অন্তত ভ্রন্স্কির মনে হত তার দিকে তাকিয়ে কি তিনি ভাবছেন তা সব বুঝতে পারছে ঘোড়াটা।
ভ্রন্স্কি তার কাছে যেতেই সে গভীর শ্বাস নিল, এমনভাবে ফুলো-ফুলো চোখ ঘোরাল যে তার সাদা অংশটায় দেখা দিল রক্তের স্ফীতি, মুখসাজ ঝাঁকিয়ে, স্থিতিস্থাপকতায় এ-পায়ে ও-পায়ে ভর দিয়ে বিপরীত দিক থেকে সে তাকাল আগন্তুকদের দিকে।
‘দেখছেন তা কেমন চেগে আছে’, ইংরেজটি বলল।
‘ও-ও, সোনা আমার, লক্ষ্মী আমার’, ঘোড়ার কাছে যেতে যেতে তাকে বুঝ মানাতে লাগলেন ভ্রন্স্কি।
কিন্তু যতই তিনি এগোতে লাগলেন, ততই উত্তেজিত হয়ে উঠতে লাগল ঘোড়া। শুধু যখন তিনি ওর মাথার কাছে পৌঁছলেন, হঠাৎ শান্ত হয়ে গেল সে, মিহি নরম লোমের তলে তিরতির করতে লাগল পেশী। তার শক্ত গ্রীবায় হাত বুলালেন ভ্রন্স্কি, তীক্ষ্ণ ঘাড় থেকে অন্যদিকে ছিটকে পড়া একগোছা কেশর ঠিক করে দিলেন, মুখ বাড়ালেন তার প্রসারিত, বাদুড়ের মুখের মত চিকন নাসারন্ধ্রের দিকে। উত্তেজিত নাসারন্ধ্র দিয়ে ঘোড়াটা সশব্দে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল আর ছাড়ছিল, খোঁচা-খোঁচা কান চেপে কেঁপে উঠল সে, শক্ত কালো ঠোঁট সে বাড়িয়ে দিল ভ্রন্স্কির দিকে, যেন তাঁর আস্তিন ধরতে চায়। কিন্তু মুখসাজের কথা মনে পড়ায় আবার শুরু করল তার সরু সরু এ-পায়ে ও-পায়ে ভর দিতে।
‘শান্ত হ’ লক্ষ্মীটি, শান্ত হ’, আরেকবার ওর পাছা চাপড়ে ভ্রন্স্কি বললেন এবং ঘোড়ার হাল যে চমৎকার সেটা জেনে সানন্দে বেরিয়ে গেলেন স্টল থেকে।
ঘোড়ার উত্তেজনা সঞ্চারিত হয়েছিল ভ্রন্স্কির মধ্যেও; তিনি টের পাচ্ছিলেন যে, হৃৎপিণ্ডে রক্ত উঠে আসছে। ঘোড়াটার মতই তিনি চাইছেন ছুটতে, কামড়াতে; যেমন ভয় হচ্ছিল তাঁর, তেমনি আনন্দ।
ইংরেজটিকে তিনি বললেন, ‘তাহলে আপনার ওপর ভরসা করে থাকছি। যথাস্থানে সাড়ে ছ’টায়।’
‘সব ঠিক আছে’, বলল ইংরেজ, তারপর প্রায় কখনো সে যা বলে না সেই My Lord কথাটা ব্যবহার করে সে বলল, ‘কিন্তু কোথায় যাচ্ছেন, হুজুর?’
অবাক হয়ে ভ্রন্স্কি মাথা তুললেন এবং প্রশ্নের এই স্পর্ধায় বিস্মিত হয়ে তিনি চাইলেন ইংরেজটির চোখে নয়, কপালের দিকে, যা কেবল তিনিই পারেন। কিন্তু প্রশ্নটা যে করা হয়েছে মনিবকে নয়, যে হতে চলেছে জকি তাকে, এটা বুঝে তিনি জবাব দিলেন, ‘ব্রিয়াস্কির কাছে যেতে হবে আমাকে, এক ঘণ্টার মধ্যেই বাড়ি ফিরব।’
‘কতবার আজ আমাকে এই প্রশ্নটা শুনতে হচ্ছে’, মনে মনে ভাবলেন তিনি এবং লাল হয়ে উঠলেন, যা তিনি হন কদাচিৎ। ইংরেজটা মন দিয়ে তাঁকে দেখল। এবং ভ্রন্স্কি কোথায় যাচ্ছেন, তা যেন সে জানে এমন ভঙ্গিতে যোগ করল, ‘দৌড়ের আগে সুস্থির থাকাটাই প্রথম কথা’, এবং বলল, ‘মেজাজ ভালো রাখবেন, কিছুতেই মনমরা হবেন না যেন।’
‘অল রাইট’, হেসে জবাব দিলেন ভ্রন্স্কি এবং গাড়িতে উঠে হুকুম করলেন পিটার্সহফে যেতে।
কিছু দূর যেতে-না-যেতেই যে কালো মেঘ সকাল থেকেই বৃষ্টির ভয় দেখাচ্ছিল তা এগিয়ে এসে অঝোরে ঝরে পড়ল বৃষ্টিধারায়।
‘গতিক খারাপ’, হুড তুলে দিয়ে মনে মনে ভাবলেন ভ্রন্স্কি। ‘এমনিতেই ছিল কাদা, এখন হয়ে দাঁড়াবে একেবারে জলা।’ ঢাকা গাড়িতে একলা বসে উনি মায়ের চিঠি আর ভাইয়ের চিরকুট বের করে পড়তে লাগলেন।
হ্যাঁ, সেই একই ব্যাপার। সবাই, তাঁর মা, ভাই, সবাই তাঁর হৃয়দঘটিত ব্যাপারে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন জ্ঞান করেছে। এই হস্তক্ষেপ তাঁর মধ্যে জাগিয়ে তুলল বিদ্বেষ, যে অনুভূতিটা তিনি বোধ করতেন কদাচিৎ। ‘ওঁদের কি মাথাব্যথা? কেন সবাই মনে করে যে আমার তদারকি করা তাদের কর্তব্য? কিন্তু কি জন্যে ওর পিছু লেগেছে আমার? কারণ ওরা দেখতে পাচ্ছে যে এটা এমন জিনিস বা তাদের বোধের বাইরে। এটা যদি হত একটা মামুলি ইতর সামাজিক কেচ্ছা, তাহলে ওরা আমাকে শান্তিতে থাকতে দিত। ওরা টের পাচ্ছে এটা অন্য কিছু, এটা খেলা নয়, এ নারী আমার কাছে আমার জীবনাধিক প্রিয়। আর ঠিক এইটাই ওদের কাছে দুর্বোধ্য, সেহেতু বিরক্তিকর। আমাদের ভাগ্যে যা ঘটেছে বা ঘটবে, সেটা আমরাই ঘটিয়েছি, তার জন্যে কোন আফসোস নেই আমাদের’, বললেন তিনি, আর ‘আমরা’ কথাটায় নিজেকে যুক্ত করলেন আন্নার সাথে। ‘না, কি করে জীবন কাটাতে হবে, সেটা ওদের শেখানোই চাই আমাদের। সুখ কি জিনিস—তার ধারণাই নেই ওদের, ওরা জানে না যে এই ভালোবাসা ছাড়া আমাদের কাছে সুখও নেই, অসুখও নেই,—জীবনই নেই’, ভাবলেন ভ্রন্স্কি।
এই হস্তক্ষেপের জন্য সবার ওপরে তিনি রেগে উঠলেন ঠিক এই কারণে যে মনে মনে টের পাচ্ছিলেন, ওরা, এই সবাইরাই সঠিক। তিনি অনুভব করছিলেন যে আন্নার সাথে তিনি যে প্রেমে বাঁধা পড়েছেন সেটা ক্ষণিকের মাতন নয় যা কেটে যাবে, প্রীতিকর বা অপ্রতীতিকর কিছু স্মৃতি ছাড়া জীবনে আর কোন চিহ্ন না রেখে যেমন কেটে যায় উঁচু সমাজের প্রণয়ঘটিত ব্যাপার। তিনি বুঝতে পারছিলেন তাঁর ও আন্নার অবস্থার সমস্ত যন্ত্রণা, সমাজের দৃষ্টিপথে থাকায় নিজেদের প্রেম লুকিয়ে রাখা, মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা দুরূহতা; এবং মিথ্যা বলা, প্রতারণা করা, চালাকি খাটানো আর অনবরত অন্যদের কথা ভাবা কিনা তখন, যখন যে আবেগ তাঁদের বেঁধেছে তা এতই প্রবল যে নিজেদের ভালোবাসা ছাড়া আর সব কিছুই ভুলে গেছেন তাঁরা দুজনেই।
