‘এই যে, আপনি তাহলে এসে গেছেন’, হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন অব্লোন্স্কি, ‘চমৎকার!’
‘হুজুরের আজ্ঞা অমান্য করার সাহস হল না। যদিও রাস্তাটা ছিল বড়ই খারাপ। সারা রাস্তা ভালোভাবে হেঁটেই এসেছি, তবে পৌঁছেছি সময়মত। গুডমর্নিং, কনস্তান্তিন দ্মিত্রিচ’, তাঁরও হাত ধরার চেষ্টা করে উনি বললেন লেভিনের উদ্দেশে, কিন্তু লেভিন ভ্রুকুটি করে এমন ভাব দেখালেন যেন ওঁর হাত তাঁর নজরে পড়েনি, স্নাইপগুলো বার করতে লাগলেন। ‘আমোদ করতে গিয়েছিলেন শিকারে। তা এটা কি পাখি বলুন তো’, স্নাইপটার দিকে অবজ্ঞার দৃষ্টিতে তাকিয়ে রিয়াবিনিন যোগ দিলেন, ‘স্বাদ আছে বুঝি’, এবং অননুমোদনে ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন তিনি, যেন এতে মজুরি পোষায় না বলে তাঁর ঘোর সন্দেহ আছে।
‘কেবিনেটে যাবে?’ অব্লোন্স্কিকে লেভিন ভ্রূকুটি করে ফরাসি ভাষায় বললেন, ‘যাও-না, সেখানে কথা বলবে।’
‘যেখানে ইচ্ছে সেখানেই দিব্যি চলে যাবে’, রিয়াবিনিন বললেন একটা নাক-সিঁটকানো মর্যাদার ভার নিয়ে, যেন বুঝিয়ে দিতে চান যে কাকে কিভাবে এড়িয়ে যেতে হবে এ নিয়ে অন্যে অসুবিধা বোধ করলেও তাঁর কখনোই কিছুতেই অসুবিধা হয় না।
রিয়াবিনিন কেবিনেটে ঢুকে এমনভাবে চারদিকে তাকিয়ে দেখলেন যেন দেবপটটা খুঁজছিলেন, তবে সেটা চোখে পড়লেও ক্রস করলেন না। বই-ভরা আলমারি আর তাকগুলোর দিকে তাকালেন তিনি, আর স্নাইপগুলোর ব্যাপারে যা করেছিলেন তেমনি অবজ্ঞাভরে হেসে অননুমোদনের ভঙ্গিতে মাথা নাড়লেন, এতে যে মজুরি পোষাতে পারে তা মানতে পারলেন না কিছুতেই।
অব্লোন্স্কি জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি, টাকা এনেছেন? বসুন, বসুন!’
টাকার জন্য আমরা দাঁড়িয়ে থাকি না। এলাম দেখা করতে, কথা বলতে।’
‘কি নিয়ে আবার কথা? বসুন, বসুন।’
‘তা বসা যেতে পারে’, বসে, চেয়ারের পিঠে হেলান দিয়ে, যা তাঁর পক্ষে অতি কষ্টকর, রিয়াবিনিন বললেন, ‘কিছু ছাড় দিতে হবে প্রিন্স। নইলে পাপ হবে। আর টাকা চূড়ান্ত রকমে তৈরি, মায় কড়ায় গণ্ডায়। টাকার জন্য কিছু আটকে থাকবে না।’
ইতিমধ্যে লেভিন আলমারিতে বন্দুক রেখে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, কিন্তু থেমে গেলেন বেনিয়ার কথা শুনে। বললেন, ‘পানির দামে বনটা নিলেন তাহলে। আমার কাছে ও এসেছে দেরি করে, নইলে দাম বেঁধে দিতাম আমিই।’
রিয়াবিনিন উঠে দাঁড়িয়ে নীরব হাসি নিয়ে লেভিনকে লক্ষ্য করলেন আপাদমস্তক।
অব্লোন্স্কির উদ্দেশে হেসে বললেন, ‘কনস্তান্তিন দদ্মিত্রিচ বেজায় কৃপণ। ওঁর কাছ থেকে একেবারে চূড়ান্ত কিছুই কেনা যায় না। গম নিয়ে দরাদরি করলাম, দাম দিতে চেয়েছিলাম ভালো।’
‘আমার জিনিস মুফতে কেন দেব আপনাকে? কুড়িয়ে তো পাইনি, চুরিও করিনি।
তা, চুরি করা আজকাল চূড়ান্ত রকম অসম্ভব। আজকাল সবই উত্তমরূপে চলে প্রকাশ্যে আইন মেনে, চুরিচামারি আর নয়, আজকাল সবই দরাজ। আমরা সৎলোকের মতই কথা কয়েছি। বনের জন্য বেশি টাকা ঢাললে তা উশুল তো হবে না। তাই অনুরোধ করছি, অন্তত খানিকটা ছাড় দেওয়া হোক। ‘
‘আপনাদের কথাবার্তা সব শেষ হয়ে গেছে, নাকি হয়নি? যদি শেষ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে বলার কিছু নেই। আর শেষ না হয়ে থাকলে’, লেভিন বললেন, ‘বনটা আমিই কিনব।’
হঠাৎ রিয়াবিনিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। বাজপাখির মত হিংস্র নিষ্ঠুর একটা ভাব ফুটে উঠল তাতে। দ্রুত হাড়খোঁচা আঙুলে ফ্রক-কোটের বোতাম খুলে ফেললেন তিনি, দেখা গেল ট্রাউজারের ওপরে লম্বিত একটা কামিজ, ওয়েস্ট-কোটে পেতলের বোতাম, পকেট ঘড়ির চেন : দ্রুত তিনি বের করলেন একটা পুরানো পেট মোটা মানি-ব্যাগ। তিনি তাড়াতাড়ি ক্রস করে হাত বাড়িয়ে দিয়ে ভুরু কুঁচকে মানি-ব্যাগটা দোলাতে দোলাতে বললেন, ‘বেশ, বন আমার। টাকা নাও, বন আমার। রিয়াবিনিমের দরাদরি এরকমই, দু’চার পয়সা নিয়ে তার খাঁই নেই।
লেভিন বললেন, ‘আমি হলে তোমার মত তাড়াহুড়া করতাম না।’
অব্লোন্স্কি অবাক হয়ে বললেন, ‘বল কি! কথা দিয়েছি যে!’
দড়াম করে দরজা বন্ধ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন লেভিন। রিয়াবিনিন দরজার দিকে তাকিয়ে হেসে মাথা নেড়ে বলতে লাগলেন : ‘হা রে যৌবনে, একেবারে চূড়ান্ত রকমের ছেলেমানুষি। কিনছি যখন, বিশ্বাস করুন, সেটা সম্মান করে—অব্লোন্স্কির বন কিনল আর কেউ নয়, রিয়াবিনিন, এই নামটুকুর খাতিরে। আর লাভ যে কি দাঁড়াবে তা একমাত্র সৃষ্টিকর্তাই জানেন। সৃষ্টিকর্তাই সাক্ষী। তাহলে দয়া করে সই করে দিন দলিলে….’
এর এক ঘণ্টা পর পকেটে চুক্তিপত্র নিয়ে ফ্রক-কোটের হুকে এঁটে পরিপাটী করে আলখাল্লা চাপিয়ে কারবারী তাঁর কষে পেটাই-করা গাড়িতে চেপে বাড়ি রওনা হলেন।
‘ওহ্, এসব জমিদারের দল!’ গোমস্তাকে বললেন তিনি। ‘সবাই একই জিনিস।’
‘তাই বটে’, ওঁকে লাগাম দিয়ে চামড়ার অ্যাপ্রনে বোতাম আঁটতে আঁটতে গোমস্তা বলল, ‘মিখাইল ইগ্নাতিচ, তা কেনার ব্যাপারটা কি দাঁড়াল?’
‘হুঁ হুঁ…’
সতেরো
বেনিয়া লোকটা তাঁকে যে নোটগুলো তিন মাসের অগ্রিম দিয়েছিলেন, তাতে পকেট বোঝাই করে অব্লোন্স্কি ওপরে উঠলেন। বনের ব্যাপারটা চুকেছে। টাকা আছে পটেকে। পাখি শিকার হয়েছে চমৎকার। তাই অব্লোন্স্কির মেজাজ এখন খুবই ভাল। সুতরাং যে বদ মেজাজ লেভিনকে পেয়ে বসেছিল, সেটা ঘোচাবার খুবই একটা ইচ্ছে হল তাঁর। তিনি চাইছিলেন, যেভাবে দিনটার শুরু হয়েছিল, সেভাবেই সন্ধ্যাহারে তার শেষ হোক।
