এক কথায়, সঙ্গীদের কারো কাছেই তিনি নিজের প্রেমের কথা বলতেন না, প্রচণ্ড পানোৎসবেও (নিজের ওপর দখল হারাবার মত মাতাল তিনি অবশ্য কখনো হতেন না) তাঁর পেটের কথা কিছু বেরিয়ে পড়ত না, লঘুচিত্ত তাঁর প্রণয় নিয়ে ইঙ্গিত করার চেষ্টা করত, তাদের মুখ বন্ধ করে দিতে পারতেন তিনি। কিন্তু তাহলেও তাঁর প্রেমের কথা জানাজানি হয়ে যায় গোটা শহরে—সবাই কম-বেশি অনুমান করতে পারত কারেনিনার সাথে তাঁর সম্পর্ক—তাঁর প্রেমের ব্যাপারে সবচেয়ে যেটা কষ্টকর তার জন্যই যুবকদের অধিকাংশ ঈর্ষা করত তাঁকে, যথা—কারেনিনের উচ্চ প্রতিষ্ঠা এবং সেই কারণে সমাজের চোখে এই প্রণয়টার দৃষ্টিকটুতা।
আন্নাকে যে ন্যায়পরায়ণা বলা হয়, এটা শুনে শুনে বহু দিন যাদের বিরক্তি ধরে গেছে, ঈর্ষান্বিত সে সব যুবতীদের অধিকাংশ খুশি হল তাদের আন্দাজ-অনুমানে, এবং অপেক্ষায় রইল কবে সামাজিক অভিমত পালটায়। যাতে তারা ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তাদের ঘৃণার জগদ্দল পাথর নিয়ে। সময় হলে যেসব কাদার দলা তারা ছুঁড়ে মারবে, তা এর মধ্যে তৈরি হয়ে উঠছিল। এই যে সামাজিক কেলেঙ্কারির আয়োজন হচ্ছিল অধিকাংশ বয়স্ক ও উচ্চপদস্থ লোকে অসন্তুষ্ট হচ্ছিলেন তাতে।
ছেলের এই প্রেমলীলার কথা জেনে ভ্রন্স্কির মা প্রথমে খুশিই হয়েছিলেন। কেননা তাঁর ধারণা, উঁচু সমাজে একটা কাণ্ড বাঁধালে চৌকশ নবযুবকের যতটা শোভা বাড়ে, তেমন আর কিছুতে হয় না। তাছাড়া যে কারেনিনাকে তাঁর ভারি ভালো লেগেছিল। নিজের ছেলের কথা যিনি অত গল্প করেছিলেন, তিনিও কাউন্টেস ভ্রস্কয়ার মতে যা হওয়া উচিত, তেমনি সুন্দরী সুশীলা নারীর মতই। কিন্তু পরে তিনি জানতে পারলেন যে ভাগ্যোন্নতির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ একটা প্রস্তাব পেয়েও ছেলে তা প্রত্যাখ্যান করেছে। শুধু রেজিমেন্টে থাকার জন্য যাতে কারেনিনার সাথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়, জানতে পান যে উচ্চপদস্থরা এর জন্য তাঁর ওপর অসন্তুষ্ট, সুতরাং তিনি তাঁর মত পরিবর্তন করেন। তাছাড়া এই যোগাযোগ সম্পর্কে তিনি যা কিছু জেনেছিলেন, তা থেকে এটাও তাঁর ভালো লাগেনি যে ব্যাপারটা তেমন চমৎকার লালিত্যময় নয় যা তিনি অনুমোদন করতে পারেন, এ যে এক ভের্টের-মার্কা মরিয়া আবেগ যার পরিণতি হতে পারে কোন আহাম্মকিতে বলে তিনি শুনেছেন। হঠাৎ তাঁর মস্কো ছেড়ে যাওয়ার পর থেকে তিনি তাঁকে দেখেননি, বড় ছেলের মারফত তিনি দাবি করেন যেন তিনি আসেন তাঁর কাছে।
ছোট ভাইয়ের ওপর বড় ভাইও সন্তুষ্ট ছিলেন না। এ ভালোবাসাটা কেমন, সামান্য নাকি প্রবল, উদ্বেল নাকি নিরাবেগ, পাতক নাকি নিষ্পাপ (সন্তানাদি থাকা সত্ত্বেও তিনি এক নর্তকীকে রক্ষিতা রেখেছিলেন, তাই এ ব্যাপারে তাঁর উদারতা ছিল), এ নিয়ে তিনি মাথা ঘামাননি; কিন্তু তিনি জানতেন যে এই ভালোবাসাটা যাঁদের ভালো লাগার কথা, তাঁদের তা লাগছে না, তাই তিনি ভাইয়ের আচরণ অনুমোদন করেননি।
ভ্রন্স্কির সৈন্যদল কাজ আর সমাজ ছাড়াও আরো একটা নেশা ছিল—ঘোড়া, এ নিয়ে পাগল তিনি অফিসারদের এ বছর হার্ডল-রেস হবার কথা আছে। ভ্রনস্কি তাতে নামে লেখান, কেনেন ভালো জাতের একটা বিলাতী মাদি ঘোড়া এবং প্রেমের ব্যাপারটা সত্ত্বেও আসন্ন ঘোড়দৌড় নিয়ে মেতে ওঠেন, যদিও সংযম না হারিয়ে…. অবশ্য এ নেশা দুটো পরস্পরবিরোধীও হয়নি। বরং প্রেম ছাড়াও তাঁর দরকার ছিল কাজ আর ব্যসন, যাতে তাজা হয়ে উঠতে পারেন, তাঁর বড় বেশি উত্তেজিত অনুভূতিটা বিশ্রাম পায়।
উনিশ
ভ্রন্স্কি ঘোড়দৌড়ের দিন তাঁর অভ্যস্ত সময়ের আগেই ক্রান্নয়ে সেলো গ্রামে রেজিমেন্টের ক্যান্টিনে বিফস্টিক খেতে এলেন। কড়া সংযম পালনের প্রয়োজন তাঁর ছিল না, কেননা তাঁর ওজন যা দরকার ঠিক তাই—সাড়ে চার পুদ, তবে মুটিয়ে ওঠাও চলে না, তাই ময়দার খাবার আর মিষ্টি জিনিস তিনি এড়িয়ে চলতেন। টেবিলে দুই কনুই রেখে বরাত দেওয়া বিফস্টিকের অপেক্ষায় বসে ছিলেন তিনি, সাদা ওয়েস্ট-কোটের ওপর জ্যাকেটের বোতাম খোলা, প্লেটের ওপর একটা ফরাসি নভেল ছিল, সেটা দেখছিলেন। বইটা দেখছিলেন কেবল যে সব অফিসার আসছে আর যাচ্ছে তাদের সাথে যাতে কথা বলতে না হয়। আর ভাবছিলেন। ভাবছিলেন যে ঘোড়দৌড়ের পর তাঁর সাথে দেখা করার কথা দিয়েছেন আন্না। তাঁর সাথে দেখা হয়নি তিন দিন। স্বামী বিদেশ থেকে ফিরেছেন, ফলে আজকের সাক্ষাৎটা সম্ভব হবে কিনা জানতেন না এবং সেটা কি করে জানা যায় তাও ভেবে পাচ্ছিলেন না। শেষবার তিনি আন্নাকে দেখেছেন তাঁর চাচাতো বোন বেত্সির পল্লীভবনে। কারেনিনদের পল্লীভবনে তিনি যেতেন যথাসম্ভব কম। এখন তাঁর ইচ্ছে হচ্ছিল সেখানে যাবার, এবং সেটা কিভাবে সম্ভব করা যায় তাই ভাবছিলেন। ‘অবশ্যই বলব যে ঘোড়দৌড়ে আন্না আসবেন কিনা তা জানার জন্যে বেত্সি আমাকে পাঠিয়েছেন। অবশ্যই যাব’, বইটা থেকে মাথা তুলে মনে মনে স্থির করলেন তিনি। তাঁকে দেখতে পাবার সুখকল্পনায় জ্বলজ্বল করে উঠল তাঁর মুখটা।
যে পরিচারক রুপার তপ্ত ডিশে বিফস্টিক এনে দিল, তাকে তিনি বললেন, ‘আমার বাড়িতে একজন লোক পাঠিয়ে বলে দাও যেন তাড়াতাড়ি ত্রয়কা নিয়ে আসে।’ তিনি ডিশটা টেনে নিয়ে খেতে শুরু করলেন।
