লেভিনের মেজাজটা সত্যিই ভালো ছিল না। নিজের প্রিয় অতিথির প্রতি সুশীল ও সুমধুর হবার সমস্ত ইচ্ছা সত্ত্বেও তিনি নিজেকে সামলাতে পারছিলেন না। কিটির বিয়ে হয়নি, এই খবরটার নেশা তাঁকে পেয়ে বসেছিল।
বিয়ে হয়নি কিটির। সে অসুস্থ। অসুস্থ সেই লোকটার জন্য যে তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই অপমান যেন লেভিনকেও লাগল। ভ্রন্স্কি প্রত্যাখ্যান করেছেন কিটিকে, আর কিটি তাঁকে, লেভিনকে। অতএব লেভিনকে অশ্রদ্ধা করার অধিকার ভ্রন্স্কির আছে। সুতরাং তিনি তাঁর শত্রু। কিন্তু এটা লেভিন সবটুকু ভেবে ওঠেননি। ঝাপ্সাভাবে তিনি টের পাচ্ছিলেন যে, এক্ষেত্রে তাঁর পক্ষে অবমাননাকর কিছু-একটা আছে, এবং যা তাঁকে বিচলিত করছিল তাতে নয়, যা তাঁর সামনে এসে পড়ছিল তাতেই চটে উঠছিলেন তিনি। আহাম্মকের মত বন বিক্রি, যে প্রতারণায় অলোনস্কিকে ফেলা হল এবং যা ঘটল তাঁরই বাড়িতে, এতেই পিত্তি জ্বলছিল তাঁর।
‘কি, শেষ হল?’ ওপরে অব্লোন্স্কিকে দেখে তিনি বললেন, নৈশাহার চলবে?’
‘একেবারেই আপত্তি নেই। গাঁয়ে ক্ষিদে পায় কি, আশ্চর্য! রিয়াবিনিনকে খেতে বললে না কেন?’
‘জাহান্নামে যাক, বেটা!’
‘তবে তুমি ওর সঙ্গ এড়িয়ে চল বটে!’ অব্লোন্স্কি বললেন, ‘ওর দিকে হাতটাও বাড়ালে না।’
‘কারণ নফরের সাথে আমি করমর্দন করি না। কিন্তু এই লোকের চেয়ে নফরও শতগুণ ভালো।‘
অব্লোন্স্কি বললেন, ‘কি তুমি প্রতিক্রিয়াশীল হে! কিন্তু সমস্ত সামাজিক সম্প্রদায়কে মিলিয়ে দেওয়াটা?’
‘যার ভালো লাগে, বেশ তো মিলে যাক। আমার বিছ্ছিরি লাগে।’
তুমি দেখছি একটা ডাহা প্রতিক্রিয়াশীল।’
‘আমি কি, সত্যি, তা নিয়ে কখনো ভাবিনি। আমি-কনস্তান্তিন লেভিন, ব্যস ‘
‘এবং সেই কনস্তান্তিন লেভিন যার মেজাজ আজ মোটেই ভালো নেই’, হেসে অব্লোন্স্কি বললেন।
‘হ্যাঁ, মেজাজ ভালো নেই, কিন্তু জান কেন? তোমার এই নির্বোধ বিক্রিটার জন্যে… ‘
অব্লোন্স্কি মুখ কোঁচকালেন ভালো মেজাজেই যেন নিরপরাধ কোন লোকের দোষ ধরা হচ্ছে, কষ্ট দেওয়া হচ্ছে তার মনে।
বললেন, ‘নাও হয়েছে! কেউ কিছু-একটা বিক্রি করার পরেই তাকে শুনতে হয়নি; ‘এটার দাম অনেক বেশি’, এমনটা ঘটেছে কখনো? অথচ যখন বিক্রি করছে, তখন সে দাম কেউ দেয় না। উঁহু, দেখছি ওই হতভাগ্য রিয়াবিনিনের ওপর তোমার কোন রাগ আছে।’
‘হয়ত আছে। আর জানো কেন? তুমি হয়ত আবার বলবে যে আমি প্রতিক্রিয়াশীল কিংবা আরো ভয়ংকর কিছু- একটা; তাহলেও চারদিক থেকে অভিজাত সম্প্রদায়ের দরিদ্র হয়ে পড়াটা দেখতে আমার বিরক্তি হয়ে, ক্ষোভ হয়, আমি নিজে এ সম্প্রদায়ের একজন এবং সম্প্রদায়ভেদ মিলিয়ে যেতে থাকা সত্ত্বেও আমি এ সম্প্রদায়ের একজন বলে আনন্দ হয় আমার। আর দরিদ্র হয়ে পড়ছে বিলাসের জন্যে নয়, তেমন কিছু-একটা ব্যাপার নয় ওটা; সাড়ম্বরে দিন কাটানো—এটা অভিজাতদের ব্যাপার, ওরাই তা পারে। এখন আমাদের আশেপাশের চাষীরা জমি কিনে নিচ্ছে— আমার তাতে দুঃখ নেই। লোকটা কিছুই করেন না, চাষী খাটছে, কোণঠাসা করছে নিষ্কর্মাকে। তাই তো হওয়া উচিত। চাষীর জন্যে ভারি আনন্দ হয় আমার। কিন্তু কেমন একটা, জানি না কি বলা যায়, নিরীহতার দরুন এই দরিদ্র হওয়াটা দেখলে আমার রাগ হয়। এখানে এক খাজনা-দায়ী পোলীয় চাষী অর্ধেক দামে চমৎকার একটা সম্পত্তি কিনে নিল অভিজাত জমিদার-গিন্নির কাছ থেকে, যিনি বসবাস করেন বিদেশে, নীসে। ওখানে বেনিয়াকে জমি ইজারা দেওয়া হল দেসিয়াতিনা পিছু এক রুব্ল হারে, যার দর দশ রুল। আর তুমি খামোকা ওই চোয়াড়টাকে দান করে দিলে তিরিশ হাজার।’
‘তা করবটা কি, গাছ গুনব?’
‘অবশ্য-অবশ্যই শুনতে হবে। তুমি গুনলে না, ওদিকে রিয়াবিনিন গুনল। বেঁচে-বর্তে থাকা, লেখাপড়া করার টাকা থাকবে রিয়াবিনিনের ছেলেমেয়েদের, তোমার ছেলেমেয়েদের কিন্তু সেটি থাকবে না রে!’
‘কিন্তু মাপ কর আমাকে, এই গোনাগুনতির মধ্যে কেমন একটা ছোটলোকামি আছে। আমাদের আছে নিজেদের কাজকর্ম, ওদের নিজেদের, তা ছাড়া লাভও ওদের চাই। তবে যাক গে, ব্যাপরটা ঢুকে গেছে, ব্যস। আর এই ডিম- ভাজা, এটি আমার প্রিয় খাদ্য। তাছাড়া, আগাফিয়া মিখাইলোভনা আমাদের তো দেবেন ওই-যে গাছড়ায় জারানো ভোদ্কা।’
খাবার টেবিলে বসলেন অব্লোন্স্কি রসিকতা শুরু করলেন আগাফিয়া মিখাইলোভনার সাথে, তাঁকে নিশ্চয় করে বোঝালেন যে এমন ভোজন আর নৈশহারা তাঁর দীর্ঘকাল জোটেনি।
আগাফিয়া মিখাইলোভনা বললেন, ‘আপনি যা-হোক তবু তারিফ করছেন, কিন্তু কনস্তান্তিন দৃদ্মিত্রিচ, যা-ই ওকে দিই-না, পাঁউরুটির চটা হলেও তাই খেয়েই বেরিয়ে যাবে।’
নিজেকে দখলে রাখার শত চেষ্টা সত্ত্বেও লেভিন ছিলেন মনমরা, চুপ করে রইলেন। অব্লোন্স্কির কাছে একটা প্রশ্ন করার ছিল তাঁর, কিন্তু মন স্থির করে উঠতে পারছিলেন না, তিনি সেটা কখন কিভাবে করা যায় তা ভেবে পাচ্ছিলেন না। অব্লোন্স্কি তাঁর নিজের ঘরে গেলেন নিচু তলায়, পোশাক ছাড়লেন, হাত-মুখ ধুলেন, কুঁচি দেওয়া নৈশ কামিজ পড়ে শুলেন, লেভিন কিন্তু তাঁর ঘরে নানা আজেবাজে কথা বলে ইতস্তত করতে থাকলেন, যা চাইছিলেন সেটা জিজ্ঞেস করার সাহস হচ্ছিল না তাঁর।
