যা তাঁর সাতিশয় প্রকৃতিবিরুদ্ধ সেই মিথ্যা ও প্রতারণার ঘন ঘন প্রয়োজনীয়তা ঘটনাগুলো স্পষ্ট হয়ে ভেসে উঠল তাঁর মনে; অতি স্পষ্ট করে তাঁর মনে পড়ল মিথ্যা ও প্রতারণার এই প্রয়োজনীয়তার জন্য আন্নার মধ্যে একাধিকবার যে লজ্জবোধ তিনি লক্ষ্য করেছেন তার কথা। আন্নার সাথে তাঁর সম্পর্কের সময় থেকে যে বিচিত্র একটা অনুভূতি তাঁকে মাঝে মাঝে পেয়ে বসত, সেটা বোধ করলেন তিনি। এটা হল কিসের প্রতি যেন বিতৃষ্ণার একটা অনুভূতি; কারেনিনের প্রতি, নিজের প্রতি, নাকি গোটা সমাজের প্রতি—সেটা ঠিক ভালো করে তিনি জানতেন না। কিন্তু সব সময়ই এই বিচিত্র অনুভূতিটা তিনি দূর করে দিতেন। এবারও তা ঝেড়ে ফেলে চালিয়ে গেলেন তাঁর চিন্তাধারা।
তিনি মনে মনে ঠিক করলেন, ‘হ্যাঁ, আন্না আগে ছিল অসুখী, কিন্তু গর্বিত আর সুস্থির; কিন্তু এখন সে আর শান্তি ও মর্যাদা নিয়ে থাকতে পারছে না, যদিও দেখায় না সেটা। না, এটার অবসান ঘটাতে হবে। এবং এই মিথ্যা যে বন্ধ করা প্রয়োজন আর যত তাড়াতাড়ি তা হয় ততই ভালো, এই পরিষ্কার চিন্তাটা তাঁর মাথায় এল এই প্রথম। তিনি নিজেকে বললেন, ‘এসব ছেড়েছুঁড়ে শুধু নিজেদের ভালোবাসা নিয়ে ওকে আর আমাকে কোথাও গিয়ে লুকিয়ে থাকতে হবে।
বাইশ
খুব বেশিক্ষণ চলল না বৃষ্টিটা। ঢিলা লাগামে কদমে ছোটা দু’পাশের ঘোড়া দুটোকে কাদার মধ্যে দিয়ে টেনে মূল ঘোড়াটা যখন দ্রুতগতিতে ভ্রন্স্কির গাড়িটাকে গন্তব্যের কাছে নিয়ে এল, তখন আবার সূর্য দেখা দিল, প্রধান রাস্তার দু’পাশে পল্লীভবনগুলির চালা আর বাগানের বুড়ো লাইম গাছ সিক্ত ছটায় ঝকঝক করছে ডাল, থেকে সহর্ষে ঝরছে ফোঁটা ফোঁটা পানি, চালে স্রোত। বৃষ্টিটায় ঘোড়দৌড়ের মাঠ কতটুকু নষ্ট হবে, সে কথা আর ভাবছিলেন না অন্স্কি। এখন তাঁর এই জন্য আনন্দ হল যে বৃষ্টির দৌলতে আন্নাকে তিনি বাড়িতে পাবেন একা কেননা তিনি জানতেন যে সম্প্রতি হাওয়া বদল করে ফেরার পর কারেনিন পিটার্সবুর্গ থেকে পল্লীতে এখনো আসেননি
ছোট সাঁকোটা না পেরিয়েই ভ্রন্স্কি গাড়ি থেকে নামলেন আন্নাকে একা পাবার আশায়। লোকের দৃষ্টি যথাসম্ভব কম আকর্ষণের জন্য যা তিনি করে থাকেন সব সময়ই, এবং চললেন পায়ে হেঁটে। রাস্তা থেকে তিনি অলিন্দে উঠলেন না; আঙিনায় গেলেন।
মালীকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কর্তা এসেছেন?’
‘জ্বি না। তবে গিন্নিমা আছেন। আপনি অলিন্দে যান-না, লোক আছে সেখানে, দরজা খুলে দেবে’, মালী বলল।
‘না, আমি বাগান দিয়ে যাব।’
আন্না যে একা সে সম্পর্কে নিশ্চিত হয়ে, এবং যেহেতু আজ তিনি আসবেন বলে দেননি আর আন্নাও নিশ্চয় ভাবেননি যে ঘোড়দৌড়ের আগে তিনি আসতে পারেন, তাই তাঁকে চমকে দেওয়া যাবে ভেবে, তরোয়াল ঠিক করে নিয়ে ফুলগাছ ঘেরা হাঁটাপথটার বালির ওপর দিয়ে সন্তর্পণে এগোলেন বারান্দা লক্ষ্য করে, যা বাগানের দিকে মুখ করে আছে। গাড়িতে আসতে আসতে নিজের অবস্থার দুঃসহতা ও কাঠিন্যের যে কথা ভ্রন্স্কি ভাবছিলেন, তা এখন ভুলে গেলেন তিনি। শুধু এটাই তিনি ভাবছিলেন যে, এবার ওঁকে দেখতে পাবেন শুধু মানসনেত্রে নয়, জীবন্ত বাস্তবে আন্না যার তার সবটাই। শব্দ না করার জন্য বারান্দার নিচু সিঁড়িতে পা চেপে চেপে তিনি উঠছিলেন। হঠাৎ মনে পড়ে গেল, যা তিনি সব সময়ই ভুলে যান এবং আন্নার সাথে তাঁর সম্পর্কের যেটা সবচেয়ে কষ্টকর দিক—আন্নার ছেলে আর তার সপ্রশ্ন এবং তাঁর যা মনে হত বিরূপ, দৃষ্টির কথাটা।
তাঁদের সম্পর্কের পথে এই ছেলেটাই ছিল সবার চেয়ে বড় বাধা। সে উপস্থিত থাকলে ভ্রন্স্কি বা আন্না কেউই এমন কিছু বলতেন না যা অপরের সমক্ষে বলা যায় না তাই নয়, এমন কি আভাসে ইঙ্গিতেও এমন কিছু বলতেন না যা ছেলেটা বুঝবে না। এ নিয়ে তাঁরা কোন বোঝাপাড়া করেননি। এটা স্থির হয়ে গিয়েছিল আপনা থেকেই। ছেলেটাকে প্রতারণা করা ছিল তাঁদের নিজেদের কাছেই অবমাননাকর। তার সামনে ওঁরা আলাপ করতেন নেহাৎ পরিচিতের মত। কিন্তু এই সাবধানতা সত্ত্বেও ভ্রন্স্কি প্রায়ই দেখেছেন ছেলেটার মনোযোগী বিমূঢ় তাঁর প্রতি নিবদ্ধ তাঁর প্রতি মনোভাবে ছেলেটার অদ্ভুত একটা সংকোচ, অস্থিরতা, কখনো প্রীতি, কখনো শীতলতা আর লজ্জা। ছেলেটা যেন অনুভব করত যে এই লোকটা আর তার মায়ের মধ্যে কিছু-একটা গুরুতর সম্পর্ক আছে যার অর্থ সে বোঝে না।
সত্যিই ছেলেটা অনুভব করত যে এই সম্পর্কটা সে বুঝতে পারছে না, এই লোকটার প্রতি তার কি মনোভাব হওয়া উচিত, মথ চেষ্টা করেও সেটা পরিষ্কার হত না তার কাছে। মনোভাব সম্পর্কে শিশুর সংবেদনশীলতায় সে পরিষ্কার বুঝতে পারত যে বাবা, গৃহশিক্ষিকা, ধাই-মা—সবাই শুধু যে ভ্রন্স্কিকে পছন্দ করত না তাই নয়, তাঁর সম্পর্কে একটা বিতৃষ্ণা আর ভয়ই বোধ করত, যদিও কিছুই বলত না সে সম্পর্কে, অথচ মা তাঁকে দেখতে সেরা বন্ধুর মত
‘এর কি মানে? কেমন লোক সে? কিভাবে ভালেবাসা যায় ওকে? যদি তা না বুঝি তাহলে দোষ, আমার অথবা আমি বোকা, কিংবা পাজি’, ভাবত ছেলেটা; এই থেকেই আসত তার পরীক্ষকসুলভ, জিজ্ঞাসু, অংশত বিরূপ মুখভাব, আবার সংকোচ আর অস্থিরতাও যা অমন বিড়ম্বিত করত ভ্রন্স্কিকে। এই ছেলেটা থাকলে ভ্রন্স্কির মধ্যে সব সময়ই সেই অদ্ভুত অকারণ বিদ্বেষ জেগে উঠত যা ইদানীং তিনি বোধ করছেন। ছেলেটার উপস্থিতিতে ভ্রন্স্কি এবং আন্না উভয়েরই যে অনুভূতি হত, সেটা সেই ক্যাপ্টেনের মত যে কম্পাসে দেখতে পাচ্ছে যে, তার জাহাজ যেদিকে দ্রুত ভেসে চলেছে সেটা মোটেই নির্ধারিত দিক নয়, অথচ এ গতি থাতামে সে অক্ষম, প্রতি মিনিটেই সে কেবলি দূরে সরে যাচ্ছে নির্দিষ্ট পথ থেকে আর নিজের কাছে এ বিচ্যুতি স্বীকার করার অর্থ ধ্বংস মেনে নেওয়া।
