আগাফিয়া মিখাইলোভনা অতিথির জন্য যে সুগন্ধি সাবান দিয়েছিলেন কিন্তু অব্লোন্স্কি যা ব্যবহার করেননি, তার দিকে তাকিয়ে মোড়ক খুলে বললেন, ‘কি আশ্চর্য সাবান বানাচ্ছে এরা। তাকিয়ে দ্যাখ, এ যে একেবারে শিল্পকর্ম।’
‘হ্যাঁ, সবই আজকাল কি নিখুঁতই-না হচ্ছে’, অব্লোন্স্কি বললেন সজল সুপরিতুষ্ট হাই তুলে, ‘যেমন ধর এসব থিয়েটার। প্রমোদভবন… আহ্!’ আবার হাই, ‘সবখানে বিজলী বাতি…..আ-আ-আ!’
‘হ্যাঁ, বিজলী বাতি’, বললেন লেভিন, তা বটে, কিন্তু ভ্রন্স্কি এখন কোথায়?’ সাবানটা রেখে দিয়ে হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন তিনি।
হাই তোলা থামিয়ে অব্লোন্স্কি বললেন, ‘ভ্রন্স্কি? সে এখন পিটার্সবুর্গে। তোমার ঠিক পরেই চলে যায়, তারপর একবারও মস্কো আসেনি। শোন কস্তিয়া, আমি তোমাকে সত্যি বলছি’, টেবিলে কনুই ভর দিয়ে সুন্দর রাঙা মুখে হাত রেখে তিনি বলে চললেন, ভাবাকুল সদাশয় নিদ্রালু চোখে তাঁর তারার মত ছটা, ‘তোমারই দোষ। প্রতিদ্বন্দ্বীকে তুমি ভয় পেলে। আর আমি তখন যা বলেছিলাম, আমি জানি না কার চান্স বেশি। এস্পার-ওস্পার করলে না কেন? আমি তোমাকে তখন বলেছিলাম যে…’ মুখ পুরো না খুলে একটা চিবুক দিয়ে হাই তুললেন তিনি।
তাঁর দিকে তাকিয়ে লেভিন ভাবলেন, ‘আমি যে পাণিপ্রার্থনা করেছিলাম সে কি ও জানে, নাকি জানে না? কেমন একটা কূটকৌশলী ধূর্ত ভাব দেখা যাচ্ছে ওর মুখে।’ এবং লাল হয়ে উঠছেন টের পেয়ে তিনি সরাসরি চাইলেন অব্লোন্স্কির চোখের দিকে। অবলোন্স্কি বলে গেলেন, ‘কিটির দিক থেকে তখন কিছু থাকলে সেটা ছিল বাইরের চাকচিক্যের আকর্ষণ। এই নিখুঁত আভিজাত্য আর সমাজে তার ভবিষ্যৎ প্রতিষ্ঠা প্রভাবিত করেছিল কিটিকে নয়, তার মাকে।’
ভুরু কোঁচকালেন লেভিন। প্রত্যাখ্যানের যে হীনতা তাঁকে সইতে হয়েছিল, সেটা যেন তাজা, সদ্যোহানা একটা আঘাত হয়ে দগ্ধ করল তাঁর হৃদয়। তবে তিনি নিজের বাড়িতে, আর বাড়ির দেয়াল সব সময়ই কিছু কাজ দেয়।
‘দাঁড়াও, দাঁড়াও’, অব্লোন্স্কিকে থামিয়ে দিয়ে লেভিন বললেন, ‘বলছ, আভিজাত্য। কিন্তু তোমাকে জিজ্ঞেস করি, ভ্রন্স্কি বা আর যে-কেউ হোক না কেন, তার আভিজাত্যটা কিসে, এমন আভিজাত্য যাতে আমাকে হেয় জ্ঞান করবে? ভ্রন্স্কিকে তুমি অভিজাত বলে ভাব, আমি ভাবি না। এমন একটা লোক, বাপ যার নেহাত কেউকেটা থেকে বাগিয়ে-টাগিয়ে ওপরে উঠেছে, মায়ের যার সৃষ্টিকর্তা জানেন সংগম নেই কার সাথে…না ভাই, মাপ কর, অভিজাত বলে আমি মনে করি নিজেকে এবং আমার মত লোকদের যারা অতীতের তিন-চার পুরুষ পর্যন্ত অতি উচ্চমানে শিক্ষিত সদ্বংশের দিকে আঙুল দেখাতে পারে, (প্রতিভা, এবং বুদ্ধিমত্তা অন্য ব্যাপারে), যাকা কখনো কারো তোষামোদ করেনি, কারো মুখাপেক্ষী থাকেনি, যেভাবে দিন কাটিয়ে গেছেন আমার বাবা, আমার দাদু। এ ধরনের লোক অনেক জানা আছে আমার। আমি যে বনের গাছ গুনে দেখি, এটা তোমার কাছে নীচতা বলে হয়, তিরিশ হাজার তুমি দান করে দাও রিয়াবিনিনকে; কিন্তু তুমি তো পাও খাজনা, জানি না আরো কি-সব পাও, আমি পাই না, তাই বংশ আর পরিশ্রমটাই আমার কাছে মূল্যবান…আমরাই অভিজাত, ওরা নয় যারা বেঁচে থাকে দুনিয়ার শক্তিধরদের কাছ থেকে পাওয়া মুষ্টিভিক্ষায়, দশ কোপেকেই যাদের কিনে নেওয়া যায়।
‘আরে, কার ওপর তুমি খাপ্পা হচ্ছ? আমি তোমার সাথে একমত’, অব্লোন্স্কি বললেন আন্তরিকতার সাথেই, খুশি হয়ে যদিও বুঝতে পারছিলেন যে দশ কোপকে দিয়ে যাদের কেনা যায়, তাদের দলে তাঁকেও ফেলছেন লেভিন। লেভিনের উত্তাপ ভালো লেগেছিল তাঁর। ‘কার ওপর খাপ্পা হচ্ছ তুমি?’ অবশ্য ভ্রন্স্কি সম্পর্কে তুমি যা বলছ তার অনেকখানিই সত্যি নয়, কিন্তু সে কথা আমি বলছি না। সোজাসুজি বলছি তোমাকে, আমি হলে একসাথে চলে যেতাম মস্কোয় এবং…’
‘উঁহু, আমি জানি না তুমি জান কিনা, তবে তাতে কিছু এসে যায় না আমার। তোমাকে বলেই রাখি, আমি বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলাম এবং প্রত্যাখ্যাত হয়েছি, কাতেরিনা আলেক্সান্দ্রভনা এখন আমার কাছে একটা গুরুভার, লজ্জাকর স্মৃতি। ‘
‘কেন? কি বাজে কথা!
‘কিন্তু ও-কথা আর নয়। তোমার ওপর যদি রূঢ়তা হয়ে থাকে, ক্ষমা কর ভাই’, লেভিন বললেন। বলার যা ছিল সবখানি বলে ফেলার পর উনি এখন আবার সেই সকাল বেলাকার মানুষ, ‘আমার ওপর রাগ করছ না তো, স্তিভা? রাগ করো না ভাই’, এই বলে তিনি হেসে বন্ধুর হাত ধরলেন।
‘আরে না, এতটুকু না, রাগ করার কিছুই নেই। আমাদের বোঝাবুঝি হয়ে গেল বলে আনন্দই হচ্ছে আমার। আর জান, সকালে পাখি আসে ভালো। আমি হয়ত ঘুমাবই না, শিকার থেকে সোজা স্টেশন।’
‘সেটা তো খুবই ভালোই।’
আঠারো
ভ্রন্স্কির ভেতরটা কামলালসায় ভরপুর হয়ে থাকলেও বাইরেটা অপরিবর্তিত, অব্যাহত ধারায় চলতে থাকল আগের মতই সামাজিক আর রেজিমেন্ট-কেন্দ্রিক সম্পর্কাদি ও স্বার্থের অভ্যস্ত পথে। রেমিজেন্টের স্বার্থ ভ্রন্স্কির জীবনে একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান নিয়েছিল, সেটা এজন্যও বটে যে রেজিমেন্টেকে তিনি ভালোবাসতেন, কিন্তু আরো বেশি করে এজন্য যে রেজিমেন্টও ভালোবাসত তাঁকে। রেজিমেন্টের লোকেরা ভ্রন্স্কিকে শুধু ভালোই বাসত না, শ্রদ্ধাও করত, গর্ব বোধ করত তাঁকে নিয়ে, গর্বটা এজন্য যে বিপুল বিত্তশালী সুশিক্ষিত গুণবান এই যে লোকটার সামনে যত কিছু সাফল্য, আত্মাভিমান, উচ্চাভিলাষের পথ খোলা, তিনি কিনা এ সব কিছু তুচ্ছ করে জাগতিক সমস্ত স্বার্থের মধ্যে থেকে মনেপ্রাণে বরণ করে নিয়েছেন রেজিমেন্ট আর বন্ধুমহলের স্বার্থ। তাঁর সম্পর্কে সাথিদের এই মনোভাব ভ্রন্স্কির অজ্ঞাত ছিল না, আর এই জীবনটাকে ভালোবাসা ছাড়াও তাঁর সম্পর্কে যে মনোভাব গড়ে উঠেছে তার পোষকতা করাও নিজের কর্তব্য বলে জ্ঞান করতেন তিনি।
