কাছে যাবার জন্য পা বাড়াতে গেলেন অমনি আন্না যেন তাঁর উপস্থিতি টের পেয়ে ঝারিটা ঠেলে দিয়ে তাঁর দিকে নিজের আতপ্ত মুখ ফেরালেন।
‘আপনার কি হয়েছে? শরীর ভালো নেই?’ তাঁর দিকে এগোতে এগোতে তিনি বললেন ফরাসিতে। ইচ্ছে হচ্ছিল ছুটে যাবেন; কিন্তু বাইরের লোক থাকতে পারে ভেবে বারান্দার দরজার দিকে চকিতে তাকিয়ে লাল হয়ে উঠলেন, তাঁকে ভয় পেয়ে চলতে হবে। চারদিকে তাকিয়ে দেখতে হবে ভেবে যেমন তিনি লাল হয়ে উঠতেন প্রতিবারই।
উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর প্রসারিত হাতে সজোের চাপ দিয়ে আন্না বললেন, ‘না, শরীর ভালোই আছে। তবে… তোমাকে আশা করিনি।’
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘ইস্, কি ঠাণ্ডা হাড়!’
আন্না বললেন, ‘তুমি যে আমাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছ। আমি একলা, সেরিওজার পথ চেয়ে আছি, গেছে বেড়াতে। ফিরবে এখান দিয়েই। ‘
কিন্তু শান্ত থাকার চেষ্টা সত্ত্বেও আন্নার ঠোঁট কাঁপছিল।
‘মাপ করবেন যে এলাম, কিন্তু আপনাকে না দেখে দিনটা কাটানো আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না’, তিনি বলে গেলেন ফরাসি ভাষাতেই, তাঁদের মধ্যে অসম্ভব প্রাণহীন ‘আপনি’ আর রুশ ভাষায় বিপজ্জনক ‘তুমি’ এড়িয়ে যা তিনি সব সময়ই বলতেন।
‘রাগ করার কি আছে? আমার তো ভারি আনন্দই হচ্ছে।’
‘কিন্তু দেখছি আপনার শরীর কিংবা মন ভালো নেই।’ আন্নার হাত না ছেড়ে তাঁর দিকে ঝুঁকে ভ্রন্স্কি বললেন, ‘কি নিয়ে ভাবছিলেন?’
হেসে আন্না বললেন, ‘সেই একই জিনিস।’
সত্যি কথাই তিনি বললেন। যখনই, যে কোন মুহূর্তেই তাঁকে জিজ্ঞেস করা হোক না কি তিনি ভাবছেন, নির্ভুল জবাব তাঁর হতে পারত : সেই একই নিজের সুখ আর দুর্ভাগ্যের কথা। ভ্রন্স্কির আসার সময় তিনি ভাবছিলেন এই : ‘আচ্ছা, অন্যদের কাছে যেমন বেত্সির কাছে’ (তুশকেভিচের সাথে তাঁর গোপন প্রণয়সম্পর্ক আন্নার জানা ছিল) এ সবই খুব সোজা, আর আমার কাছে কেন এত যন্ত্রনাদায়ক?’ কতকগুলি দিক থেকে এ চিন্তাটা এখন যন্ত্রণাকর হয়ে উঠেছে আরো বেশি। ঘোড়দৌড়ের কথা উনি জিজ্ঞাসা করলেন ভ্রন্স্কিকে। ভ্রন্স্কিও জবাব দিলেন এবং ওঁকে বিচলিত দেখে চেষ্টা করলেন অতি মামুলি ঢঙে দৌড়ের উদ্যোগপর্বের খুঁটিনাটি জানিয়ে ওঁর মন ফেরাতে।
আন্না ভ্রন্স্কির সৌম্য সপ্রেম চোখের দিকে তাকিয়ে ভাবলেন, ‘বলব, নাকি বলব না? ও যে এত সুখী, নিজের দৌড়ে নিয়ে এত ব্যস্ত যে উচিতমত ব্যাপারটা বুঝবে না, বুঝতে পারবে না আমাদের কাছে ঘটনাটার সমস্ত গুরুত্ব।’
‘আমি যখন এলাম তখন কি আপনি ভাবছিরেন তা কিন্তু বললেন না, নিজের বিবরণ থামিয়ে ভ্রন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলুন-না দয়া করে।’
কোন জবাব দিলেন না আন্না, মাথা কিছুটা নুইয়ে তাঁর দীর্ঘ আঁখিপল্লবের তল থেকে জ্বলজ্বলে সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে চুপিসাড়ে চাইছিলেন তাঁর দিকে। ছেঁড়া একটা পাতা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে হাত তাঁর কাঁপছিল। এটা ভ্রন্স্কির চোখে পড়ল মুখে তাঁর ফুঠে উঠল বশ্যতা আর দাসোচিত আনুগত্যের সেই ভাব যা আন্নাকে জয় করেছিল।
‘বুঝতে পারছি কিছু-একটা ঘটেছে। আপনার এমন কিছু-একটা দুঃখ আছে যাতে আমিও ভাগ নিতে পারি, এমন এক মুহূর্তের স্বস্তি কি আমি পেতে পারি না? দোহাই আপনার, দয়া করে বলুন!’ আবার মিনতি করে বললেন ভ্রন্স্কি। ‘না, ব্যাপারটার সমস্ত গুরুত্ব যদি সে না বোঝে তাহলে ক্ষমা করব না। না বলাই ভালো। কি হবে যাচাই করে?’ একইভাবে তাঁর দিকে তাকিয়ে পাতাধরা হাতটা ক্রমেই বেশি করে কাঁপছে টের পেয়ে ভাবলেন আন্না।
‘দোহাই সৃষ্টিকর্তার!’ আন্নার হাত ধরে পুনরুক্তি করলেন ভ্রন্স্কি।
‘বলব?’
‘হ্যাঁ, নিশ্চয়, নিশ্চয়…’
আন্না ধীরে ধীরে মৃদুস্বরে বললেন, ‘আমি অন্তঃসত্ত্বা।’
আরো জোরে কাঁপতে থাকল তাঁর হাতের পাতাটা কিন্তু কিভাবে ভ্রন্স্কি জিনিসটা নিচ্ছেন তা দেখার জন্য ওঁর ওপর থেকে চোখ নামালেন না তিনি। ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন ভ্রন্স্কি। কি-একটা বলতে যাচ্ছিলেন কিন্তু থেমে গেলেন, হাত ছেড়ে দিয়ে মাথা নিচু করলেন। ‘হ্যাঁ, ঘটনাটার সমস্ত তাৎপর্য ও বুঝেছে’, আন্না ভাবলেন, কৃতার্থের মত হাতে চাপ দিলেন ওঁর।
কিন্তু তিনি, নারী, যেভাবে এর তাৎপর্য বুঝছেন, ভ্রন্স্কিও সেভাবে এটা নিচ্ছেন ভেবে ভুল করলেন আন্না। কার প্রতি যেন বিচিত্র যে বিতৃষ্ণাটা তাঁকে পেয়ে বসত, খবরটা শুনে তার দশগুণ প্রবল প্রকোপ অনুভব করলেন ভ্রন্স্কি, কিন্তু সেই সাথে তিনি বুঝলেন, যে-সংকটটা তিনি চাইছিলেন সেটা এসে গেছে, স্বামীর কাছ থেকে আর লুকিয়ে রাখা চলবে না, যে-করেই হোক এই অস্বাভাবিক অবস্থাটার অবসান ঘটাতে হবে। তাছাড়া আন্নার বিচলন দৈহিকভাবে সঞ্চারিত হল তাঁর মধ্যে। আন্না দিকে মর্মস্পষ্ট অনুগত দৃষ্টিপাত করলেন তিনি, উঠে দাঁড়িয়ে নীরবে পায়চারি করতে লাগলেন বারান্দায়।
