‘কিন্তু শেষটা হল কেমন?’ পেত্রিৎস্কি বলতে লাগলেন, ‘ভলকোভ ছাদে উঠে বলে ওর নাকি মন খারাপ লাগছে। আমি বললাম, লাগাও গান, অন্ত্যেষ্টি মার্চ! ওই অন্ত্যেষ্টি মার্চ সঙ্গীত শুনতে শুনতেই সে ঘুমিয়ে পড়ল ছাদের ওপর।’
‘খেয়ে নে, ভোদ্কাটা খেয়ে নিতেই হবে, তারপর সেসার পানি আর প্রচুর লেবু’, পেত্রিৎস্কির ওপর ঝুঁকে ইয়াভিন বলছিলেন মায়ের মত, যেন জোর করে ওষুধ গেলাচ্ছেন। ‘তারপর কিছুটা শ্যাম্পেন, এই বোতলখানেক।’
‘হ্যাঁ, এটা বুদ্ধিমানের মত কথা। দাঁড়া ভ্রন্স্কি, মদ খাওয়া যাক।’
‘উঁহু, আসি সাহেবরা। আজ আমি মদ খাব না।’
‘কি, চর্বি জমবে ভাবছিস? তাহলে আমরা নিজেরাই চালাই। দে সেলৎসার পানি আর লেবু।’
ভ্রন্স্কি যখন প্রায় বেরিয়ে এসেছেন, কে যেন চেঁচিয়ে উঠল, ‘ভ্ৰন্স্কি!’
‘কি হল?’
‘তুই চুল ছাঁটলে পারিস, নইলে বড্ড ভারি হয়ে উঠছে, বিশেষ করে টাকের জায়গাটায়।’
সত্যিই ভ্রন্স্কির চুল পাতলা হয়ে আসছিল অকালে। খুশি হয়ে হেসে নিজের সমান ছাঁদের দাঁত দেখিয়ে টুপিটা টাকের ওপর টেনে এনে গাড়িতে এসে উঠলেন অনস্কি।
‘আস্তাবল’, এই বলে পড়ার জন্য চিঠিটা নিতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু নিলেন না, যাতে ঘোড়া দেখার আগে মনেটা বিগড়ে না যায়। ‘পরে! …’
একুশ
তক্তা দিয়ে বানানো একটা চালাই হল অস্থায়ী আস্তাবল। ঘোড়দৌড়ের মাঠের কাছেই। গতকালই সেখানে তাঁর ঘোড়ার এসে পড়ার কথা। এখনো তাকে তিনি দেখেননি। ইদানীং নিজে তিনি তাতে চাপছিলেন না, ভার দিয়েছিলেন টেনারের ওপর, তখন একেবারেই তিনি জানতেন না ঘোড়াটা কি অবস্থায় এসেছে এবং আছে। গাড়ি থেকে নামতে- না-নামতেই তাঁর সহিস, যাকে খোকা বলে ডাকা হয়, দূর থেকে গাড়িটা চিনতে পেরে ট্রেনারকে ডেকে আনে। লম্বা হাইবুট আর খাটো জ্যাকেট পরা শুকনোটে চেহারার ইংরেজ, শুধু থুতনির কাছে ছেড়ে রাখা হয়েছে কিছুটা দাড়ি, জকিদের আনাড়ী চলনে দুই কনুই প্রসারিত করে দুলতে দুলতে এগিয়ে এল তাঁর দিকে।
‘তা কেমন আছে ফ্র-ফু?’ ভ্রন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন ইংরেজিতে।
‘Allright, sir—সব ঠিক আছে, স্যার, গলার কোন ভেতর বাগ থেকে ইংরেজটি বলল। ‘তবে কাছে না যাওয়াই ভালো’, টুপি তুলে যোগ করল সে; ‘আমি ওকে মুখসাজ পরিয়েছি, কিছুটা চটে আছে। না যাওয়াই ভালো, তাতে ঘোড়া খেপে উঠবে।’
‘না, আমি যাব। দেখতে চাই।’
‘তাহলে চলুন,’ ইংরেজটি বলল ভ্রূকুটি করে আর সেই একইভাবে মুখ না খুলে, এবং কনুই নাড়াতে নাড়াতে নড়বড়ে চলনে চলল আগে আগে।
ওঁরা ঢুকলেন ব্যারাকের সামনে আঙিনাটায়। হাতে ঝাড় নিয়ে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কোর্তা পরা বাহারে সাজে যে তুখোড় ছেলেটা ডিউটিতে ছিল, সে এগিয়ে চলল ওঁদের পেছনে পেছনে। ব্যারাকের স্টলে স্টলে ছিল পাঁচটা ঘোড়া, ভ্রন্স্কি জানতেন যে, আজ নিয়ে আসা হয়েছে এবং এখানেই আছে তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, মাখোতিনের লালচে আভার উজ্জ্বল-বাদামি দীর্ঘকায় গ্লাদিয়াতর। নিজের ঘোড়াটার চেয়েও ভ্রন্স্কির বেশি ইচ্ছে হচ্ছিল গ্লাদিয়াতরকে দেখার, যাকে তিনি দেখেননি। কিন্তু ভ্রন্স্কি জানতেন যে ঘোড়দৌড়ে শোভনতার নিয়ম অনুসারে তাকে দেখা তো দূরের কথা, তার সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করাও অনুচিত। যখন তিনি করিডোর দিয়ে যাচ্ছিলেন, ছেলেটা বাঁ দিকের দ্বিতীয় স্টলের দরজা খুলল, সাদা পায়ে বড় একটা বাদামি ঘোড়া দেখতে পেলেন ভ্রন্স্কি। উনি জানতেন যে, এটাই গ্লাদিয়াতর, কিন্তু অপরের খোলা একটা চিঠি থেকে চোখ ফিরিয়ে নেওয়া লোকের মত তিনি মাথা ঘুরিয়ে চলে গেলেন ফ্র-ফ্রুর স্টলের দিকে।
‘এটা ম্যাক…ম্যাক…’, কাঁধের পেছন দিকে নোংরা নখওয়ালা আঙুল দিয়ে গ্লাদিয়াতরের স্টলটা দেখিয়ে বলল ইংরেজটি। এ নামটা সে কখনোই উচ্চারণ করতে পারত না।
‘মাখোতিনের? হ্যাঁ, এ আমার এক গুরুতর প্রতিদ্বন্দ্বী’, ভ্রন্স্কি বললেন।
ইংরেজটি মন্তব্য করল, ‘ওকে যদি আপনি চালাতেন, তাহলে আমি বাজি ধরতাম আপনার ওপর।
ফ্রু-ফ্রু স্নায়বিক, কিন্তু এটা তাগড়াই’, নিজের অশ্বচালনার তারিফে হেসে বললেন ভ্রন্স্কি।
‘হার্ডল ঘোড়দৌড়ে সবটাই হল pluck-এর ব্যাপার’, ইংরেজটি জানাল।
নিজের মধ্যে যথেষ্ট plcuk, অর্থাৎ উদ্যম ও সাহস ভ্রন্স্কি শুধু যে অনুভব করতেন তাই নয়, তার চেয়েও যেটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, তিনি একেবারে সুনিশ্চিত ছিলেন যে, এই pluck জিনিসটা তাঁর চেয়ে বেশি দুনিয়ায় আর কারো নেই।
‘আর বেশি ঘামানোর দরকার নেই বলে আপনি মনে করেন?’
‘দরকার নেই’, জবাব দিল ইংরেজটা; তারপর যে বন্ধ স্টলটার পাশে ওঁরা দাঁড়িয়ে ছিলেন, খড়ের ওপর খুর ফেলার শব্দ আসছিল যেখান থেকে, মাথা হেলিয়ে তার দিকে ইঙ্গিত করে সে যোগ করল, ‘জোরে কথা বলবেন না দয়া করে। ঘোড়াটা চেগে আছে।’
দরজা খুলল সে, ছোট একটা গবাক্ষের আলোয় স্বপ্নালোকিত স্টলের ভেতরে ঢুকলেন ভ্রন্স্কি। টাটকা খড়ের ওপর এ-পা ও-পা করে দাঁড়িয়ে ছিল মুখসাজ পরানো গাঢ় পিংলা রঙের ঘোড়া। আধা-অন্ধকারে চোখ মেলে নিজের অজ্ঞাতসারে এক দৃষ্টিতেই ভ্রন্স্কি আবার তাঁর পেয়ারের ঘোড়াটার সমস্ত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দেখে নিলেন। ফ্রু-ফ্রু ছিল মাঝারি আকারের ঘোড়া, সর্বাঙ্গে নিখুঁতও নয়। হাড়ের দিক থেকে সে সরু গোছের। বুক সামনের দিকে প্রচণ্ড এগিয়ে থাকলেও সে বুক প্রশস্ত নয়। পাছা সামান্য ঝুলে-পড়া, সামনের, বিশেষ করে পেছনের পা তেরছা। সামনের পেছনের কোন পায়ের পেশীই তেমন জাঁকালো নয়; কিন্তু কাঁধ অসাধারণ চওড়া। যা তার ঠাট আর রোগা পেটের দরুন বিশেষ চমৎকৃত করে। সামনে থেকে দেখলে হাঁটুর নিচে তার পায়ের হাড় আঙুলের চেয়ে বেশি মোটা বলে মনে হবে না, কিন্তু পাশ থেকে দেখলে তা অসাধারণ চওড়া। বুকের পাঁজর ছাড়া তার গোটা শরীর যেন পাশ থেকে চাপা আর দৈর্ঘ্যে প্রলম্বিত। কিন্তু উচ্চমাত্রার এমন একটা গুণ তার ছিল যাতে এসব ত্রুটি ভুলে যেতে হয়; এই গুণটা হল উঁচু জাত, এমন জাত, যা ইংরেজরা বলে, জানানি দেয়। সাটিনের মত সমৃণ, মিহি, চঞ্চল চামড়ার তলে বিছানো শিরার জালি থেকে প্রকট হয়ে ওঠা পেশী মনে হয় হাড়ের মত শক্ত। শুকনোটে মুখে ফুলো ফুলো, জ্বলজ্বলে, হাসিখুশি চোখ, সে মুখ থোবনায় এসে বিস্তৃত হয়ে গেছে প্রকাণ্ড নাসারন্ধ্রে যার ভেতর চোখে পড়ে রক্তোচ্ছ্বসিত কোমলাস্থি। তার সমস্ত অবয়বে, বিশেষ করে মাথায় ছিল সুনির্দিষ্ট, তেজস্বী, সেই সাথে কমনীয় একটা ভাব। এটা তেমনি একটা পশু যা কথা বলছে না মনে হবে শুধু এজন্য যে তার মুখের গঠন তার অনুকূল নয়।
