পাশের বিলিয়ার্ড কক্ষ থেকে শোনা যাচ্ছিল বল মারার শব্দ, কথাবার্তা, হাসি। প্রবেশদ্বারে দেখা দিলেন দুজন অফিসার : একজন অল্পবয়সী, দুর্বল পাতলা মুখ, পেজ কোর থেকে রেজিমেন্টে এসেছে সম্প্রতি; অন্যজন মোটাসোটা বয়স্ক অফিসার, এক হাতে একটা ব্রেসলেট, চর্বি ঢাকা খুদে খুদে চোখ।
ভ্রন্স্কি তাকালেন ওঁদের দিকে, তারপর ভুরু কুঁচকে, যেন ওঁদের দেখেননি এমন ভাব করে আড়চোখে বইটার দিকে তাকিয়ে একই সাথে খেতে এবং পড়তে থাকলেন।
‘কি, কাজে নামার আগে একটু খেট মারা হচ্ছে বুঝি?’ ভ্রন্স্কির কাছে বসে বললেন মুটকো অফিসার। ‘দেখতেই পাচ্ছ’, ভুরু কুঁচকে, মুখ মুছে এবং তাঁর দিকে না তাকিয়ে ভ্রন্স্কি জবাব দিলেন।
মুটিয়ে যাবার ভয় হচ্ছে না?’ ছোকরা অফিসারটির জন্য একটা চেয়ার এগিয়ে দিয়ে মুটকো বললেন।
‘কি?’ ভ্রনৃস্কি বললেন রাগত স্বরে, বিতৃষ্ণায় মুখ বিকৃত করলেন, দেখা গেল তাঁর সমান মাপের দাঁতের সারি।
‘মুটিয়ে যাবে বলে ভয় হচ্ছে না?’
‘ওহে, এক বোতল শেরি।’ কোন জবাব না দিয়ে ভ্রন্স্কি ডাকলেন পরিচারককে, বইটা অন্য দিকে সরিয়ে পড়ে যেতে লাগলেন।
মুটকো অফিসার সুরার তালিকাটা নিয়ে ফিরলেন ছোকরা অফিসারের দিকে।
তালিকাটা তাকে দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কি খাবে বেছে নাও।’
‘রাইন ওয়াইন’, ভ্রন্স্কির দিকে ভয়ে ভয়ে কটাক্ষে তাকিয়ে ছোকরা অফিসারটি বলল, সামান্য দেখা দেওয়া মোচে আঙুল বুলাতে লাগল সে। ভ্রন্স্কি মুখ ফেরাচ্ছেন না দেখে সে উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘বিলিয়ার্ড ঘরে যাওয়া যাক।’
মুটকো অফিসার বাধ্যের মত উঠে গেলেন দরজার দিকে 1
এ সময় ঘরে ঢুকলেন দীর্ঘকায় রাশভারি ক্যাপটেন ইয়াভিন, তাচ্ছিল্যভরে অফিসার দুজনের দিকে ওপর থেকে মাথা নুইয়ে তিনি গেলেন ভ্রন্স্কির কাছে।
‘আরে, এই যে!’ প্রকাণ্ড হাতে ভ্রন্স্কির কাঁধপট্টিতে চাপড় মেরে তিনি বললেন। ভ্রন্স্কি রেগেমেগে তাকালেন, কিন্তু তৎক্ষণাৎ মুখ তাঁর জ্বলজ্বল করে উঠল তাঁর স্বভাবসিদ্ধ প্রশান্ত ও সুস্থির প্রীতিতে।
‘ভালো বুদ্ধি করেছিস আলিওশা’, জলদগম্ভীর উচ্চকণ্ঠে ক্যাপটেন বললেন, ‘এবার খা, তারপর একপাত্র মদ্য।’
‘নাঃ, ইচ্ছে করছে না।’
যে অফিসার দুজন এই সময় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তাঁদের দিকে উপহাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইয়াভিন বললেন, ‘মানিকজোড়ই বটে!’ ভ্রন্স্কির পাশে তিনি বসলেন চেয়ারের পক্ষে বড় বেশি উঁচু আঁটো ব্রিচেস পরা পা দু’খানা তীক্ষ্ণ কোণে বেঁকিয়ে। ‘কাল ক্রাস্নেনস্কি থিয়েটারে এলি না যে? মন্দ করল না নুমেরভা। কোথায় ছিলি?’
ভ্রন্স্কি বললেন, ‘ভেস্কয়দের ওখানে।’
‘ও!’ ইয়াভিন মন্তব্য করলেন।
ইয়াভিন জুয়াড়ী, মদ্যপ, কোন নীতির বালাই তাঁর ছিল না। শুধু তাই নয়, বরং ছিল যত গর্হিত সব নীতি। রেজিমেন্টে ইনি ভ্রন্স্কির সেরা বন্ধু। ভ্রন্স্কি তাঁকে ভালোবাসতেন যেমন তাঁর অসাধারণ দৈহিক শক্তির জন্য, যা প্রকাশ পেত গেলাসের পর গেলাস মদ টানা, না ঘুমানো, অথচ একই রকম থেকে যাবার ক্ষমতায়, তেমনি তাঁর বিপুল নৈতিক শক্তির জন্য, যা প্রকাশ পেত তাঁর ওপরওয়ালা ও বন্ধুদের সাথে তাঁর সম্পর্কের ক্ষেত্রে, যা তাঁর প্রতি তাদের মনে ভীতি ও শ্রদ্ধা জাগাত, প্রকাশ পেত জুয়া খেলায়, আর খেলতেন হাজার হাজার টাকা এবং যত মদই টানুন, খেলতেন এমন সূক্ষ্ম অটল চালে যে ব্রিটিশ ক্লাবের পয়লা নম্বরের জুয়াড়ী বলে ধরা হত তাঁকে। ভ্রন্স্কি তাঁকে শ্রদ্ধা করতেন ও ভালোবাসতেন বিশেষ করে এই কারণে যে, ইয়াভিন তাঁকে ভালোবাসতেন তাঁর নাম বা টাকাকড়ির জন্য নয়, তাঁর নিজের জন্যই, এটা তিনি অনুভব করতেন। সমস্ত লোকদের মধ্যে একা তাঁর কাছেই কেবল ভ্রন্স্কি নিজের প্রেমের ঘটনাটা বলতে পারতেন। ভ্রন্স্কি টের পেতেন যে সব কিছু ভাবপ্রবণতার প্রতি ইয়াভিন অবজ্ঞা পোষণ করেন বলে মনে হলেও যে প্রবল হৃদয়াবেগে তাঁর জীবন এমন ভরে উঠেছে সেটা তিনিই বুঝতে পারবেন। তাছাড়া তাঁর সন্দেহ ছিল না যে ইয়াভিন নিশ্চয় পরচর্চা আর কেলেঙ্কারিতে এখন আর তৃপ্তি পাচ্ছেন না, এই হৃদয়াবেগটা যেভাবে উচিত সেইভাবেই বুঝবেন, অর্থাৎ জানেন এবং বিশ্বাস করেন যে এই প্রেমটা ঠাট্টা কি মজার ব্যাপার নয়, অতি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের প্রেমের কথা ভ্রন্স্কি ওঁকে বলেননি, কিন্তু জানতেন যে তিনি সবই জানেন, যা উচিত তা সবই বুঝছেন, সেটা ওঁর চোখে লেখা আছে দেখে ভ্রন্স্কির আনন্দ হত।
‘ও, হ্যাঁ!’ ভ্রন্স্কি ভের্স্কয়দের ওখানে ছিলেন শুনে মন্তব্য করলেন ইয়াভিন এবং তাঁর যা বদভ্যাস, কালো চোখ জ্বলজ্বল করে মোচের বাঁ দিকটা মুখে পুরলেন।
‘আর কাল তুই কি করলি? জিতেছিস?’ ইয়াভিন জিজ্ঞেস করলেন।
‘আট হাজার। তবে তিন হাজারের নিশ্চয়তা নেই, পাব কিনা সন্দেহ।’
‘তা আমাকে বাজি ধরে হারতেও পারিস’, হেসে বললেন ভ্রন্স্কি। (ভ্রন্স্কির ওপর বড় একটা বাজি ধরেছিলেন ইয়াভিন)।
‘হারব না কিছুতেই। ভয় শুধু মাখোতিনকে।’
আলাপ চলল আজকের ঘোড়দৌড়ের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে, ভ্রন্স্কির চিন্তা শুধু ওটাই।
‘যাওয়া যাক। আমার খাওয়া শেষ’, উঠে দরজার দিকে গেলেন ভ্রন্স্কি। ইয়াভিন ও তাঁর বিশাল পা আর লম্বা পিঠ টান করে উঠে দাঁড়ালেন।
