‘খেতে আমার দেরি আছে, কিন্তু পান করা দরকার, এখনই আসছি। ওহে, মদ!’ রেজিমেন্টে বিখ্যাত তাঁর গমগমে গলায় শার্সি কাঁপিয়ে হাঁক দিলেন ইয়াভিন। ‘নাঃ দরকার নেই’, তৎক্ষণাৎ আবার তিনি চেঁচালেন, ‘তুই বাড়ি যাচ্ছিস, আমিও যাই তোর সাথে।’ এ কথা বলে বেরিয়ে গেলেন দুজনেই।
আন্না কারেনিনা – ২.২০
বিশ
পার্টিশান দিয়ে আধাআধি ভাগ করা প্রশস্ত পরিচ্ছন্ন একটা কৃষক কুটিরে থাকতেন ভ্রন্স্কি। ক্যাম্পেও পেত্রিৎস্কি থাকতেন তাঁর সাথে। ভ্রন্স্কি আর ইয়াভিন যখন এলেন, তখন পেত্রিৎস্কি ঘুমাচ্ছিলেন।
‘ওঠ, খুব ঘুমিয়েছিস’, পার্টিশানের ওপাশে গিয়ে বালিশে নাক গুঁজে থাকা পেত্রিৎস্কির কাঁধে ধাক্কা দিয়ে বললেন ইয়াভিন।
পেত্রিৎস্কি হঠাৎ হাঁটুতে ভর দিয়ে লাফিয়ে উঠে দুজনকে তাকিয়ে দেখলেন।
ভ্রন্স্কিকে বললেন, ‘তোর বড় ভাই এসেছিল, আমাকে জাগিয়ে দিল হতচ্ছাড়াটা, বলল আবার আসবে। আবার কম্বল টেনে নিয়ে মাথা রাখলেন বালিশে। ‘জ্বালাস নে বাপু ইয়াভিন’, ওঁর কম্বলটা টানছিলেন ইয়াভিন, তাতে চটে উঠে পেত্রিৎস্কি বললেন, ‘ছাড় তো!’ পাশ ফিরে চোখ মেললেন তিনি, ‘তার চেয়ে বরং বল কি পান করা যায়; এমন বিস্বাদ হয়ে আছে মুখটা যে…’
‘সবচেয়ে ভালো হবে ভোদ্কা’, গাকগাঁক করে উঠলেন ইয়াভিন, ‘তেরেশ্যেঙ্কো! সাহেবের জন্য ভোদ্কা আর শশা!’ চেঁচিয়ে বললেন তিনি, বোঝা যায় নিজের গলা শুনতে তাঁর ভালো লাগছিল।
‘বলছিস ভোদ্কা? এ্যা?’ মুখ কুঁচকে চোখ রগড়াতে রগড়াতে বললেন পেত্রিৎস্কি, ‘আর তুই খাবি? তাহলে একসাথেই খাওয়া যাক! খাবি ভ্রন্স্কি?’ উঠে দাঁড়িয়ে বাঘছালের কম্বলটা হাতের নিচে জড়াতে জড়াতে পেত্রিৎস্কি বললেন।
পার্টিশানের দরজায় এসে হাত তুলে ফরাসি ভাষায় গেয়ে উঠলেন, ‘এক যে রাজা ছিল গো তু-উ-লায়’। ‘অস্কি, টানবি?’
‘ভাগ তো’, চাকর যে ফ্রক-কোটটা এনে দিয়েছিল সেটা পরতে পরতে বললেন ভ্রন্স্কি।
‘কোথায় রে?’ ইয়াভিন জিজ্ঞেস করলেন। একটা ত্রয়কা গাড়ি আসতে দেখে যোগ করলেন, ‘ত্রয়কাও এসে গেছে দেখছি।
‘আস্তাবলে, তাছাড়া ঘোড়ার ব্যাপারে ব্রিয়াস্কির কাছেও যেতে হবে’, ভ্রন্স্কি বললেন।
ভ্রন্স্কি সত্যিই ব্রিয়ান্স্কিকে কথা দিয়েছিলেন যে পিটার্সহফ থেকে দশ ডার্স্ট দূরে তার কাছে গিয়ে টাকা দিয়ে আসবেন ঘোড়ার জন্য; চেয়েছিলেন এখানেও ঢুঁ মেরে আসতে পারবেন। কিন্তু বন্ধুরা সাথে সাথে ধরে ফেললেন যে শুধু ব্রিয়াস্কির কাছেই তিনি যাচ্ছেন না। গান চালিয়ে যেতে যেতেই চোখ মটকালেন পেত্রিৎস্কি, ঠোঁট ফোলালেন যেন বলতে চান : জানি রে তোর ব্রিয়াস্কিকে।
‘দেখিস, দেরি করিস না যেন!’ শুধু এটুকু বলে ইয়াভিন প্রসঙ্গ পালটাবার জন্য যে ঘোড়াটাকে বিক্রি করেছেন জানালা দিয়ে তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, তা আমার ফুট-ফুটকি কাজ দিচ্ছে কেমন, ভালো?’
ভ্রন্স্কি ততক্ষণে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, পেত্রিৎস্কি তাঁর উদ্দেশে চেঁচালেন, ‘আরে দাঁড়া, দাঁড়া! তোর বড় ভাই তোর জন্যে একটা চিঠি আর চিরকুট রেখে গেছে। দাঁড়া, দাঁড়া, কোথায় সেগুলো?’
ভ্রন্স্কি দাঁড়ালেন।
‘কিন্তু কোথায় সেগুলো?’
‘কোথায়? আরে সে-ই তো প্রশ্ন!’ নাক থেকে ওপরের দিকে তর্জনী তুলে সগাম্ভীর্যে বললেন পেত্রিৎস্কি।
ভ্রন্স্কি হেসে বললেন, ‘আরে বাবা বল, ফক্কড়ি করিস না।’
‘ওটা দিয়ে তো আর ফায়ার-প্লেস ধরাইনি, এখানেই থাকবে কোথাও।’
‘নে, বাজে কথা রাখ! কোথায় চিঠি?’
উঁহু, সত্যি মনে নেই। নাকি স্বপ্নে দেখলাম? দাঁড়া, দাঁড়া, রাগ করিস না। গতকাল যদি আমার মত চার বোতল শেষ করতিস, তাহলে তুইও ভুলে যেতিস কোথায় আছিস। দাঁড়া ভেবে দেখি।’
পেত্রিৎস্কি পার্টিশানের ওপাশে গিয়ে শুলেন নিজের বিছানায়।
‘দাঁড়া, এভাবে শুয়ে ছিলাম আমি আর ও দাঁড়িয়ে ছিল ওখানে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ… এই যে!’ তোষকের তলে যেখানে লুকিয়ে রেখেছিলেন, সেখান থেকে পেত্রিৎস্কি টেনে বের করলেন চিঠিটা।
চিঠি নিয়ে বড় ভাইয়ের চিরকুট পড়ে দেখলেন ভ্রন্স্কি। যা ভেবেছিলেন, তাই-ই। যাননি বলে মা অনুযোগ করেছেন চিঠিতে, বড় ভাইয়ের চিরকুটে লেখা আছে কথা বলা দরকার। ভ্রন্স্কি জানতেন সবই ওই ব্যাপারটা নিয়েই। ‘ওঁদের এ নিয়ে মাথা ঘামাবার কি আছে?’ এই ভেবে ভ্রন্স্কি চিঠিটা দলা-মোচড়া করে গুঁজলেন ফ্রক-কোটের বোতামের ফাঁকে, পথে যেতে যেতে মন দিয়ে পড়বেন বলে। বেরোবার বারান্দায় দেখা হল দুজন অফিসারের সাথে, একজন তাঁদের, দ্বিতীয়জন অন্য রেজিমেন্টের লোক।
ভ্রন্স্কির বাসা সব সময়ই সমস্ত অফিসারদের আড্ডাস্থল।
‘কোথায়?’
‘পিটার্সহফে, কাজ আছে।’
‘জারস্কোয়ে থেকে ঘোড়া এসেছে?’
‘এসেছে, তবে আমি এখনো দেখিনি।
‘শুনছি নাকি মাখোতিনের গ্লাদিয়াতর খোঁড়া হয়েছে।’
‘বাজে কথা। কিন্তু এই কাদায় আপনারা দৌড়াবেন কেমন করে?’ বলল অন্যজন।
‘এতেই আমার উদ্ধার!’ আগতদের দেখে চেঁচিয়ে উঠলেন পেত্রিৎস্কি। সামনে তাঁর ভোদ্কা আর ট্রে-তে নোনা শশা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল অর্দালি। ‘তরতাজা হয়ে ওঠার জন্যে খেতে হুকুম করছে ইয়াভিন।’
‘কাল আমাদের বেশ দেখালেন বটে’, বলল নবাগতদের একজন। ‘সারা রাত ঘুমাতে দেননি।’
